জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ্যে বাড়াবে দুর্ভোগ

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৭
বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় হঠাত্ করেই বৃহস্পতিবার ৭ম দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। ৪ জানুয়ারি ভোররাত হতে কার্যকর হয়েছে বর্ধিত মূল্য। ডিজেল ও কেরোসিন লিটার প্রতি ৭ টাকা বাড়িয়ে ৬৮ টাকা, অকেটন লিটার প্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯৯ টাকা এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৬ টাকায়। ইরি-বোরো মৌসুমে হঠাত্ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করায় কৃষকের মাথায় বাজ পড়েছে। দাতাদের চাপ ও ভারতে পাচার হবার ভয়ে এরূপ করা সরকারের ঠিক হয়নি। নানা কারণে বিশ্বমন্দায় আক্রান্ত পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র। চীন, ভারত, আমেরিকা বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী। খাদ্যসহ অন্যান্য উত্পাদনেও তারা বিশ্বে আলোচিত। শত প্রতিকূলতার মাঝে বাংলাদেশ খাদ্য ও সবজি জাতীয় পণ্য উত্পাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। খাদ্য উত্পাদন, পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহে সফলতার কারণে বিশ্বমন্দার কবলে সামান্যই পড়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বারবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার অর্থনীতির চলমান চাকাকে শ্লথ করে দিচ্ছে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জাল, জালিয়াতি, হরিলুটের কারণে কয়েক বছর যাবত্ বাংলাদেশের চলমান অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য সংকট। বিশেষ করে হলমার্ক, হলমার্ক জাতীয় আরো কিছু ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানকে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। শেয়ার বাজারে ধস ধরিয়ে, মানিলন্ডারিং এবং প্রবাসে উচ্চভিলাসী জীবন, নিরাপত্তা রাখতে কিছু আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পরিবার বিশেষ মিলে এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার উপরে পাঠিয়েছেন ভিন দেশে। যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপে-টু, এমওয়ে, ট্রাস্টওয়েসহ আরো কিছু এমএলএম কোম্পানী হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। আশুলিয়ায় তাজরীন গার্মেন্টস ভস্মীভূত, শিল্পে শিল্পে আগুন লাগানোর ষড়যন্ত্র দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাচ্ছে অনিশ্চিত এক গন্তব্যের দিকে। দেশে যখন দু’অংকের মুদ্রাস্ফীতির হার; মানুষ নিরন্তর প্রচেষ্টা করে সংসার চালাতে পারছে না, ঠিক এ সময়টাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানি, রপ্তানি ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যাবে কম করে হলেও ১০%-এর মতো। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেলের ভাড়া ৫০% থেকে ১২০% পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা দুর্বল সেবার কারণে মানুষ বাস-ট্রাকের সেবা নিতেই ঝুঁকে পড়েছে। তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে বাস, ট্রাক, কার-মাইক্রো, লেগুনা, হিউম্যান হলারসহ সব ধরনের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে। যাত্রীসাধারণ বিশেষ করে যুবকশ্রেণী ও ছাত্ররা কণ্ডাক্টরদের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদে লেগেই থাকবে কয়েক মাস। বিগত সময়গুলোর মতো পরিবহন ভাংচুর ও জ্বালাও-পোড়াও হতে পারে। ২০১২ সালে পরিবহন ভাড়া কয়েকদফা বাড়ানো হয়েছিল। ২০১৩ নতুন বছরে জ্বালানির গড় মূল্য ৫.৬২% বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ও যাত্রী ব্যয় বাড়ানো ঠিক হবে না। কেননা নির্বাচন-পূর্ব সময়টাতে সরকার বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে পারে। উত্পাদনের অন্য উপাদানের সাথে জ্বালানি উপাদানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুত্, তৈল, গ্যাস, কয়লা, লাকড়ি, তুষ ইত্যাদি বাংলাদেশে ব্যবহার্য জ্বালানি। বিদ্যুতের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে কয়েকবার। সরকার এ মাসেই আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়াতে পারে। যে কোন ধরনের জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে ভোগ্যপণ্য উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ে মানুষের আয় বৃদ্ধি না পেলেও বাড়তি ব্যয়ে ক্রয় করতে হবে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী। কেউ কেউ উচ্চমূল্যের কারণে ভোগ্যপণ্যের সংখ্যা অথবা পরিমাপ হ্রাস করতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় শরীরের আমিষ ও ভিটামিনের পরিমাণ কমেও যেতে পারে। মানুষের কর্মস্পৃহা ও কর্মদক্ষতাজনিত শক্তি হ্রাস পেলে সামগ্রিকভাবে উত্পাদন ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। ২০১১-২০১২ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭.৫%, অথচ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে ৬.৫% মাত্র। চলতি অর্থবছরে এ মাত্রা ধরা হয়েছে ৭.২%। উত্পাদনের উপাদানগুলোর উপযুক্ত মূল্য প্রদান, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় হ্রাস, ট্যাক্স-হলিডে ও কর হ্রাস সুবিধা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় হ্রাস করতে পারলে জিডিপির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও হতে পারে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুত্, সার, পানি ছাড়া বিকল্প উপায়ে সরকারের আয় বাড়ানোর উত্স অনুসন্ধান করতে হবে। বিরোধী দলসমূহ জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। ডিসেম্বরের ঘোষণা অনুযায়ী সরকার সর্তক থেকে মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা স্থগিত রাখতে পারতেন। হরতালের পূর্বদিন, হরতালের দিন এবং পরেরদিন যানজটের ক্ষতির পরিমাণ এ-খাতে ভর্তুকির পরিমাণ হ্রাসমূল্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন এই তিনদিনে দেশের অর্থনীতি তিন হাজার কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে। নতুন বছরের প্রথম সময়টিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরকারের শুভবুদ্ধির পরিচয় বহন করে না। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দেশের কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বৃহত্ শিল্প প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলের জোরালো আন্দোলন, সামাজিক নিরাপত্তায় দুর্বলতা, ব্যাংক, বীমা, বিমান, বিচার বিভাগের সক্ষমতায় গতি না থাকা, দাতাদের ফল্স প্যারাডাইস পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি, বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের বৈরী আচরণ সব মিলিয়ে সরকার কঠিন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। তার উপর জ্বালানী মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ্যে দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে মানুষ তার ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে জবাব দিবে আগামী নির্বাচনে। তাই মানুষের কল্যানের কথা ভেবে পুনরায় গ্যাস বা তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা ঠিক হবে না। এখন সরকারকে বিভিন্ন শিল্প, কলকারখানা, সিএনজি স্টেশন, আবাসন খাত ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হবে। কেননা অনেক বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সার্বিক অবকাঠামো তৈরী করে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে। বিনিয়োগকারীগণ অপেক্ষা করছেন কখন গ্যাস সংযোগ চালু হবে। গ্যাস সংযোগ চালু হলেই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে। অপর পক্ষে মালিক পাবে তার বিনিয়োগের রিটার্ণ এবং ব্যাংক পাবে সুদসহ কিস্তির আসল টাকা। ++ লেখক: সাবেক ট্রেজারার, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়