এ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি, কিন্তু কৃষি যুগ যুগ ধরে রয়ে গেছে নাগরিক চিন্তাভাবনার আড়ালে। কৃষকরা দেশের ১৬ কোটি মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার জন্য কঠিন কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করছে, কিন্তু নতুন প্রজন্ম তো দূরের কথা শহরের আজকের নাগরিকরা পর্যন্ত কৃষি উত্পাদন প্রক্রিয়ার ভেতরের কষ্টগুলো অনুভব করতে পারে না। আগামী প্রজন্মের মাঝে কৃষি বিষয়ক কার্যক্রম, কৃষি ও কৃষকের গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’-এর একটি উদ্যোগের নাম ‘ফিরে চল মাটির টানে’। প্রতিবারের মতো প্রজন্মের চার প্রতিনিধিদের নিয়ে এবারও শুরু হয়েছে নাগরিক শিক্ষার্থীদের কৃষি উত্পাদন ও বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং শ্রম সম্পর্কিত ব্যবহারিক ধারণা প্রদানের এই কার্যক্রম। তাদের নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজন। পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
ফয়সাল মোহাম্মদ শান
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, বাংলাদেশ
সাইকেলে করে ঘুরতে ভালোবাসেন খুব, সাইক্লিংয়ের খবর শুনলে তাকে কে আটকায়! সেই ছেলেটিকেও মাটির টান থেকে দূরে রাখা যায়নি। চ্যানেল আইয়ের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ফিরে চল মাটির টানে’ তাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষকের সাথে কাজ করতে। আর সেই সুযোগটা তিনি পেয়ে গেলেন হঠাত্ করেই। সৌভাগ্যও বলতে হবে বৈকি! তিন-চারশ জনের মধ্য থেকে বারো, সেখান থেকে দুইজনের একজন হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়! দারুণ এক মেধার লড়াই পার করে শান চলে এলেন শেষ চারে।
আর সবার মতোই শানকে কাজ করতে হয়েছিল মুন্সীগঞ্জের কেওয়াটখালীতে। বাজার থেকে দরদামের মাধ্যমেই তাদেরকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। নতুন আর অনভিজ্ঞতার কারণেই তাদের দাম উঠল খুব কম। মাত্র একশ টাকায় দিনভর পরিশ্রম। সাথে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে। শান ও তাদের টিমকে দেখে তো ভিড় হয়ে গিয়েছিল। তাদের পিছু পিছু গ্রামের অনেক লোকও গেল মাঠে। শান মোটামুটি এই ধরনের ব্যবহারিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, যদিও কৃষিকাজ হাতে কলমে করা হয়নি কখনও। যাই হোক, একটু পরেই বুঝতে পারলেন পানিতে নামতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। শান নেমে গেলেন তার দল নিয়ে কাজ করতে, আশেপাশের মানুষজন যেমন আগ্রহ নিয়ে দেখছিল, তেমনি পারলে সাহায্যও করছিল। শানদের কাছে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, তাদের পাশের মাঠেই অনেকে কাজ করছিল যারা একই সাথে শুরু করেও তাড়াতাড়ি আর সুন্দরভাবে শেষ করছিল কাজটা, তাদের কাছে কাজটা করতে যেন কষ্টও হচ্ছিল না। এভাবেই বিকাল চারটায় কাজ শেষ হলো তাদের। শান মনে করেন, এই কাজ করে তাদেরকে বিন্দুমাত্র ছোট করা তো হয়ইনি বরং কৃষকদেরকে সম্মান জানাতে শিখছে এই প্রজন্ম। এই প্রজন্মের কাছে কৃষি আর কৃষক কেবল বইয়ের পাতায় আর ছবিতে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখান থেকে এখন তা উঠে আসছে বাস্তবে এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমেই। ‘ফিরে চল মাটির টানে’র সাথে কাজ করতে গিয়ে শান দেখেছেন কত মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে কৃষকেরা। তাদের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই আধুনিক দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলার, সেই ভাবনাগুলো কৃষিক্ষেত্রে কাজে লাগানোর। শান ছোটবেলা থেকেই নিজের মতো করে ভাবতে পছন্দ করেন, সেইভাবে কাজও করেন তিনি। প্রচুর এডিটিংয়ের কাজ করেন কম্পিউটারে, সেটা তার সৃজনশীলতার বড় খোরাক। বাবা-মা তার কাজে যে খুব উত্সাহ দেন তা না, আবার বাঁধও সাধেন না। তাদের এই সহায়তা না থাকলে তিনি এগোতে পারতেন না বলে জানালেন। শান বিশ্বাস করেন, পুঁথিগত বিদ্যাই জীবনে চলার জন্য যথেষ্ঠ নয়। তার খুব শখ, তিনি নিজের যোগ্যতায় এমন একটা পর্যায়ে যাবেন যেখানে তার দ্বারা আশপাশের আর দশজন মানুষও উপকৃত হবে। ‘ফিরে চল মাটির টানে’ তার সেই প্রত্যয়টা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আশা করা যায়, তারুণ্যের এমন ভাবনাই আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ছবি:দীপঙ্কর দীপু
ফয়সাল মোহাম্মদ শান
ডাক নাম :শান
জন্মতারিখ ও স্থান :৮ এপ্রিল, নোয়াখালী
মায়ের নাম :বিবি মরিয়ম
বাবার নাম :মো. মাহবুবুল আলম
প্রথম স্কুল :ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুল
প্রিয় মানুষ :ওয়াসফিয়া নাজরীন
প্রিয় উক্তি :লাইফ ইজ বিউটিফুল।
প্রিয় পোশাক :হাফপ্যান্ট, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :মুভি দেখে, সাইক্লিং করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :যেটা চাই, সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা।
-----
ইশরাত জাহান অনন্যা
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
তার দাদুবাড়ি গাজীপুরে, নানুবাড়ি রংপুরে। ছোট্ট মেয়েটার খুব শখ গ্রাম ঘোরার। স্কুলে যখন পড়তেন, শীতের ছুটিতেই গ্রামে চলে যেতেন। কত আয়োজন করে ঢেঁকিতে চাল কোটা হতো, সেই চালের গুঁড়ায় হতো পিঠা। শীতের সকালে সবাইকে নিয়ে পিঠা খেতে গিয়ে অনেক মজা হতো! কিন্তু সেদিনের সে মেয়েটির সুযোগ হয়নি কীভাবে এই ফসল উত্পাদন হচ্ছে তা দেখার। চ্যানেল আইয়ের সুবাদে এবার গ্রামের আটপৌড়ে ঘরের চাষিদের সাথে একই তালে কাজ করে প্রমাণ করছেন বাবা-মা তার নাম অনন্যা রেখে ভুল করেননি। শত ব্যস্ততা, পড়াশোনা আর কাজের মাঝেও তিনি অস্তিত্বে গ্রামকে লালন করেছেন। শীতের ভোরেও অনন্যা নেমে গিয়েছেন কৃষকের সাথে পানির মাঝে ধানের চারা লাগাতে। আক্ষরিক অর্থেই যেন তাদের অনুষ্ঠানের নাম ‘ফিরে চল মাটির টানে’, এখানে সত্যিই সত্যিই মাটির টানে তারা পৌঁছে গিয়েছিলেন কৃষি জীবনে।
অনন্যা আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের
প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী, বরাবরের মতোই ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে আড্ডার মাঝে শুনলেন ‘ফিরে চল মাটির টানে’র টিম এসেছে ভার্সিটিতে। কৌতূহল নিয়ে গেলেন সেখানে দেখতে কী হচ্ছে। বসে পড়লেন তাত্ক্ষণিক একটা পরীক্ষায়। পাঁচ লাইনে গুছিয়ে লিখে ফেললেন আমাদের দেশের কৃষিব্যবস্থার বর্তমান হালচাল। ভাবতেও পারেননি তিনি পার হয়ে যাবেন প্রাথমিক বাছাই। যাই হোক বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিয়ে তিনি শেষ চারেও পৌঁছে গিয়েছিলেন। বাসার বাইরে তার কখনও থাকা হয়নি, বাবা-মায়ের খুব উত্কণ্ঠা। তবুও তারা মেয়ের আগ্রহে সম্মতি দিলেন, উত্সাহ দিলেন। সেটা না হলে হয়তো সম্ভব হতো না কাজ করা।
কুয়াশামোড়া এক সকালে তারা রাজধানী ছাড়লেন। গ্রামের হাটে ঘোরা হয়েছে অনন্যার, তবে সেটা ঘোরার খাতিরেই। এবার যে কাজ খুঁজতে হবে! সাথের তিনজন মিলে কাজ একটা পাওয়া গেল বটে, তবে সেটাতে তাদের খুব সামান্য অর্থ দেওয়া হবে। যাই হোক, অনন্যা তার বন্ধুদের নিয়ে নেমে গেলেন মাঠে। তাদের মহাজন বা যিনি নিয়োগ করেছেন তিনিই সরাসরি মাঠে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে শুরু হলো কাজ। আর এই তীব্র শীতে পানিতে নেমে চারা রোপনের অভিজ্ঞতা খুব সুখের না হলেও অনেক শিক্ষণীয় ছিল। কৃষকদের ফলানো ফসল আমরা আমোদ করে খাই, অথচ তারা কিন্তু সেরাটা বাজারে বিক্রির পর নিম্নমানেরটাই নিজেদের জন্য রেখে দেয়। তাদের ছেলেমেয়েরা সেটা খেয়েই বড় হচ্ছে। আশার কথা, তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শিখছে, হয়তো তারা এ কাজ করবে না, আর করলেও আধুনিক উপায়ে করবে। এতসব ভাবনার মাঝে কেটে গিয়েছিল সেদিন, দুপুরে আটপৌড়ে বাঙালি খাবার আর রাতে নিজেদের বাজার করে রান্না করা খিচুরি, ক্ষুধার মাঝে সেটাই যেন অমৃত হয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে। এতকিছুর পর যখন একশ টাকা হাতে পেয়েছিলেন, আনন্দটা আর সইছিল না অনন্যার।
মুক্তিযোদ্ধা বাবা আর গৃহিণী মায়ের আদরের ছোট সন্তান অনন্যা। দুই ভাই রাজীব আর সজীবেরও একমাত্র আদরের ছোট বোন তিনি। সবার ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আনন্দেই কেটেছে তার শৈশব। এখন তার ইচ্ছা—ভবিষ্যতে আর যাই করেন, গ্রামের এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করা। তার এই ভাবনাটাকে আমরা স্বাগত জানাই।
ছবি:দীপঙ্কর দীপু
ইশরাত জাহান অনন্যা
ডাকনাম :অনন্যা
জন্মতারিখ ও স্থান :২৪ জুন, ঢাকা।
মায়ের নাম :শামসুন নাহার
বাবার নাম :মো. সিরাজুদ্দীন
প্রথম স্কুল :টিএন্ডটি গালর্স হাইস্কুল
প্রিয় পোশাক :শাড়ি ও পাশ্চাত্য
প্রিয় উক্তি :এই আকাশে আমার মুক্তি আলো আলো, ধূলায় ধূলায়, ঘাসে ঘাসে।
প্রিয় মানুষ :আমার মা-বাবা
অবসর কাটে যেভাবে :অনেক বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :সৌভাগ্য এবং পরিশ্রম।
-----
আশফাক-উর-রহমান আসিফ
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
দেশের অভিজাত একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম। শিক্ষক ক্লাস শেষে ঘোষণা দিলেন মিডিয়াব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ এসেছেন তার ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর টিম নিয়ে, একটা সেমিনার করবেন। সবার সাথে সাথে আসিফও যোগ দিলেন তাতে। পরবর্তীতে চ্যানেল আই অফিসে আয়োজিত সাক্ষাত্কার ও মেডিকেল চেকআপের পর শেষ চারে উঠে আসেন তিনি। এভাবেই শুরু করেন ‘ফিরে চল মাটির টানে’র এবারের অংশগ্রহণকারী আসিফের। নির্ধারিত দিনে ভোর বেলায় রওনা দিলেন মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে। প্রত্যন্ত সেই গ্রামের বাজারে গিয়ে তারা আর সব কৃষকদের সাথে কাজ খুঁজছিলেন। তাদের অনভিজ্ঞতার কথা শুনে কেউ কাজে নিতে চাইছিলেন না। পরবর্তীতে একজন তাদেরকে নিতে রাজি হলেন। তবে বিনিময়ে তাদেরকে চারশ টাকা দেওয়া হবে। অতঃপর আসিফ তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে চলে গেলেন সরাসরি মাঠে। চ্যানলে আইয়ের ক্যামেরা সব সময় তাদের সাথে ছিল। বলাই বাহুল্য গ্রামের সাধারণ দশজন কৃষকের মতো তাদের হাতেও ছিল না মুঠোফোন। সকালেই ধানের চারা হাতে নিয়ে তাদের নেমে পড়তে হলো কাজে। আসিফ খুব বেশি জানতেন না এই বিষয়ে। টিভি দেখে যতটুকু জানা আর কি! যাই হোক, সীমিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা নেমে পড়লেন পানির মধ্যে, তাপমাত্রা তখন পনের ডিগ্রির নিচে হবে। হয়তো শহরের বিলাসী ঘরে তখন চলছে শীত উদযাপন। ঘড়িতে তখন সকাল আটটা, তাদের কাজ শুরু হলো। আসিফের প্রথম প্রথম একটু বুঝতে সমস্যা হলেও পরে ঠিকঠাক বুঝে নিলেন। আশপাশের মানুষের অনেকেই অবাক হচ্ছিলেন আবার সাহায্য করতে এগিয়েও আসছিলেন। কাজ করতে করতে সূর্য জানান দিল যে দুপুর হয়েছে, খাবার এসে পৌঁছাল। শহুরে ক্লাসের ফাঁকে দামি ফাস্টফুড নয়, পুরোদস্তুর গ্রামীণ খাবার। কৃষকের নিত্যদিনের খাবার। কড়া ঝালের আলু ভর্তা আর জগে করে আনা ডাল খুব আমোদ করেই খেলেন তারা। তারপর আবার নেমে পড়লেন কাজে। মাঝে মাঝে শাইখ সিরাজ দেখছিলেন তাদের কাজ আর দিচ্ছিলেন উত্সাহ। গ্রামের লোকজনও অনেক সহায়তা করেছিলেন। বিকালে কাজ শেষে আসিফের হাতে তুলে দেওয়া হলো একশ টাকা। খুব সামান্য মনে হচ্ছিল তার কাছে, তবুও জীবনের প্রথম কৃষিকাজ থেকে উপার্জন। এই কাজের উপরেই দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি, এই কাজ করেই বেঁচে আছে দেশের কোটি মানুষ। সেই টাকা নিয়ে তারা ছুটেছিলেন বাজার করতে। কোনোমতে রাতের রান্না আর উত্সাহ নিয়ে খাওয়া, এইতো কেটে গেল তাদের একটা দিন। অনেক পরিশ্রম হয়েছিল পরের দিনেও। তবুও বাংলার কৃষকের যুগ যুগ ধরে চলে আসা চিরায়ত বঞ্চনার সিকিভাগ অনুভব করতে পেরেই তারা সফল। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন কতটা পরিশ্রম করে কৃষকেরা ফসল ফলাচ্ছে। আসিফ তার বাবা-মায়ের ছোট সন্তান। খুব আদরের সন্তানকে টেলিভিশনে কৃষিকাজ করতে দেখে খুশি হয়েছিলেন তারা। তাদের তৃপ্তি যে, ছেলেটার কিছুটা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা তো হলো, সেটাই বা কম কি! আসিফের বাবা ব্যবসায়ী আর মা গৃহিণী। সময় পেলেই আসিফ বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসে যান। ভবিষ্যতে একজন ফিল্মমেকার হতে চান তিনি। তার জন্যে শুভকামনা রইল আমাদের।
ছবি:দীপঙ্কর দীপু
আশফাক-উর-রহমান
ডাকনাম :আসিফ
জন্মতারিখ ও স্থান :৩১ আগস্ট, ঢাকা
মায়ের নাম :শাহানাজ রহমান
বাবার নাম :শফিউর রহমান
প্রথম স্কুল :উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :নো পেইন, নো গেইন
প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :জিম করে, ঘুরে
সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম ও সততা।
-----
সাদিয়া বিনতে ওমর
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, বাংলাদেশ
ইট-কাঠের এই শহরেই বেড়ে ওঠা মেয়েটার। প্রতিদিন ভোর হয় গাড়ির হর্নের শব্দে। রাস্তায় বের হলে চিরচেনা জ্যাম আর ময়লার পাহাড়। সেই মেয়েটার একদিন ঘুম ভাঙল পাখির ডাক শুনে। কুয়াশাঘেরা মেঠোপথ ধরে হেঁটে সকাল শুরু করলেন। সাদিয়া নামের এই শহুরে মেয়েটা সেদিন ‘ফিরে চল মাটির টানে’ প্রোগ্রামের আওতায় চলে গিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জে। বন্ধু সহপাঠীদের সাথে মিলে কাজ করবেন মাঠে, খুব উত্সবের আমেজ ছিল নিজেদের মাঝে। সাদিয়ার সেইদিনের আগ্রহটার সূচনা ভার্সিটির ক্লাস থেকেই, শাইখ সিরাজের ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর টিমের কথা শুনেই চলে গিয়েছিলেন সেমিনারে। দুইধাপে উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দিয়েছিলেন এবারের আয়োজনে। এদিকে কৃষি বিষয়ে নিজেদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তাই কীভাবে কাজ করবেন সেটাও একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাদিয়া জানালেন, গ্রামের লোকেরা খুব সহায়তা করেছিলেন তাদের। যে বাড়িতে তারা কাজ করতে গিয়েছিলেন, সেই বাড়ির লোকেরাও তাদের বেশ খাতির করেছিলেন। তবে সেটা কাজের সময় নয়। তাদেরকে সাধারণ চাষিদের খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, তাতে ছিল না কোনো জৌলুস। প্রথমদিন ভোরে কাজের অভিজ্ঞতাটা অন্যদের মতো তার কাছেও ছিল অনেক কষ্টদায়ক। সাদিয়া শামুকে পা কেটে ফেলে পড়লেন বিপদে। তাত্ক্ষণিকভাবে চিকিত্সারও ব্যবস্থা হয়েছিল তার। অথচ আমাদের নিভৃত পল্লীতে কাজ করা সেইসব কৃষকদের কখনও চিকিত্সার এই সুযোগটুকুও থাকে না। প্রকৃতি তাদেরকে অন্য এক মমতায় আপন করে নিয়েছে হয়তো, তা না হলে এ রকম পরিবেশে কাজ করেও তারা সুস্থ সবলভাবে দিন কাটাচ্ছেন, দেখলে অবাক হতে হয়। এমনভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনী শোনাচ্ছিলেন সাদিয়া। রাতের বেলায় খাবারের আয়োজনটা যে নিজেদেরকেই করতে হবে সাদিয়াদের। তারা বিকালে প্রাপ্ত উপার্জনের অর্থ নিয়েই ছুটলেন বাজারে। খিচুরি রান্না করার জন্য যা দরকার তার সব কিনে আনলেন। যদিও পরিমানের আনুপাতিক হারে তা কমবেশি হয়ে গিয়েছিল, হাসতে হাসতে জানালেন তিনি। রাতের খাবার শেষে তাদের কিছু সময় টিভি দেখারও সুযোগ হয়েছিল, চ্যানেল আইয়ের রাতের সংবাদে তাদের সেদিনের কাজের খণ্ডিত অংশও দেখানো হয়েছিল। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সাদিয়ার কাছে সেদিন কোনো ফোনও ছিল না, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বাসায়। সাদিয়া আর দশজন সাধারণ চাষি পরিবারের মতো মেটেঘরে রাত কাটালেন। সেই গ্রামের পরিবেশে থাকা আর কাজ করার অভিজ্ঞতা তার জীবনে বড় একটা সঞ্চয় বলে মনে করেন সাদিয়া। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়াতে তার কোনো আবদার বাবা-মা অপূর্ণ রাখেন না, তবুও গ্রামে গিয়ে এ রকম অনন্য এক অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি নিয়ে ফেরায় বাবা-মাও যারপরনাই আনন্দিত। যৌথপরিবারে ছেলেবেলা কাটানো সাদিয়ার বাবা ব্যবসায়ী আর মা গৃহিণী। সাদিয়া এখন মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম পড়ছেন। আগামীতে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে একজন দক্ষ সংবাদকর্মী হতে চান তিনি।
ছবি :দীপঙ্কর দীপু
সাদিয়া বিনতে ওমর
ডাকনাম :দিয়া
জন্মতারিখ ও স্থান :৮ অক্টোবর, ঢাকা
মায়ের নাম :সাইদা পারভীন
বাবার নাম :ওমর রেজা আব্দুল্লাহ
প্রথম স্কুল :নিড্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :‘ট্রাই টু বি অনেস্ট’
প্রিয় পোশাক :সালোয়ার-কামিজ
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের কাজের ভালো অংশটুকু সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।
-----
নেপথ্যে যিনি
গত একত্রিশ বছর যাবত ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’ নিয়ে কাজ করছেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই-এর পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। তার প্রতিটি কাজ থেকেই উঠে আসে কৃষকের হাসি-কান্না, দুঃখ-দুর্দশার কথা। নাগরিক শিক্ষার্থীদের কৃষি উত্পাদন, বাজারব্যবস্থা ও শ্রম সম্পর্কিত ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের প্রয়াস নিয়ে সর্ব প্রথম ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন ফিরে চলো মাটির টানের প্রথম কার্যক্রম। তারই ধারাবাহিকতায় এবার তিনি আরও চার নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে শুরু করেছেন ‘ফিরে চলো মাটির টানে’র তৃতীয় আয়োজন। বুরো মৌসুমের কার্যক্রমে এবার অংশ নিচ্ছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের শিক্ষার্থী ফয়সাল মোহাম্মদ শান, সাদিয়া বিনতে ওমর এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আশফাক-উর-রহমান ও ইসরাত জাহান অনন্যা। প্রজন্মের এই চার প্রতিনিধিদের নিয়ে তিনি চলে যান মুন্সীগঞ্জের কেওয়াটখালীতে। তাদের কৃষি শ্রমিক হিসেবে দিনমজুরির ভিত্তিতে কাজ করান। এ সমপর্কে শাইখ সিরাজ জানান তার অনুভূতির কথা—‘কর্পোরেট যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে তারা জানে না ধানক্ষেতে ধান হয় না তক্তা হয়। এ প্রজন্মের যারা চার দেয়ালে মাঝে বড় হয়েছে সেটাকে আমি বলি মুরগির পোল্ট্রি খামারের মতো। তারা কোনোদিনই গ্রাম দেখেনি, গ্রাম সম্পর্কে তাদের কোনো আইডিয়াই নেই। তাদের জানতে হবে—মাটির সাথে তাদের কী সম্পর্ক। তাদের প্রতিদিনকার খাবারের জোগান কারা দেয়, তারা দেখতে কেমন, কত কষ্ট করে তারা উত্পাদন করে এই সব বিষয়গুলো তাদের জানানো উচিত। তিন মাস ধানের চারা লাগানোর পর ঝড়-বাদল-বৃষ্টি সব থেকে রক্ষা পেলে কৃষক ফসল ঘরে তুলে, তবেই তারা খেতে পায়, আর না পেলে না খেয়ে থাকে, সব মিলিয়ে তাদের কীভাবে জীবন যাপন চলে এই নিয়ে এই প্রজন্মের জানার পরিধিটা অনেক ছোট। তাই আমাদের চিন্তা ছিল তাদের
সাথে কৃষি জীবনযাপনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাই এই উদ্যোগ।’
শাইখ সিরাজ
পরিচালক ও বার্তা প্রধান
চ্যানেল আই
