দু ই প্র জ ন্ম

গানের মাঝেই স্বপ্ন আঁকা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৫
গানের মাঝেই তারা স্বপ্ন আঁকেন হূদয়ের ভালোবাসা দিয়ে। দুই প্রজন্মের এই দুই প্রতিনিধি নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে গানের ভুবনে সফল হয়েছেন। তারা হলেন ব্যান্ড সংগীতজগতের কিংবদন্তি গীতিকবি লতিফুল ইসলাম শিবলী ও এই প্রজন্মের গীতিকার রবিউল ইসলাম জীবন। আমাদের এবারের আয়োজনে দুই প্রজন্মের সফল এই গুণী মানুষদের নিয়ে বসেছিল এক আড্ডা। সেখানে তারা বলেছেন তাদের গানের নানা গল্প ও ভাবনা নিয়ে। সেই আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু অনেক স্বপ্ন নিয়ে নিজের পছন্দের কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে সবাই কাজ শুরু করেন। কখনও নাটক, কখনও গান লিখে বা গেয়ে বনে যান তারকা। কেউ কেউ নিজেদের খ্যাতি ধরে রাখতে পারেন, আবার কেউ হয়তো নিজের অর্জিত জায়গা থেকে ছিটকে পড়েন। গানের এরিনাতে কাজ করে সফল হয়েছেন গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী ও রবিউল ইসলাম জীবন। দুই প্রজন্মের এই দুই জনপ্রিয় গীতিকারকে নিয়ে প্রজন্ম আড্ডায় বসেছিল উত্তরায়। শিবলী ভাইয়ের অফিসে শীতের বিকেলে জম্পেস আড্ডায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল প্রতিটি মুহূর্ত। শুরুতে দুই গীতিকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, একটি গান সৃষ্টির পর অনুভূতি কেমন হয়? জবাবে গীতিকবি শিবলী বললেন, ‘প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে এক ধরনের আনন্দ থাকে। তাই গান লেখার পর নিজের ভেতরে ভালো লাগার একটি অনুভূতি ছুঁয়ে যায়।’ তার কথা শেষ হতেই জীবন বললেন, ‘গান লেখার পর নিজেকে অনেক হালকা লাগে।’ গীতিকবি হয়ে ওঠার গল্প জানতে চাইলে শিবলী মৃদু হাসলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হারিয়ে গেলেন নিজের সোনালি অতীতে। এরপর গল্পের ঝাঁপি খুলে বলা শুরু করলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়েই আমার বেড়ে ওঠা। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় স্বৈরশাসকের জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে নাটোর থেকে ঢাকায় চলে আসি। অভিনয়ের উপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষে গ্রুপথিয়েটার নাট্যচক্রের সঙ্গে মঞ্চনাটকে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে নিজেকে বিকশিত করতে থাকি শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে। আর এভাবেই অভিভাবকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গানপাগল একদল তরুণ ব্যান্ডশিল্পীদের নিয়ে মেতে উঠি। বাংলা গানের ধারা পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করি। সেইসাথে প্রথা ভাঙার যুদ্ধের সৈনিক হয়ে নিজেকে গড়ে তুলি আপাদমস্তক ‘রক’ হিসেবে। আধুনিক জীবনযন্ত্রণাগ্রস্ত তারুণ্যের ভাষাকে উপস্থাপন করেছি অত্যন্ত সহজসরল ‘রক’-এর ভাষায়। সেই থেকে শুরু। গান লেখার পাশাপাশি মডেলিংও করতাম। ‘কমপ্লিট ম্যান’ খ্যাত ঝুঁটিবাঁধা সেঞ্চুরি ফেব্রিকসের সেই মডেলটিও ছিলাম আমি। বিটিভির যুগে আমার লেখা প্রথম নাটক ‘তোমার চোখে দেখি’, ১৯৯৫ সালে প্রচার হয়। ১৯৯৭ সালে আমার লেখা নাটক ‘রাজকুমারী’তে মির্জা গালিব চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ইচ্ছে হলে ছুঁতে পারি তোমার অভিমান’, যা প্রকাশ হয় ১৯৯৫ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তুমি আমার কষ্টগুলো সবুজ করে দাও না’ প্রকাশ হয় ২০১০ সালে। আমার লেখা ‘বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন’ (১৯৯৭) নামে ব্যান্ড সংগীতের ওপর লিখিত প্রথম এবং একমাত্র গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলা একাডেমী প্রকাশ করেছে। নিজের লেখা, সুর ও কম্পোজিশনে এবং নিজের কণ্ঠে গাওয়া আমার প্রথম অ্যালবাম ‘নিয়ম ভাঙার নিয়ম’ বাজারে আসে ১৯৯৮ সালে।’ এরপর রবিউল ইসলাম জীবন জানালেন তার শুরুর গল্পটি। তার ভাষ্যে, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন আবর্তিত হয়েছে ক্রিকেটকে ঘিরে। স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়া নয়তো ধারাভাষ্যকার। ক্রিকেট নিয়ে নানা পাগলামি করেছি। ক্লাসের ফাঁকে সুযোগ পেলেই পাড়ার ছেলেদের নিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। পড়াশোনা করেছি চট্টগ্রাম কর্মাস কলেজে। তখন এইচএসসিতে পড়ি। চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় জাতীয় ক্রিকেট দল যেত খেলতে। যখনই কোনো ক্রিকেট টিম সেখানে আসত, আমি তাদের সাথে দেখা করতে যেতাম। তাদের অটোগ্রাফ নিতাম ও তাদের সাথে ছবি তুলতাম। সেই দিনগুলো ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।’ গীতিকার হওয়ার গল্প জানতে চাইলে জীবন মৃদু হাসলেন। কয়েক সেকেন্ড নিরবতার পর তিনি বলেন, ‘আমার গান লেখার শুরুটা অনেক মজার বলা যায়। তখন ২০০২ সাল। একদিন দুপুরে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি। রাস্তায় কয়েকটি লাইন মাথায় আসে। বাসায় গিয়ে লিখে ফেললাম। তখন মনে হলো এটা নিঃসন্দেহে গান হতে পারে। এরপর লিখে ফেলি প্রায় ৫০টির মতো গান। একসময় চিন্তা করলাম, যদি এখানে থাকি তবে গান নিয়ে বেশি কিছু করতে পারব না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে ঢাকায় যেতে হবে। সুযোগের অপেক্ষায় থাকলাম। কিছুদিন পর কলেজের চৌকাঠ পেরিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওই সময় ঢাকায় আসার সিদ্ধান্তটা ছিল আমার জন্য অনেক কঠিন। কেননা ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করার জন্য যে সাপোর্ট দরকার তা আমার কখনোই ছিল না। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। আমার মা এক মেয়ে ও দুই ছেলের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। এজন্য তার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। যাই হোক, বলা যায় শূন্য হাতেই ঢাকায় আসি। এসেই কপাল গুণে কয়েকটি টিউশনি জুটিয়ে ফেলি। ছাত্র পড়াই, নিজে পড়ি এবং গান বের করার চিন্তার জাল বুনি। এরই মধ্যে একটি জাতীয় দৈনিকের ফান ম্যাগাজিনে লেখালেখি শুরু করি শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের তাগিদে। কিছুদিন না যেতেই ওই ফান ম্যাগাজিনটি বন্ধ হলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কেননা লেখার জন্য তখন টিউশনি ছেড়ে দিয়েছি। কী করা যায় তা ভাবতে ভাবতে ওই পত্রিকার এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে বিনোদন পাতায় লেখা শুরু করি। ততদিনেও নিজের স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। তাই আমার লেখা গান কীভাবে প্রকাশ হবে তা নিয়ে টেনশনের সীমা ছিল না। তাই গান নিয়ে কখনও শিল্পী, কখনও সুরকার, কখনোবা স্টুডিওতে ধন্না দিয়েছি। অনেক চেষ্টা ও সাধনার পর নিজের মনের লালিত স্বপ্নটা পূরণ হয় ২০০৭ সালের প্রথম দিকে। আসিফের ‘হূদয়ে রক্তক্ষরণ’ অ্যালবামে আমার লেখা দুটো গান প্রকাশ হয়। গান দুটির শিরোনাম ছিল ‘ভালোবাসি বলে’ ও ‘ভাড়াটিয়া চাই’। এগুলো সুর করেন রাজেশ ও পল্লব স্যান্নাল। গান প্রকাশের পর আমার মতো আনন্দিত কেউ হয়নি। দিন দিন গানের প্রতি আরও ভালোবাসা তৈরি হতে লাগল। এরপর অনেক সময় গড়িয়েছে। সময়ের সাথে সাথে নিজেকে গান লেখায় ঋদ্ধ করেছি।’ নব্বই দশকজুড়ে আপনি প্রায় ৩০০ গান লিখেছিলেন শিবলী। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গানের শিরোনাম, তিনি বললেন,‘আমার লেখা ‘কষ্ট পেতে ভালবাসি’, ‘কেউ সুখি নয়’, ‘হাসতে দেখো-গাইতে দেখো’, ‘নীল বেদনা’, ‘আহা জীবন’, ‘একটা চাকরি হবে চাঁদমামা’র মতো অসংখ্যা জনপ্রিয় গান গেয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। নগরবাউল জেমস গেয়েছেন আমার লেখা আর সুরে ‘জেল থেকে বলছি’, ‘গিটার কাঁদতে জানে’, ‘প্রিয় আকাশি’, ‘নাটোর স্টেশন’, ‘একজন বিবাগী’, ‘এ-শহরের কত-শত অট্টালিকার ফাঁকে’সহ আরও অসংখ্য গান। এ ছাড়া রয়েছে মাইলস গেয়েছে ‘পলাশির প্রান্তরে’, ‘শেষ ঠিকানা’, ‘হ্যলো ঢাকা’ আর সোলস গেয়েছে ‘হাজার বর্ষা রাত’। তুমুল জনপ্রিয় গান ‘তুমি আমার প্রথম সকাল’ গেয়েছেন তপন চৌধুরী ও শাকিলা জাফর।’ এ পর্যন্ত জীবনের লেখা গান প্রকাশ হয়েছে প্রায় দেড় শ। নিজের উল্লেখযোগ্য গান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসিফ ও মুন্নীর গাওয়া ‘ফিরবো না আজ বাড়ি’, পড়শীর ‘লজ্জা’ ও ‘মেঘলা দুপুর’, দূরবীনের ‘জ্বলে ওঠা বাংলাদেশ’, তৌসিফের ‘অনুকাব্য’, ক্লোজআপ ওয়ান খ্যাত শিল্পী অপুর ‘আজ বৃষ্টির দিন’, কিশোরের ‘নিখোঁজ সংবাদ’, বালাম ও জুলির ‘তুমি হীনা’ ইমরানের ‘দোটানা’, তৌসিফ ও মুন্নীর ‘এক পা দু’পা’, পুলকের ‘যাযাবর পুলক’ আরফিন রুমির ‘সহে না যাতনা’ ও ‘প্রেমের পথে’, খুঁটি চলচ্চিত্রে ন্যান্সি ও বেলাল খানের গাওয়া ‘দলিল’, আরেফিন রুমি ও শুভ মিতার ‘প্রতিদিন দেখি তোমায়’, শফিক তুহিন ও পড়শীর ‘প্রথম সূর্যোদয়’, জুয়েল ও কনার ‘কোথায় যাবি’, শাহীন ও বিউটির ‘তোমার জন্য’। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জীবন বিভিন্ন থিম সঙের কাজ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মাসেতু সিম সঙ ‘ড্রিম কামস ট্রু’ শিরোনামে গানটি গায় রমা। সেই সাথে এনটিভির নতুন থিম সঙ, আতিক, লিজা ও শশী গাওয়া পোশাক শ্রমিক নিয়ে গান গর্ব ইভেন্টের ‘হেসে উঠে বাংলাদেশ’, আজম খান স্মরণে ‘গুরু তোমায় সালাম’ গানটি গেয়েছেন বিপ্লব ও আগুন, সাবিনা ইয়াসমীন ও ইমরানের গাওয়া দেশের গান ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’।’ বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলে শিবলী বলেন, ‘বর্তমানে দ্বিতীয় অ্যালবামের কাজ নিয়ে আছি। ‘বিশ্বাসের গান’ নামেই অ্যালবাম করার পরিকল্পনা। এর সংগীতায়োজন করছেন নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী টিটু এবং অভিজিত্ জিতু। অ্যালবামটি এক্সপেরিমেন্টাল হবে। নাটক, কবিতা এবং গানের এক সংমিশ্রণ থাকবে তাতে। পুঁজিবাদবিরোধী গান থাকবে। এ ছাড়া ২/৩টি ইংরেজি গান রাখার পরিকল্পনা আছে। আমার ব্যান্ডের নাম ‘সং অব বিলিভ’। এ ছাড়া আমার চিত্রনাট্যে প্রথম পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র ‘পদ্ম পাতার জল’ নির্মাণ করছেন তরুণ পরিচালক তন্ময় তানসেন।’ নতুন যারা গান লিখছেন তাদের জন্য পরামর্শ হিসেবে লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ‘একজন গীতিকারকে প্রথমেই কবি হয়ে উঠতে হবে। কবি হলেই তাদের গানগুলো কাব্যময় হয়ে উঠবে।’ বাংলা গানের প্রসারে আমাদের করণীয় কী? এমন প্রশ্নের জবাবে গীতিকবি শিবলী বলেন, ‘বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা এখন হুমকির মুখে। তাই এখনই প্রয়োজন একদল তরুণ তুর্কির। যারা কবিতা, গানে বিপ্লব ঘটাবে।’ তার কথা শেষ হতেই জীবন বলেন, ‘দেশাত্ববোধকে হূদয়ে লালন করেই গান করতে হবে।’