ঢাকাবাসীর জন্য নববর্ষের উপহার হাতিরঝিল

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩২
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হাতিরঝিল শুধু দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নতুন বছরের শুরুতে ঢাকাবাসীর জন্য উপহার এই প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার রাজধানীর হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনকালে এই কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের পুনর্বাসন করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের নামে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হবে। তিনি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্প উদ্বোধনের ফলে নান্দনিক সৌন্দর্য যেমন বেড়েছে, তেমনি ঢাকাবাসীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার একটি জায়গা তৈরি হলো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ না করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতো না। বিদেশি পরামর্শক ও সহযোগিতা ছাড়া এই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুধু ঢাকা নয়, বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার পূর্ব-পশ্চিমে রাস্তা কম থাকায় যানজট বেশি হচ্ছে। হাতিরঝিল প্রকল্পটি নগরীর যানজট নিরসনে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর এই ঝিল বন্ধ করে এখানে স্কুল, প্লট ও ঘরবাড়ি করার অনেক প্রস্তাব আসে। কিন্তু আমি সেগুলো বাতিল করে দেই। বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে রাজধানীতে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ রাখার জন্য জলাধার ও খাল-ঝিল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকে সেসব প্রস্তাব নাকচ করা হয় । পরিবেশের সুরক্ষার জন্য যে কোনো প্রকল্প করতে হলে সেখানে জলাধার ও খাল থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বারো মাসে তের পার্বণের এই দেশে মানুষ এখানে এসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উত্সব উপভোগ করতে পারবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নকালে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো ভালো কাজের জন্য একটু ধৈর্য ধরতে হয়। সমালোচনায় যাতে হতাশা সৃষ্টি না হয়, কাজ করার মানসিকতা হারিয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি প্রকল্পের ফলে ঢাকাবাসী একটি নির্মল পরিবেশ পাবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের সুস্থ, সুন্দর ও উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগের চেয়ে দেশ অনেক উন্নত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ ডলার। ৫ কোটি নিম্ন মধ্যবিত্ত মধ্যবিত্তের জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসাবে গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর হাতিরঝিলে একঝাঁক রাজহাঁস ছেড়ে দেয়া হয়। এক সময় দুর্গন্ধময় কালো পানির জায়গায় স্বচ্ছ পানিতে দেখা যায় হাঁসের জলকেলি। সেখানে আয়োজন করা হয় নৌকাবাইচের। রাজধানীর পূর্ব থেকে পশ্চিমের যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, যা বাস্তবায়নে ৯৩ শতাংশ অর্থের জোগান দেয় সরকার। সমন্বিত এই প্রকল্পের প্রাণ হলো হাতিরঝিল নামের একটি খাল, যার দুই পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে ১৬ কিলোমিটার সড়ক, চারটি সেতু, চারটি ক্ষুদ্র সেতু (ভায়াডাক্ট) এবং চলাচলের জন্য চারটি ওভারপাস। বিনোদনের জন্য খালে থাকছে নৌকা চালানোর ব্যবস্থা, ছোট পরিসরে পিকনিক স্পটসহ বেশকিছু সুবিধা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে প্রথমে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। তারপর তিনি গাড়িতে করে খালের ওপর নির্মিত সেতু ও সড়ক দিয়ে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান মঞ্চে পৌঁছান সকাল ১১টায়। এ সময় দুই তরুণী ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই হাতিরঝিল প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন এবং মোনাজাতে অংশ নেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, একেএম রহমত উল্লাহ এমপি, রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা ও প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আগে আমরা একটি কালভার্ট তৈরি করতেও বিদেশি প্রকৌশলী নিয়ে আসতাম। এখন আর তা করতে হয় না। আমাদের মেধা দিয়ে যে কোনো নির্মাণ সম্ভব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনারা (সেনাবাহিনী) পদ্মা সেতুর নকশা শুরু করেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা ঢাকা শহর বদলে দেয়ার সংবাদ ফলাও করে প্রচার করেন। যে কোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, প্রধানমন্ত্রী আপনার নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়ে তুলবো। প্রকল্প এলাকা চলাচলের জন্য খুলে দেয়া উপলক্ষে খালের দু্ই পাড় ও সড়কগুলো সাজানো হয় ফুলের টব ও নানা রঙের পতাকা দিয়ে। একটি স্থানে ঢোল বাজাতে দেখা যায় একদল বাদককে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গুলশান লিংক রোডসহ বেশ কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হাতিরঝিলের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ ইত্তেফাককে জানান, বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে এই প্রকল্পকে প্রস্তুত করতে আরো কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা শিগগিরই করা হবে। প্রকল্পটি চালু হলে পূর্ব অংশের রামপুরা, বাড্ডা থেকে সহজেই শহরের কেন্দ্রস্থল কারওয়ান বাজারে পৌঁছানো যাবে বলে জানান তিনি। গাড়িতে এ এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য এফডিসির পাশের মোড়ে, মগবাজার রেলক্রসিং ও রামপুরা সেতুর কাছে তিনটি পথ থাকছে। এই প্রকল্প উন্মুক্ত হওয়ায় যানজট কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৭ সালে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন, ঢাকা ওয়াসা এবং এলজিইডি যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পে পরামর্শকের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। হাতিরঝিলের ইতিহাস অধ্যাপক মুনতাসির মামুনের স্মৃতিবিস্মৃতির ঢাকা গ্রন্থে বলা হয়, ঢাকার পিলখানায় (হাতির আবাস) হাতি থাকতো। তাদের গোসল করানো হতো এই বেগুনবাড়ি এলাকার ঝিলে। হাতির যাতায়াতের জন্য এলিফ্যান্ট রোডটি ব্যবহার করা হতো। হাতিরা যেসব সড়ক ব্যবহার করতো, পরবর্তীতে সেসব এলাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাতি নামটি। এক সময় ওই ঝিলটিও পরিচিত হয়ে ওঠে হাতিরঝিল নামে।