‘দক্ষিণ এশিয়ার পানি সম্পদ ঃ বৈরিতা থেকে সহযোগিতা’ বিষয়ক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার অসহযোগিতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় মৃত্যু, দ্রারিদ্য ও পরিবেশ বিপর্যয় বাড়ছে। পানি সম্পদ রক্ষা এবং সংকট মোকাবেলায় সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) আয়োজিত সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। সম্মেলন উদ্বোধন করেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। বাপার সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এএসএম শাহজাহানের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সম্মেলন আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বেন-এর গ্লোবাল সমন্বয়কারী ড. নজরুল ইসলাম, সম্মেলন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ড. মো. খালেকুজ্জামান, বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. এসএম নজরুল ইসলাম, বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিন। সম্মেলনে সরকারি-বেসরকারি ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-আয়োজক এবং ৭৭টি সামাজিক উন্নয়ন সংগঠন এই সম্মেলনের সহযোগী হিসেবে অংশ নিচ্ছে।
পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দিন দিন পানির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু পানি প্রাপ্যতা কমছে। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পানি নিয়ে বৈরিতা তৈরি হচ্ছে। শুধু দেশে দেশেই নয় পানি নিয়ে একই দেশের বিভিন্ন প্রদেশেও বৈরিতা বাড়ছে। তাই এই সংকট মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পানির প্রাপ্যতা ছাড়া মানুষ ও অন্যান্য জীবের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, উজান থেকে যে পানি আসে, ভাটিতে যারা থাকেন তাদের অধিকার আছে সেই পানি ব্যবহারের, একইভাবে উজানের মানুষেরও অধিকার আছে এই পানি ব্যবহারের। গঙ্গার পানির জন্য চুক্তি হয়েছে। চুক্তি হলেও তার বাস্তবায়ন নেই। অন্যান্য পানির চুক্তিগুলোও হবে। সহযোগিতা পেলেই কেবল চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, শিল্পায়নের মাধ্যমে যেসব শিল্প কারখানা পরিবেশ দূষণ করছে তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। চার বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. এসএম নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বাংলাদেশে দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল অঞ্চল ডুবে যেতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে আর্সেনিকের পরিমাণ বাড়ছে। মত্স্য ও কৃষিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। এ কারণে বাপা ও বেনসহ এই ধরনের সংগঠনকে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, অনেক শিল্প কারখানা পরিবেশ দূষণ করছে। এর ফলে আমাদের জীবন ও পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনছে। শিল্প কারখানার দূষণের দিকে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া উচিত।
বাপার সভাপতি এএসএম শাহজাহান বলেন, নিরাপদ পানি ছাড়া সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়। তবে পৃথিবীতে আজ পানির ব্যবহার ও অপব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপর নানা প্রকার নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-চীনের মধ্যে সহযোগিতামূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক নদী ও পানি সম্পদ ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাটাও সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ হবে।
বক্তারা আরো বলেন, পানি একটি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ইস্যু। পানি সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগামী বিশ্বে পানির সংকট হবে সবচেয়ে বড় সমস্যা। নদীর প্রতি যত্নশীল না হলে বাংলাদেশে পানি সমস্যা সমাধান করা কঠিন হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে আন্তঃনদী বিষয়ক সমঝোতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নদীগুলোকে রক্ষার জন্য সুষ্ঠু নীতিমালার বাস্তবায়ন জরুরি। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ করে নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নদীর নাব্যতা রক্ষায় খননের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দও জরুরি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ‘আন্তঃদেশীয় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত্ দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পানি সংকট মোকাবেলায় আমাদের সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নদ-নদীগুলো রক্ষায় বহুপাক্ষিক চুক্তি করা প্রয়োজন। পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার পানি সংকট মোকাবেলা, মৃত্যু এবং বহুলাংশে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোপাল এস চিন্তন বলেন, অন্তঃদেশীয় নদীগুলোর সমস্যার সমাধান করতে হলে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেলি এলি এবং ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাগ হিল তাদের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ২ দিনব্যাপী সম্মেলনের সাধারণ সভায় গতকাল ফারাক্কা ব্যারাজ, ভারতের সম্ভাব্য আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, টিপাইমুখ ড্যাম এবং দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর অবস্থা নিয়ে চারটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে ২০টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। আজ চারটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে ২০টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হবে।
সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ২৫ নদী বিশেষজ্ঞসহ দেশের নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের প্রায় ৪০০ জন অংশ নিচ্ছেন।
