নারীর অগ্রযাত্রার বড় সূচনা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৭
সম্প্রতি গণধর্ষণের শিকার এক তরুণীর মৃত্যুতে ভারতজুড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী বিক্ষোভের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর রাতে দক্ষিণ দিল্লিতে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয় ২৩ বছরের ঐ মেডিক্যালের শিক্ষার্থী। পরে তাকে ও তার ছেলেবন্ধুকে রড দিয়ে প্রহার করে দুর্বৃত্তরা চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়। নয়াদিল্লিতে ঐ ছাত্রীকে ১০ দিন চিকিত্সার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ২৭ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেয়া হয়। ২৯ ডিসেম্বর সেখানে ঐ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। এই ছাত্রীর মৃত্যুর আগেই নারীর উপর এ ধরনের আচরণ বন্ধ ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহর। শুধু এ ধর্ষণের ঘটনা নয়, বরং এ ধরনের ঘটনা ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই ঘটছে। নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। আর এ জন্যই দেশটির মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ করেছে। রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে, ইন্ডিয়া গেট ও যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভকালে পুলিশের সঙ্গে তাদের কয়েকদিন সংঘর্ষ হয়েছে। আর এ বিক্ষোভের মূল ভূমিকায় ছিলো ভারতে দ্রুত বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তাদের বিক্ষোভ অসহায় মেয়েটিকে সাহস জুগিয়েছিলো কিন্তু বাঁচাতে পারেনি। তারপর এ বিক্ষোভকে অবরুদ্ধ ভারতীয় নারীদের অগ্রযাত্রার এক বড় সূচনা বলে মনে করা যেতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ধর্ষণকে ভারতের জাতীয় সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী মৃত্যুর (বিশেষত আত্মহত্যা) মতো ঘটনার কথা প্রতিনিয়ত ভারতের মাধ্যমগুলোতে প্রকাশ পায়। তবে এর চেয়ে বেশি ঘটনা পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের নজরে না আসায় তা ধামাচাপা পড়ে যায়। দিল্লিতে নারীদের অবস্থা তত ভালো নয়। বিশেষত গরিব ও নিম্নবর্ণের নারীদের জন্য অনিরাপদ শহর হিসেবে দিল্লির পরিচিতি রয়েছে। গ্রামগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে তা বেশি প্রকাশ পায় না। এজন্য সন্ধ্যার পর গ্রামের বেশিরভাগ মেয়েকে বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো দেশটিতে ধর্ষণের ঘটনায় দোষীদের বিচারের হার দুঃখজনকভাবে অনেক কম। গবেষণা ও পরিসংখ্যানে প্রাচুর্যতা থাকলেও বাস্তবতা হলো ভারতের নারীরা দুর্দশাগ্রস্ত। নারীর শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের হার, যৌন ও মাতৃস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে করা জাতিসংঘের সূচক ২০১১তে দেখা যায়, ১৮৭টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩৪তম। চীন, সৌদি আরব ও ইরাকের থেকেও ভারতের অবস্থান খারাপ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, ভারতের অনেক রাজ্যে কন্যা শিশু জন্মের হার তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। কারণ সন্তানের জন্মের আগেই অনেক পরিবার আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানারের মাধ্যমে ছেলে না মেয়ে তা শনাক্ত করার চেষ্টা করে। মেয়ে হলে অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটনো হয়। এ কারণে ভারত লক্ষ লক্ষ কন্যাশিশু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রামে এখনো ছেলেদেরকে মেয়ের চেয়ে বেশি খাবার খাওয়ানো হয়। শিক্ষার সুযোগ মেয়ের চেয়ে ছেলেই বেশি পাচ্ছে। বাস এবং ট্রেনে প্রায়ই নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এখনো অনেক মেয়ের বিয়ের জন্য যৌতুক দিতে হয়। এছাড়া স্বামীর বাড়িতে নারীর নির্যাতনের কথাতো এখনো গণমাধ্যম ও নাটকে দেখা যায়। নারীরা এতো দুর্দশাগ্রস্ত থাকার পরেও কেন একজন মেডিক্যাল ছাত্রীর জন্য এতো বিক্ষোভ হলো। এর বড় কারণ মেয়েটি ভারতের ক্রমবিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমাজের। ১৬ ডিসেম্বর রাতে ছেলেবন্ধুর সাথে সিনেমা দেখে বাসায় ফিরছিলো সে। তার উপর বর্বর নির্যাতনের কারণে নয়াদিল্লির সচেতন মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো। বিশেষত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিলো সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক বছর ধরে ভারতে দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন চলে আসছে। সে আন্দোলনের মধ্যেই এই আন্দোলনের বিষয়টি গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করেছে। এ বিক্ষোভ এতই তীব্র ছিলো যে, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলো। বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ পর্যন্ত করেছিলো। কারফিউয়ের মতো নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছিলো। বিক্ষোভকারীদের তীব্র প্রতিবাদে মেয়েটি জীবন ফিরে না পেলেও এ অপরাধের মাধ্যমেই ভালো কিছু আগামীতে হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতোকিছুর পরও মেয়েদের প্রতি সহিংস আচরণের দেশ হিসেবে ভারতকে বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। দেশটির বেশিরভাগ মানুষ যে ধর্মাবলম্বী সেই হিন্দু ধর্ম নারীদের প্রতি সহিষ্ণু। দেশটিতে উদার সংবিধান ও প্রগতিশীল আইন-কানুন রয়েছে। লিঙ্গ শনাক্তকরণের পর গর্ভপাত ও যৌতুক বিরোধী আইনও রয়েছে। এছাড়া দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে নারীরা। সরকারি চাকরিতে, বিচারক ও সাংবাদিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে চলেছে তারা। ভারত এখন দরিদ্র দেশের কাতার থেকে বেরিয়ে আসছে। বেশিরভাগ গ্রাম এখন নগরে পরিণত হয়েছে। এখন আরো বেশি মেয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবে, নিজেদের পছন্দ মতো জীবনযাপনের স্বাধীনতা পাবে। অনেক শিক্ষিত নারী সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ। কারণ সরকার নারীদের প্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি থাকবে নারীদের কল্যাণে সরকার যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। দিল্লিতে তীব্র বিক্ষোভের পর পুলিশ বুঝতে পেরেছে ধর্ষণের বিষয়কে খাটো করে দেখলে চলবে না এবং নারীদের নিরাপত্তায় আইন-শৃংখলা বাহিনীকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরো পথ পাড়ি দিতে হবে। নারীদের উপর সহিংসতা বন্ধের আন্দোলনের আগে সামাজে তাদের প্রতি আচরণ ও মনোভাব পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভারতের নাটক ও সিনেমায় নারীদের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমকে যৌন হয়রানি মতো অপরাধের ক্ষেত্রে ইভ টিজিংয়ের মতো শব্দগুলো ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। নারীদেকে হয়রানি করতে দেখলেই তার প্রতিবাদ করতে হবে। নারী নির্যাতনের শিকার পরিবারকে লজ্জা না পেয়ে দোষীদের বিচারের জন্য কাজ করবেন। সর্বোপরি ধর্ষণের মতো মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। এটা হলে অনেক নারীই দুর্ভোগ ও মৃত্যু থেকে রেহাই পেতে পারে।