যেদিকেই চোখ যাবে কেবল গাঢ় সবুজের দেওয়াল। বছরজুড়ে পুরো এলাকার প্রতিটি অংশে রং-বেরঙের ফুলের সৌরভ-সমারোহ। লেকের পানিতে ভেসে বেড়াবে সাদা পালকের হাঁসের পাল। ঢাকাবাসীর চিত্তবিনোদনের নতুন জগত্ হাতিরঝিলে এমন চোখ জুড়ানো, মন ভোলানো দৃশ্যকেই স্থায়ী রূপ দিতে চায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক। এ লক্ষ্যে হাতিরঝিলের জন্য গড়ে তোলা হবে বিশ্বমানের একটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্য সেই কর্তৃপক্ষের গঠন কাঠামো, দায়-দায়িত্ব ও এখতিয়ার কি হতে পারে ইতিমধ্যেই সে ব্যাপারে পরামর্শকদের কাছ থেকে বিস্তারিত রূপরেখা চাওয়া হয়েছে। অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়েছে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে। তবে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা যথারীতি সেনাবাহিনীর হাতেই থাকবে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিতে পারে আগামী বছরের গোড়ার দিকে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক উত্সাহের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরপর থেকে প্রতিদিনই সকাল-বিকাল হাজার হাজার মানুষ দল বেঁধে হাতিরঝিলে বেড়াতে আসছেন। যদিও প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে অনেক নির্মাণ কাজ এখনো অসম্পন্ন রয়েছে। এসব কাজ শেষ হতে আগামী সেপ্টেম্বর মাস পার হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র। ততদিন পর্যন্ত প্রকল্প এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কাজটি করবে সেনাবাহিনী। এজন্য প্রয়োজনে তারা পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও রাজউকের সহায়তা নেবে।
ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. এমাদাদুল ইসলাম বলেন, হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পটি সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে যেমন বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই চীন ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও ধারণা সঞ্চয় করেছেন। এছাড়া প্রকল্পের দুই পরামর্শক সংস্থা বুয়েটের বিআরটিসি এবং ভিত্তি-ডিপিএম-এআইএ কনসোর্টিয়ামকে সম্ভাব্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো ও দায়-দায়িত্বসহ সামগ্রিক রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। পরামর্শকদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেগুলোর আলোকে রাজউকের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের বিবেচনার জন্য পেশ করা হবে। এরপর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দিকনির্দেশনায় গড়ে তোলা হবে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে ভিত্তি-ডিপিএম-এআইএ কনসোর্টিয়ামের টিম লিডার স্থপতি ইকবাল হাবিব ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজউকের অ্যাসাইনমেন্ট অনুযায়ী আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আমরা প্রাথমিকভবে তিন স্তরের ব্যবস্থাপনার কথা ভাবছি। একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ এসব ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার কার্যক্রম দেখভাল করবে। কর্তৃপক্ষের কাজের সুবিধার্থে একটি বিস্তারিত বিধিমালার আওতায় তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বা এখতিয়ার দিতে হবে।’ তিনি বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্পের চারদিকে যেন বছরজুড়ে নির্মল সবুজের সমারোহ থাকে এবং দৃষ্টিসীমার মধ্যে অবস্থিত ভবনগুলো যাতে একই ছন্দের, অভিন্ন রঙের হয় সেটা বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকার সড়কগুলোতে চলাচলকারী প্রত্যেক গাড়ি থেকে নির্দিষ্ট হারে টোল আদায়ের মাধ্যমে এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষের কাজের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত করতে পারে তাদের কাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকায় মোটাদাগে তিন ধরনের কাজ করবে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ। এগুলো হলো যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান, কারিগরি ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প এলাকার সামগ্রিক ব্যবহার ব্যবস্থাপনা। ইকবাল হাবিব আরও বলেন, হাতিরঝিলকে ঘিরে যে ধরনের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে, সেটা বাংলাদেশে এটিই প্রথম। ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা সংসদ ভবনসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যাবে।
