সংবিধান নিয়ে সংকটে পড়েছে মিসর। পিরামিডের দেশ মিসরে এখন বিরাজ করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। গণভোটে দেশটিতে সংবিধান পাস হলেও এর পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে বর্তমান অচলাবস্থা স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে বাড়তে পারে রাজনৈতিক হানাহানি। বিপর্যয় ঘটতে পারে দেশের অর্থনীতিতে। আর বর্তমান সমস্যার সমাধান না হলে এই আধুনিক যুগে মিসরের দুঃখ হতে পারে সংবিধান।
১৯৬৭ সাল থেকে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। ১৯৮১ সালে ১৮ মাস বিরতি ছিল জরুরি অবস্থায়। স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নতি থাকলেও মোবারকের আমল ছিল নিপীড়নমূলক। এ সময় বিরাধী রাজনীতিবিদদের নিখোঁজ, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিষ্ঠুরতার জন্য বিখ্যাত হয়েছে। দুর্নীতি ছিল সর্বজনবিদিত। ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মোবারকের পতনের পর এক বছর অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকে। ২০১২ সালের মে এবং জুন মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশটিতে পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসেন। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষ, সংখ্যালঘু এবং নারীর অধিকার নিয়ে শঙ্কা দেখা যায়। মুরসি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল বিষয়ে পড়া শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। মুরসি ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি এসে ঠেকে সংবিধানে। সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি, সাংবিধানিক আদালত ভেঙ্গে দেয়া ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে আবার অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে মিসরে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র তাহরির স্কয়ার (স্বাধীনতা স্কয়ার)। মুরসি ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান এবং সেনাবাহিনীর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন তানতায়িসহ তার সহযোগীদের বহিষ্কার করেন। এর ফলে দেশটিতে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক মোবারক, তার পরিবারের সদস্য ও তার সহযোগীদের বিচার বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে এ বিচার নিয়ে তেমন রাখঢাকও নেই। বিচার আদৌ হবে কিনা সেটি নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
মুরসি এখন নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করছেন। তার এই নীতিতে তার বিরোধীরা আন্দোলন করছেন। তার পতনও দাবি করেছেন। তবে এটি যে সহজ হবে না সেটা সহজেই অনুমেয়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিরোধীদের কেবল কৌশলগত অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের শক্তিশালী কোনো অবস্থান লক্ষ্য করা যায়নি। আর ভবিষ্যতে যদি তারা সেটি করতে ব্যর্থ হন তাহলে যে গণতন্ত্রের আশা করা হচ্ছে তা কেবল ‘মুরসি’ নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্ভবত তিনি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদের সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। আর তার বিরুদ্ধে জোরালো কোনো সংগ্রাম না হলে সেটা অসম্ভবও নয়। সংবিধান নিয়ে বিরোধীরা এখন লম্ফঝম্প করলেও কাজের সময় তাদের ভূমিকা তেমন লক্ষ্য করা যায়নি। যখন সংবিধানের একটি খসড়া হাতে লিখিত হয় তখন এর বিতর্কিত ধারা (২, ৩, ৪ ও ২২০) নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ নেতারা তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। তারা এতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তারা জনগণকে বলেননি যে, এই ধারাগুলোয় সমস্যা আছে এবং এর সংশোধন প্রয়োজন। যদি সত্যিই তারা মিসরের ভালো কিছু চাইতেন তাহলে তারা এর বিরুদ্ধে তখনই প্রতিবাদ করতেন। আর এ সুযোগেই মুরসি সমঝোতায় না গিয়ে সংবিধান পাস করাতে সক্ষম হয়েছেন।
ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধান পাস হয়েছে যা মুরসির জন্য বিজয় হলেও দেশের জন্য বিজয় নাও হতে পারে। যদিও বিরোধীরা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। সংবিধানে সাংবিধানিক আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে, যাতে আদালত সবকিছুকে বাতিল করতে না পারেন। এর জন্য বিচারকরাও বিদ্রোহ করেছেন। ২০ লাখ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সংবিধানের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে এবং অনেকে প্রেসিডেন্টের অপসারণ চেয়েছে। আর তাহরির স্কয়ারে এখনো বিক্ষোভ চলছে। অভিযোগ আছে, মুরসি সামরিক স্বৈরশাসকের মতোই আচরণ করছেন। গার্ডিয়ান জানায়, মুরসি প্রতিজ্ঞা করেছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি সংবিধানের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করবেন। তবে এটা সম্ভব যদি প্রধান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়। না হলে দেশটির চলমান সংকট আরো বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
৬৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সংবিধান পাস হলেও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এতে বোঝা যায় প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন ভোট দিয়েছে। দেশটির কপটিক চার্চ গণভোটের সময় না ভোট দেয়ার আহবান জানিয়েছিল। আর মসজিদের ইমামরা সংবিধানের পক্ষে ভোট দেয়ার আহবান জানায়। তাই এখন দেখা যাচ্ছে, সংবিধান দুটি ভিন্ন জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। সব ধর্মের নাগরিক চায় তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকুক। কেউ এখন আর বহুত্ববাদের মিসর চায় না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ের পর সংখ্যালঘুসহ সব ধর্মের মানুষকে এক তাঁবুর নিচে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা নির্ভর করছে সেই সক্ষমতা তার আছে কিনা তার ওপর। তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় তার কথায় অন্য ধর্মের নাগরিক প্রভাবিত হবেন কিনা তার ওপর। গত কয়েক মাসের চিত্রে সেটি কঠিন হবে বলেই মনে হচ্ছে। দিন দিন সেটি আরো কঠিন হচ্ছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে যে, এই বিরোধ আগামী সংসদ নির্বাচনে সবাইকে অংশগ্রহণে উত্সাহিত করবে। তবে মুরসি দেশে বিভেদ সৃষ্টি না করে সকল ধর্মের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করবেন এটা এখনো আশা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সংকটের শুরু যেভাবে
সংকট শুরু হয় গত বছরের ২২ নভেম্বর থেকে। ওইদিন মুরসি সাংবিধানিক ঘোষণা জারি করেন, যাতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। যতক্ষণ না একটি নতুন সংবিধান এবং একটি নতুন সংসদ নির্বাচিত হয়। এই ঘোষণা আদালত দ্বারা বাতিলও করা যাবে না। ৫ ডিসেম্বর সরকার এবং সংবিধান বিরোধীদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ভবনের বাইরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ৮ ডিসেম্বর মুরসি তার ২২ নভেম্বর আদেশের অধিকাংশ অংশ বাতিল করতে বাধ্য হন। কিন্তু গণভোট স্থগিতে বিরোধীদের মতের সঙ্গে একমত হননি। এই আদেশ বিভক্ত বিরোধীদের একত্র হতে সহায়তা করে। ২৪ নভেম্বর বিরোধীরা ‘ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নামে একটি দল গড়ে তোলেন। সাবেক জাতিসংঘ কূটনীতিক এবং শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ এল বারাদি এই ফ্রন্টের সমন্বয়ক। মুরসি বলেছেন, যতদিন সংবিধান পাস না হয় এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সংসদ গঠিত না হয় ততদিন পর্যন্ত তিনি বর্তমান ক্ষমতা ভোগ করবেন। তিনি সমালোচকদের সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ৫ ডিসেম্বরের পর মুরসি এক টেলিভিশন ভাষণে ‘ফিফত কলাম’ বা পঞ্চম বাহিনীকে দায়ী করে বলেন, মোবারক আমলের কিছু লোক সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু বৈধ এই সরকারকে সরানোর ষড়যন্ত্র হলে সহ্য করা হবে না। মাতৃভূমিকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। পঞ্চম বাহিনী বলতে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বা তাদের সহযোগীদের বোঝায়। মিসরে প্রতিটি প্রেসিডেন্টের পেছনের ক্ষমতা সেনাবাহিনী। মোবারকের পতনের পর সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য আর্মড ফোর্সেস দেশ শাসন করে। গত ৮ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী সতর্ক করে বলে, দেশের জন্য সব পক্ষকে আলোচনায় বসতে হবে। কারণ সেনাবাহিনী দেশকে ‘অন্ধকার খাদে’ পড়তে দেবে না। দেশের জনগণ এবং জনপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব।
মিসরের স্থগিত এবং খসড়া সংবিধানের তুলনা
মুসলিম ব্রাদারহুডের সংখাগরিষ্ঠ একটি সাংবিধানিক পরিষদে বিতর্কিত সংবিধান অনুমোদন করা হয়। স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিরা এটি বয়কট করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, এই সংবিধান দেশটিতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমে সাহায্য করবে এবং নারী- পুরুষের অধিকারে পার্থক্য তৈরি করবে। ১৯৭১ সালে পাস করা সংবিধান (যা মোবারকের পতনের পর স্থগিত করা হয়) তার সঙ্গে বর্তমান সংবিধানের তুলনা করলে এর সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।
১. রাষ্ট্রের পরিচিতি: ১৯৭১-এর সংবিধানে মিসর আরব প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। মিসরের জণগন আরব জাতির একটি অংশ এবং তারা তাদের ঐক্য বজায় রাখতে কাজ করবে। বর্তমান সংবিধানে ‘মিসর আরব প্রজাতন্ত্র’ নামের দেশটি একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা কখনো ভাগ হতে পারে না। এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির। মিসরের জনগণ আরবি এবং ইসলামী জাতির অংশ। এর জনগণ নীলনদ এবং আফ্রিকার অংশ এবং এশিয়ার অংশ হয়ে গর্ববোধ করে।
২. ইসলাম এবং শরীয়াহ (ইসলামিক আইন): আগের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২-এ বলা হয়েছে, ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। সরকারী ভাষা আরবি। শরীয়াহর বিধান আইনের প্রধান উত্স। বর্তমানের ২ অনুচ্ছেদ একই। তবে নতুন অনুচ্ছেদ ২১৯-এ বলা হয়েছে, সুন্নী ইসলামের বিধিবিধান, ভিত্তি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
৩. ধর্ম: রাষ্ট্র সকলের বিশ্বাস এবং ধর্মীয় অধিকারের স্বাধীনতা দেবে। বর্তমান সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৪৩-এ বলা হয়েছে, আইনের ভিত্তিতে একেশ্বরবাদী ধর্মীয়দের বিশ্বাস, ধর্মীয় কার্যক্রমের স্বাধীনতা এবং প্রার্থনার স্থানের নিরাপত্তা দেবে। অনুচ্ছেদ ৪৪-এ নবী এবং তার বাহকদের তিরস্কার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৪৫-এ ‘মত এবং চিন্তার’ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। মৌখিক, লিখিতবাবে অথবা ছবির মাধ্যমে অথবা প্রকাশনার মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি মত প্রকাশ করতে পারবে।
৪. আল আজহার: পূর্বের সংবিধানে সুন্নীদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ আল আজহার এবং এর বিশেজ্ঞদের বিষয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না। বর্তমান সংবিধানে আল আজহার একটি স্বাধীন এবং সমন্বিত সংস্থা। এটা মিসরসহ সমগ্র বিশ্বে ধর্মীয় প্রচারণার কাজ করবে। শরীয়াহ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে তাদের আলোচনা করা উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. গণতন্ত্র এবং শুরা (পরামর্শভিত্তিক): সংবিধান বহুত্ববাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আগের সংবিধানে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পদ্ধতি গণতন্ত্র এবং শুরার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে বলে বর্তমান সংবিধানে আছে।
৬. নারী:মোবারক আমলের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০-এ উল্লেখ আছে, নারীর মাতৃত্ব এবং শৈশবকালীন নিরাপত্তা দেবে রাষ্ট্র। শিশু এবং তরুণীদের দেখাশোনা করবে এবং এদের মধ্যে মেধাবীদের উন্নতির জন্য সহায়তা দেবে। অনুচ্ছেদ ১১-তে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র পরিবারে এবং সমাজে নারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ মর্যাদার নিশ্চয়তা দেবে। ইসলামী আইনের কোনো লঙ্ঘন না করে সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করবে। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্র নারীর মাতৃত্ব এবং শৈশবের দেখাশোনা করবে বিনা মূল্যে। এটা নারীর কর্তব্য এবং বাইরে কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের নিশ্চয়তা দেবে। রাষ্ট্র তালাকপ্রাপ্ত এবং বিধবাদের নিরাপত্তা দেবে। অনুচ্ছেদ ৩০ অনুযায়ী অধিকার এবং বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। কিন্তু সেখানে নারীর অধিকার সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই।
৭. অধিকার এবং স্বাধীনতা: আগের সংবিধানে অধিকার এবং স্বাধীনতা সংক্রান্ত ২৪টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। নতুন সংবিধান ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, নৈতিক এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয় সম্পর্কিত ৫১টি অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ৭৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কাজ করতে বাধ্য করা, দাসত্ব এবং যৌন ব্যবসা আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য। সংবিধানে মানব পাচারের ওপর সুস্পষ্ট কোনো বিধিনিষেধ নাই এবং এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়েও কোনো উল্লেখ নেই।
৮. সামরিক দিক: পুরোনো সংবিধানে এ সংক্রান্ত কোনো অনুচ্ছেদ ছিল না। বর্তমানে কোনো বেসামরিক নাগরিক যদি এমন কোনো কাজ করে যাতে সামরিক বাহিনীর ক্ষতি হয় তাহলে তার সামরিক আদালতে বিচার হবে।
৯. গণমাধ্যম: পুরোনো সংবিধানে এ সম্পর্কিত কোনো অনুচ্ছেদ ছিল না। বর্তমান সংবিধানে ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম সংস্থাগুলো স্থগিত, বন্ধ কিংবা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে না। কেবল বিচারিক আদেশের বলে করা যাবে। ৪৯ যোগ করা হয়েছে, এই বিজ্ঞপ্তি কেবল চালু করার সময় এবং নিজস্ব পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
১০. বিচারালয়: আগের সংবিধানে এ নিয়ে কোনো অনুচ্ছেদ ছিল না। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত প্রেসিডেন্ট এবং ১০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হতো। বর্তমানে এ আদালত প্রেসিডেন্ট এবং ১৮ সদস্য নিয়ে গঠিত।
১১. রাষ্ট্রপতির ম্যান্ডেট সংক্রান্ত: আগের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ ছিল ৬ বছর। প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন। বর্তমানে প্রেসিডেন্টর মেয়াদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ৪ বছর এবং ২ বার নির্বাচন করতে পারবেন। এছাড়া অনুচ্ছেদ ২৩২-এ মোবারক আমলের সব নেতাকে আগামী ১০ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
মুরসি এখন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মিসরে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ঝুঁকিপূর্ণভাবে হ্রাস পেয়েছে। বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, মিসরের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নিম্ন অবস্থায় পৌঁছেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিই) এ কথা জানায়। সিবিই এক বিবৃতিতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ধরে রাখতে নিলামের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের এক নতুন পদ্ধতি ঘোষণা করেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মিসরে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬শ’ কোটি মার্কিন ডলার, তবে এখন তা কমে ১ হাজার ৫শ’ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। সিবিই জানায়, কেবল নভেম্বরই মজুদ কমেছে ৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
বর্তমানে মিসরের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্র কামনা করছে যেখানে তারা স্বাধীনভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারবে। তারা এখন আর সামরিক সরকার, স্বৈরশাসক এবং ধর্মভিত্তিক কোনো শাসক চায় না। তারা চায় একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশটির জনগণের জন্য এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সহজ হবে না। তবে জনগণ তাকিয়ে আছে মুরসির দিকে। তিনি কি নিজেকে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিত করবেন, নাকি দেশকে শক্তিশালী করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
