অশান্ত সিরিয়ায় থামছে না রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। দিন যতই যাচ্ছে ততই রক্ত ঝরছে। এ যেন রক্তের উন্মত্ত নেশায় মেতে উঠেছে দেশটি। একদিকে বাশার বাহিনীর বিদ্রোহীদের দমনে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে বিদ্রোহীদেরও সরকারি বাহিনীর হামলার জবাবে পাল্টা হামলা— এ দুইয়ে মিলে দেশটি পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে নির্বিচারে। রেহাই পাচ্ছে না কোলের শিশু পর্যন্ত। এতে করে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে ৬০ হাজারেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে। বিশ্বসমাজের কাছে সিরিয়া সংকট আজ আর হয়তো নতুন কোন বিষয় নয়। মিডিয়ার কল্যাণে তারা প্রতিদিনকার তাজা খবর পেয়ে যাচ্ছেন খুব সহজেই। এ কারণে বিষয়টা মনে হয়, তাদের কাছে অনেকটা গা-সহা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মৃত্যু যেখানে প্রতিদিন উঁকি দেয় যমদূতের মতো, যাদের কাছে মনে হয় এই বুঝি কামানের গোলা এসে সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দিবে, তাদের কাছে সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকা আসলে দুঃস্বপ্নের অন্ধকার রাতের মতো। এতো যুদ্ধের দামামা শেষ করে কবে সেখানে শান্তির সূর্য উদয় হবে সে প্রশ্ন বোধ হয় আজ দূর অস্ত! জাতিসংঘ ও আরব লীগের শান্তির দূত লাখদার ব্রাহিমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অশান্ত সিরিয়ায় শান্তির পতাকা উড়াতে। এর আগেও আরেকজন চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তারপরও লাখদির নতুন চেষ্টা যদি আলোর মুখ দেখায় তাহলে তার চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। হয়তো তার চেষ্টা নতুন কোন পথের সন্ধান এনে দিবে। সিরিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বে একটা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এই বিভাজনে বৃহত্ পঞ্চশক্তির মধ্যে রাশিয়া ও চীন রয়েছে বাশারের পক্ষ শক্তি হিসাবে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে এর বিরুদ্ধ শক্তি হিসাবে।
রাশিয়া প্রথম থেকেই বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এ কারণে দেশটির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মাধ্যমে কোন ব্যবস্থা নিতে গেলে বাঁধ সাধে রাশিয়া । যদিও মুখে তার অন্য সুর। তারপরও সম্প্রতি তারা সিরিয়ার বিরোধী জোট ন্যাশনাল কোয়ালিশন কাউন্সিলকে (এসএনসি) তাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বিরোধীদের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে,মস্কোয় গিয়ে তারা কোন আলোচনায় বসবে না। বিরোধী জোটের নেতা আহমদ মুয়াজ আল-খতিব সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, আলোচনা যদি হতে হয় তাহলে সিরিয়া ও রাশিয়া বাদে তৃতীয় কোন আরব দেশে তা হতে হবে। তবে এক্ষেত্রে পূর্ব শর্ত হিসাবে রাশিয়া সিরিয়ার যে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি আরো বলেন, রাশিয়া যদি এসএনসিকে জনগণের আসল প্রতিনিধি বলে মনে না করে, তাহলে এ আলোচনার টেবিলে বসা কি নিরর্থক নয়? ২০১১ সালের মার্চে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো এবং অধিকাংশ আরব দেশ বাশার আল আসাদের সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও রাশিয়া তার সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে সিরিয়া ইসরাইল বিরোধী হওয়ায় ফিলিস্তিনসহ বাকি আরব দেশের সহানুভূতি পাচ্ছে। সে সঙ্গে ইরান, কিউবা, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি দেশও সিরিয়াকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ক্ষমতাসীন হয়েছেন পিতার উত্তরাধিকারীরূপে। তার পিতা হাফেজ আল আসাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অনেক মানুষ হত্যার অভিযোগ। ১৯৮২ সালে তার পিতার শাসনামলে সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। অনেকের মতে, এ সংখ্যা কয়েকগুণ হবে। তবে আগের সংখ্যাকেও যদি আমরা সঠিক বলে ধরে নেই তাহলে এক্ষেত্রে পিতাকে ছাড়িয়ে গেছেন পুত্র। পুত্র বাশারের সময়ে এ সংখ্যা হয়েছে ছয়গুণেরও বেশি। তাই অনেকটা পাকাপোক্তভাবেই তিনি ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা এঁটেছেন। এ কারণে লাশের উপর দিয়েও ক্ষমতা আঁঁকড়ে ধরতে কুণ্ঠিত নন তিনি। নিজের আলাভি গোত্রের লোকজন দিয়ে সেনা ও গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তুলেছেন। অবস্থার আলামত দেখে মনে হয়, শেষ কামড় হিসাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারেও তিনি পিছপা হবেন না। গতকাল জাতির উদ্দেশে বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। কিন্তু এতো কিছুর পরও তিনি তার সাম্রাজ্য কতখানি রক্ষা করতে পারবেন, তার দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ববাসী। কেননা আরবে গণআন্দোলনের জোয়ারে বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের ঘুনে ধরা শাসকগোষ্ঠীর পতন হয়েছে। লৌহমানব মিসরের মোবারক যুগের অবসান হয়েছে, পালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন তিউনেসিয়ায় বেন আলি। তাই এসবের বাস্তব অভিজ্ঞতাই বলে দিবে কোন পথে সিরিয়া।
এদিকে সিরিয়ার বিদ্যমান সঙ্কট সমাধান না হলে দেশটি একটি নরকে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাহিমি। সম্প্রতি মিসরের রাজধানী কায়রোতে আরব লিগের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ১৫ মার্চ সিরিয়া যুদ্ধের দু’বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে তা হবে গোটা আরব বিশ্বের জন্য এক চরম অশান্তির বার্তা। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন আমরা এখনও এর হাল ছেড়ে দিইনি। তিনি আরো বলেন, আরব লিগের একটি প্রস্তাবনা রয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলও আশা করি এটা সমর্থন করবে। গত সপ্তাহে পাঁচদিনের দামেস্ক সফরকালে তিনি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এসময় তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরিকল্পনার বিষয়েও আলোচনা করেন। এ পরিকল্পনায় অন্তর্বর্তী সরকারে বাশারের ভূমিকা পরিষ্কার করা হয়নি। তবে সিরিয়ার বন্ধু দেশ রাশিয়া এর বিরোধিতা করে বলেছে,শান্তি আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট বাশারের পদত্যাগ পূর্বশর্ত হতে পারে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা শান্তি আলোচনা চাইলেও বরং সরকার-বিরোধীরাই শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে।
