নির্বাচন

সুষ্ঠু নির্বাচন ও জনগণের রায়ের সঠিক প্রতিফলন চাই

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৭
আমরা জানি বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও অবাধ হয় তাহলে তার মাধ্যমে জনগণের রায়ের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে। সে নির্বাচনে বর্তমান সরকারের দল বা তার জোট জয়লাভও করতে পারে। আবার পরাজয় বরণও করতে পারে। তবে জয় বা পরাজয় যাই হোক তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাথা পেতে নিবেন। যা তিনি সম্প্রতি একটি ভাষণে জাতির সামনে বলেছেন। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। বিরোধী জোট অর্থাত্ খালেদা জিয়ার বিএনপির নেতৃত্বের জোট শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন মানে না। তারা শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করে না। তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। তারা মনে করেন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে জনগণের ভোটের সঠিক রায়ের প্রতিফলন হবে। এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে হয় যে, ১৯৯৫ সালে আন্দোলনের মুখে খালেদা জিয়া একটি ভোটার বিহীন নির্বাচন করে জয়লাভ করেছিলেন। যদিও জনগণের আন্দোলনের মুখে ঐ নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। খালেদা জিয়া যেহেতু এই ধরনের একটি কাজ করে ফেলেছেন তাই তার বদ্ধমূল ধারণা এই যে, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে শেখ হাসিনাও তার মত কারচুপি করে মিথ্যা বিজয় ছিনিয়ে নিবে ও সরকার গঠন করবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ের নিমিত্তে খালেদা জিয়ার জোট ইতিমধ্যে আন্দোলন শুরু করে দিয়াছেন। হরতাল করছেন। জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন। এহেন অবস্থায় আমার মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোটের উচিত নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবার কথা বিবেচনা করা। শেখ হাসিনার আশংকা হল নির্দলীয় সরকারের কাঁধে তৃতীয় শক্তি চাপিয়ে আবার ১/১১’র মত অবস্থার সৃষ্টি করে কিনা। আরেকটি ১/১১ সৃষ্টি হলে মাইনাস টু ফর্মুলা চালু হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ও অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হতে পারে। দেশের গণতন্ত্র একেবারেই নিঃশ্বেস হয়ে যেতে পারে। এ সমস্ত আশংকাকে সামনে রেখেও আমি বলব শেখ হাসিনার উচিত নির্দলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে মত দেয়া। কেননা খালেদা জিয়া কোনমতেই শেখ হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচন মেনে নিবেন না। শেখ হাসিনার যদি দেশের জন্য মায়া-মমতা থাকে তাহলে তার উচিত হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এর ব্যবস্থা করা। জনগণ যদি তাদের রায় শেখ হাসিনার পক্ষে নাও দেয় তাও তো তিনি মাথা পেতে নিবেন। যা তিনি আগেই বলেছেন আর দেশ যদি গণতন্ত্রের দিকে না গিয়ে অন্য দিকে যায় তাহলে তো জনগণ আবার বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হবে। কিন্তু কোন উপায় নাই। কেননা গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের রায়ই শেষ কথা। জনগণ দুর্ভোগে পড়লে পরবর্তীতে তারা মত পাল্টাবেন। আর আল্লাহ না করুক যদি তত্ত্বাবধায়কের কাঁধে তৃতীয় শক্তি চেপে বসে ও গণতন্ত্র ধ্বংস হয় সে দায় যদিও তার উপর পড়বে, কিন্তু সে যন্ত্রণা ভোগ করবে জনগণ আর সে দানব তাড়াতে আবার জনগণই সংগ্রাম করতে হবে। প্রাণ দিতে হবে। দেশের উন্নয়নের চাকা পিছনের দিকে ঘুরাতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে আরেকটি ১৫ই আগস্ট, আর একটি ২১শে আগস্ট ইত্যাদি ঘটে যেতে পারে তা অবিশ্বাস করবার আমাদের আর কোন্য যুক্তি নাই। দেশে বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। এই বিচারকে বানচাল করার জন্য নানামুখী তত্পরতা চলছে। দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া একটি জনসভায় বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেন স্বচ্ছ হয়, নইলে তা মেনে নেয়া হবে না। এ কথা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে ৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ঐ যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধীরা আমাদের দেশের ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে। এই সমস্ত যুদ্ধাপরাধীর যদি বিচার না হয়, তাহলে দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী বংশানুক্রমে কাঁদতে থাকবে। দেশ অভিশপ্ত থাকবে চিরদিন। দেশকে অভিশাপমুক্ত হতে দিন। দোহাই আপনাদের, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করবেন না। জাতি আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না। আপনাদেরকেও যুদ্ধাপরাধীদের একই দলভুক্ত বলে বিবেচনা করবে। দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার প্রধান দায়িত্ব হল বর্তমান সরকারের। তাই বর্তমান সরকারকে পবিত্রতার সহিত ইমানের মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি দলকে প্রতিটি নেতাকে, প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকবে হবে। যাতে তত্ত্বাবধায়কের কাঁধে তৃতীয় শক্তি চেপে না বসে। তার পরেও যদি অপশক্তি তত্ত্বাবধয়ায়কের কাঁধে চেপে বসে তাহলে সর্বদল এক হয়ে সে শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবে নির্বাচন হতেই হবে। জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তাতেই দেশের মুক্তি, জনতার মুক্তি। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের রায়ের সঠিক প্রতিফলন শেষ কথা। লেখক : প্রাক্তন ছাত্রনেতা, প্রাক্তন ব্যাংকার