বগুড়ায় একের পর এক সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনায় আতংকিত অনেকেই। মহাজোট সরকার ক্ষমতা আসার পর গত চার বছরে শুধুমাত্র বগুড়াতেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ২৩ নেতাকর্মী খুন হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ ঘটনাতেই অভিযুক্তরা একই দলের। ফলে অধিকাংশ মামলার কার্যক্রম নেই বললেই চলে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারের ভাগবাটোয়ারা এবং অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে পুলিশ দাবি করেছে। এদিকে নিহতদের পরিবার ও স্বজনেরা হত্যার বিচার না পাবার আশংকা করছেন। কারণ হিসাবে অনেকেই বলছেন হত্যা মামলার শুরুতেই দলীয় স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূল ঘাতকদের আড়াল করে মামলা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনও এসব হত্যা মামলা নিয়ে বিব্রত বোধ করছে। পুলিশ দু’একটি মামলায় ঘাতকদের গ্রেফতার করলেও শেষ পর্যন্ত তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে এসেছে। আবার অনেক ঘাতকই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকায় পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। পুলিশের যথাযথ ভূমিকা না থাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে মতামত ব্যক্ত করেছে সুধীজনরা। অন্যদিকে পুলিশ বলছে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে। তবে অভিযোগপত্র জমা দেবার পর এবং আসামিরা জামিন লাভ করলে পুলিশের করণীয় কিছু থাকে না।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা আসার পর এ পর্যন্ত বগুড়া জেলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক, শ্রমিকলীগ ও কৃষকলীগের ২৩ নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৫ জন, যুবলীগের ৭ জন, শ্রমিকলীগের ২ জন, আওয়ামী লীগের ৭ জন, ছাত্রলীগের ১ জন এবং কৃষকলীগের ১ জন। সর্বশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন বগুড়া শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহবায়ক খায়রুল আনাম রেক্কাত। এর আগে গত ২৯ নভেম্বর শহরের খান্দার এলাকায় নিজ বাড়ির কাছে প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন বগুড়া শহর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সুজানুর রহমান সুজন। সুজন হত্যকাণ্ডের ঘটনায় ৪জনকে গ্রেফতার দেখানো হলেও মূল আসামিরা রয়ে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে যুবলীগ নেতা মোস্তাকিমকে। একইভাবে গত বছরের আগস্ট মাসে শহরের দত্তবাড়ী এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাখোয়াত হোসেন জুয়েলকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই মামলাতেও প্রধান অভিযুক্ত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রোপন একই দলের কর্মী। বর্তমানে সে জামিনে রয়েছে। এছাড়া জেলায় সংঘটিত অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে শহরের নারুলীতে হাসানুজ্জমান নাসিম ও ইসরাফিল হাসান রঞ্জু হত্যাকাণ্ড। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শহরের মালতিনগরের যুবলীগ কর্মী শীর্ষ সন্ত্রাসী গালকাটা রিপন, ২০১১ সালের মে মাসে শহরতলির বনানীতে যুবলীগ নেতা শীর্ষ সন্ত্রাসী আমিনুর রহমান শাহীন, ২০১১ সালের জুলাই মাসে নিহত বগুড়া সেন্ট্রাল স্কুল মাঠে যুবলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ খুন হন। শুধু তাই নয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের শহর কমিটির যুগ্মআহবায়ক আশিষ কুমার খুন হন চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল এবং ৮নং ওয়ার্ডের সভাপতি সঞ্জিত রায়কে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয় একই মাসে। এছাড়াও ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ধুনটের দুই সহোদর লাল মিয়া পাইকার ও কালা চাঁদ পাইকার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীদের হামলায় খুন হন। পরের বছর ২০০৯ সালের ৩ জুলাই ধুনটেই খাস পুকুরের দখল নিয়ে সংঘর্ষে খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা আবু সায়েম ও তাজুল ইসলাম। অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে নিশিন্দারা এলাকায় যুবলীগ নেতা নান্না মিয়া, নাটাইপাড়া এলাকার যুবলীগ সদস্য সবুজ মিয়া, গাবতলী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি তারিকুল ইসলাম, কাহালু বীরকেদার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি খোরশেদ আলম সরদার ও সদস্য মনসুর আলী, চেলোপাড়ায় ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ ও যুবলীগ কর্মী বিল্লু হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।
পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানান, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ে একের পর এক হত্যার শিকার হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই একই দলের কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত। আর ঘাতকদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতারাও একই দলের। ফলে মামলা দাখিলের সময়ই নিরপরাধ এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপর দায় চাপানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে মামলাগুলো শুরুতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করলেও রাজনৈতিক চাপের কারণে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। বগুড়ার পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হকও স্বীকার করেন যে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। পুলিশ এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দিবে না। তিনি আশিষ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করে বলেন এখানে যেমন কাউকে ছাড় দেয়া হয়নি, তেমনি সুজন কিংবা রেক্কাত হত্যার সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
