বাংলা ব্যাকরণের বাগধারার সুবাদে ‘পুকুরচুরি’ শব্দটির সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। বাগধারায় এই ‘পুকুরচুরি’ বলতে বোঝায় বড় রকমের চুরি বা জোচ্চুরি। এ দিক থেকে যারা পুকুরচুরির সঙ্গে জড়িত তাদেরকে পুকুরচোর বলা যায়। এই বড় রকমের চুরি বা জোচ্চুরি যে বড় ধরনের অপরাধ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আইনের পরিভাষায় এ জাতীয় অপরাধকে বলা হয় হোয়াইট কলার ক্রাইম বা ভদ্রলোকের অপরাধ। আর এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বলা হয় হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল বা ভদ্রবেশী অপরাধী। হোয়াইট কলার ক্রাইম গতানুগতিক অপরাধ থেকে ভিন্নধর্মী এক অপরাধ হলেও দুঃখজনকভাবে সত্য যে, বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে হোয়াইট কলার ক্রাইম বা ভদ্রলোকের অপরাধ বলে কোনো অপরাধের বা এ অপরাধ সম্পর্কিত কোনো শাস্তির কথা স্পষ্টভাবে উল্লে¬খ নেই। এদেশের ইতিহাসে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বড় পুকুরচুরির ঘটনা হচ্ছে বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারি। এ কেলেঙ্কারি সম্পর্কে দেশের সচেতন জনগণ বেশ ভালোভাবেই অবগত আছেন। গণমাধ্যমের সুবাদে পুকুরচুরির আরেকটি বড় ঘটনা চোখে পড়ে গত ১ নভেম্বর একটি পত্রিকার প্রথম পাতায়। ওইদিন ওই পত্রিকায় কারাগারে ‘পুকুরচুরি’ শিরোনামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে পুকুরচোরদের অবৈধ সব কর্মকাণ্ড ও দৌরাত্ম্য দেখে বিস্মিত ও হতবাক না হয়ে পারা যায় না। ওই প্রতিবেদনে পোস্তগোলার সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে এক কুইন্টাল চাল, গম, চিনি বা লবণ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনার ভাড়া মাত্র এক পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই ভাড়ার মধ্যে পণ্য ওঠানো-নামানোর খরচও রয়েছে। এর পাশাপাশি মাঝপথে পণ্য বেহাত হয়ে যাওয়াসহ একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে এ ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এখন সকলের মনেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, এ কি শায়েস্তা খানের আমল যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এত কম দামে পণ্য পরিবহন করতে পারছে?
শুধু হলমার্ক কিংবা কারাগারের ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন পেশার ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের অনেক লোক যে এ ধরনের অপরাধ করে চলেছে তা একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যায়। প্রতিনিয়ত এ ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে চললেও এ অপরাধীদের ‘হাত অ-নে-ক লম্বা’ হওয়ায় তারা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এ ধরনের অপরাধী ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও তাদের এহেন অপরাধের ফলে সমাজ ও দেশ ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। সাধারণভাবে আইন দ্বারা স্বীকৃত আচরণ, নীতি বা কাজের পরিপন্থি কোনো কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এসব অপরাধ গতানুগতিক অপরাধের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু ভদ্রলোকের অপরাধ বা হোয়াইট কলার ক্রাইম গতানুগতিক অপরাধ থেকে ভিন্নধর্মী অপরাধ। আর্থসামাজিকভাবে উচ্চ শ্রেণি কর্তৃক আইনভঙ্গমূলক কাজ যা তাদের পেশাগত কাজের প্রক্রিয়ায় ঘটে থাকে তাকে হোয়াইট কলার ক্রাইম বলা হয়— যা মারাত্মক এবং অপ্রত্যক্ষভাবে সমাজের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এ ধরণের অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কযুক্তরা আর্থসামাজিক এবং পেশাগত মর্যদায় অনেক বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত। সাধারণ অপরাধীরা নিতান্তই আবেগের বশে, প্রয়োজনের তাগিদে, অভাবের তাড়নায় বা জীবিকার তাগিদে অপরাধ করে থাকে। তাদের অপরাধ সমাজে তাত্ক্ষণিকভাবে বিশৃংখলা ডেকে আনলেও সরকারের পক্ষে তা দমন করা সম্ভব। কিন্তু হোয়াইট কলার ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা লোভ ও লালসার বশবর্তী হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিস্কে এবং প্রয়োজন ছাড়াই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে এ ধরনের অপরাধ করে থাকে বলে সরকারের পক্ষে এদেরকে শাস্তি প্রদান করা তো দূরের কথা, অনেক সময় এদেরকে শনাক্ত করাই সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এ দেশে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ভৌগোলিক এবং মনস্তাত্বিক কারণে বিভিন্ন ধরনের হোয়াইট কলার ক্রাইম বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত গতিতে— যা বাস্তব সত্য। এসব অপরাধ যে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে সে কথা বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন সরকারি অফিসে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার নামে অবৈধভাবে অর্থ নেওয়া, উন্নয়নখাতের অর্থ আত্মসাত্ করা, অধিক মুনাফার লোভে পণ্যে ভেজাল মেশানো, পণ্য মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, জনপ্রিয় ট্রেডমার্ক ব্যবহার করে নকলদ্রব্য উত্পাদন করা, চিকিত্সক কর্তৃক ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদান, বিনা প্রয়োজনে অস্ত্রপচার, সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে রোগী না দেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখার প্রবণতা, প্রকৌশলী কর্তৃক অর্থ আত্মসাত্ পূর্বক নিম্নমানের ব্রিজ ও রাস্তাঘাট তৈরি, পুলিশ কর্তৃক ঘুষ গ্রহণ আজ আর নতুন কোনো বিষয় নয়। তাছাড়া কর ফাঁকি দেওয়া, প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন, নিজের আয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান, অসত্ উপায়ে অর্থ বা সম্পত্তি অর্জন করা, অবৈধভাবে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে। তাছাড়া ব্যাংক-বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালতপাড়া, রেলওয়ে, বিদ্যুত্ বিভাগসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও পেশায় আজ হাজারও রকমের হোয়াইট কলার ক্রাইম সংঘটিত হচ্ছে। যারা হোয়াইট কলার ক্রাইম সংঘটন করে তারা যে অপরাধী সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। তাই পৃথক আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এই অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রয়াত্তকরণ করা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুন্যাল গঠনের মাধ্যমে তাদেরকে কঠোর শাস্তি প্রদান করার ব্যবস্থা করলে এ ধরনের অপরাধ দূর করা সম্ভব। আর তখনই একটি সুখী-সুন্দর, শান্তিময় ও দুর্নীতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব— যে সমাজের স্বপ্ন আমরা সকলেই দেখি।
ঢাকা
