সিলেটে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে সাংগঠনিক স্থবিরতা চলছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বছর খানেক আগে কাউন্সিল ছাড়াই জেলা ও মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করলেও তাতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তাদের দাবি ছিল—কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা। কিন্তু দলীয় সভানেত্রী ঢাকা থেকেই সিলেটের নেতাদের তালিকা নিয়ে তা কাটছাঁট করে জেলা ও মহানগরে দুইটি কমিটি দিয়েছেন। সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা এতে নাখোশ হলেও পদলাভকারী নেতারা এতে সন্তুষ্ট। ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নেতাদের মধ্যে চলছে অন্তর্দ্বন্দ্ব।
অন্যদিকে সিলেট বিএনপি ভুগছে ইলিয়াস আলীর শূন্যতায়। জেলা বিএনপির সভাপতি ইলিয়াস আলী প্রায় ৮ মাস ধরে নিখোঁজ। তার অনুপস্থিতিতে স্থানীয় বিএনপির ইলিয়াস অনুসারীরা বিভিন্ন উপ-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি ইলিয়াস বিরোধী হিসেবে পরিচিতরাও একাট্টা হতে পারছে না। নেতাকর্মীরা জানান, বর্তমানে কোন্দলে জর্জরিত সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি। জেলা ও মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিও নেই।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা জানান, নতুন বছরটি রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বিএনপির আন্দোলন আরো তীব্র হবে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আন্দোলন ঠেকাতে নানা কৌশলে মাঠে থাকবে। ফলে রাজনীতিতে উত্তাপ ও কঠিন সময় আসন্ন।
আওয়ামী লীগ নেতারা আখের গোছাচ্ছেন!
সংশ্লিষ্টরা জানান, দল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সিলেট আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেই সংগঠনের চেয়ে নিজের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ-তদবির বাণিজ্য, কমিশন আদায়, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, বালু-পাথর-জলমহাল ভোগ-দখলসহ নানা ব্যবসায় তাদের ব্যস্ত দিন কাটছে। অনেকে চার বছরে কাড়ি কাড়ি টাকাও বানিয়ে ফেলেছেন। সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের সুখ-দুঃখের কথা শোনার সময় তাদের নেই। ফলে নেতাদের বিরুদ্ধে তৃণমূলে ক্ষোভ-অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে নেতাদের মধ্যেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকট। বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের মধ্যে শীতল সম্পর্ক নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উন্নয়ন, দল পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী ও মেয়রের মধ্যে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলীয় সূত্র জানায়। আগামী সংসদ নির্বাচনে অর্থমন্ত্রীর সিলেট-১ আসনে মেয়র কামরানও প্রার্থী হতে চান।
দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ মূলত সিলেটে প্রশাসন ও দলে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। পিপি হিসেবে মামলা-মোকদ্দমার হাজারো কাজ নিয়ে তিনি দিন-রাত ব্যস্ত। মধ্যরাত পর্যন্ত তার বাসায় বিভিন্ন মামলার আসামিদের আনাগোনা লেগে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের আশীর্বাদ আদায় করতে পারলে যেকোন মামলাই অনেক সহজ হয় যায়। মিসবাহ উদ্দিনের ভাইসহ আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। সিলেটের আওয়ামী লীগেও মিসবাহ সিরাজ নিজের একটি গ্রুপ লালন করে যাচ্ছেন।
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী এমপি নানা কারণে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত। বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ আসনে তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী এম ইলিয়াস আলী গুমের নেপথ্যে তিনি কলকাঠি নেড়েছেন বলে ইলিয়াস সমর্থকদের অনেকে মনে করেন। এমনকি বিএনপির বক্তব্য-বিবৃতিতেও তাকে দায়ী করে থাকে। বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীকে মামলায় জড়িয়ে, গ্রেফতার করিয়ে তিনি হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও শফিকুর রহমান চৌধুরী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এমপি ইলিয়াস আলীর মাধ্যমে বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানী নগরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতনের যে স্টিম রোলার চালানো হয়েছিল তা দেশের কোথাও হয়নি। তবে তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন বলে জানান।
কোন্দল সিলেট বিএনপির নিত্যসঙ্গী
দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জর্জরিত সিলেট বিএনপি। প্রায় এক যুগ ধরে কোন্দলের কারণে নিজেদের মধ্যে অনেক সংঘর্ষ-হানাহানি হয়েছে। বিগত সময় ক্ষমতায় থাকাকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান ও তখনকার সিলেট-২ আসনের এমপি ইলিয়াস আলীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে সিলেট বিএনপি। সেই বিভক্তি রেখা আজো মেটেনি। বরং গ্রুপ-উপগ্রুপের সংখ্যা আরো বেড়েছে। নিখোঁজ ইলিয়াস অনুসারীরাও উপ-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে ইলিয়াস আলীর কারণে অতীতে কোণঠাসা হয়ে পড়া মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আরিফুল হক চৌধুরী, বিএনপি নেতা ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, আবুল কাহের শামীম প্রমুখ এখন দলে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার চেষ্টায় রয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সিলেট সদর আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রম মাঝে মধ্যে সিলেটে এসে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করলেও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। ইলিয়াস অনুসারী নেতাকর্মীর সাথে তার দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, তারা এম ইলিয়াস আলীর ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন। তিনি দলে কোন কোন্দল নেই দাবি করে বলেন, বড় দল হিসেবে আমাদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে।
