অনলাইনে ছবিটি দেখে প্রথমে মনে হয়েছে এটি ১৯৭১ সালে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা কোন লাশের ছবি। যে ছবি আমাদের মনের ফ্রেমে বাঁধা হয়ে আছে। ৪১ বছরেও ভুলতে পারিনি আমরা যে স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে দিতে চেয়েছিল। আর সে পরিকল্পনা থেকেই বিজয় অর্জনের মাত্র কয়েকদিন আগে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে রায়েরবাজারের একটি দুর্গম এলাকায় নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। কোনটার উপর মাটি চাপা দেয়া, কোনটিতে তাও নয়। সে ছিল বীভত্স এক দৃশ্য।
তারপর বিজয় এসেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চার দশকের বাংলাদেশে আবার দেখা গেল প্রায় একই ধরনের দৃশ্য।
গত সোমবার প্রায় সকল পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে ছাপা হয়েছে এ ধরনের এক ছবি । পেঁয়াজ ক্ষেতে মাটিতে মুখ পেতে পড়ে থাকা মানুষটির হাতে হাতকড়া বাঁধা। আর সেই হাতকড়ায় খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘পুলিশ’।
ঝিনাইদহের শৈলকুপায় খুন হওয়া মানুষটির নাম রফিকুল ইসলাম মজুমদার। ৪২ বছর বয়সী এক ব্যবসায়ী। স্বাধীনতার এক বছর আগে জন্ম হয়েছিল রফিকুলের। অর্থাত্ যখন সব কিছু বুঝতে পারেন রফিকুল ইসলাম তখন তিনি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এরপর পড়াশোনা করে বড় হওয়া, ঢাকায় ব্যবসা করে ভালোই চলছিল তার জীবন। ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। থাকতেন রাজধানী ঢাকাতেই। দু’দিন আগে গত শুক্রবার ঝিনাইদহের শৈলকুপার আনন্দনগর গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়িতেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছিলেন রফিকুল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে ৭/৮ জন লোক দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন ওই এলাকায় বিদ্যুত্ ছিল না। কালো পোশাক পরা আগুন্তকরা পরিচয় দেয় যে, তারা র্যাবের সদস্য। এরপর রফিকুলকে হাতকড়া পরিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে চলে যায় তারা।
এর কিছুক্ষণ পর আবার একটি সাদা রংয়ের মাইক্রোবাস ওই বাড়িতে আসে। এবার তারা তুলে নিয়ে যায় রফিকুল ইসলামের ড্রাইভার আমির হোসেন এবং ভায়রা সাইদুর রহমানকে। যাবার সময় তারা বলে যায় প্রয়োজনে ঝিনাইদহ র্যাব অফিসে যোগাযোগ করতে। রাত দু’টার দিকে এ দু’জন ফিরে এলেও রফিকুল আর ফিরে আসেনি।
নির্মম এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে। নিহত রফিকুলের পরিবার থেকে র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও র্যাব গতকাল সোমবার পর্যন্ত অস্বীকার করেছে। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ঢাকা মার্কেটের মালিকানা নিয়ে এ ধরনের একটি দ্বন্দ্বের অভিযোগ র্যাব জানতে পেরেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কেটের মালিকানা নিয়ে এই খুন কিনা তদন্ত করছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ বলেছে, বঙ্গবাজারের কাছে নির্মিত ঢাকা সুপার মার্কেটের মালিকানা নিয়ে এর আগে ঐ মার্কেটের মালিক দাবিদার ওয়াজিউল্লাহ গুম হন। তাকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঐ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১ নম্বর আসামি ছিলেন বিএনপির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মজুমদার। বর্তমানে ঐ মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বের কমিটি। তবে মার্কেটের কমিটির সভাপতি হলেন ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান।
এ ঘটনা যারাই ঘটিয়ে থাকুক আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এর দায় এড়াতে পারবে না। মার্কেটের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলে থাকতে পারে। কিন্তু এভাবে পরিকল্পিতভাবে বাসা থেকে র্যাবের পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পুরো জাতিকে আতংকিত করে তুলছে। এর দায় আইন-শংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকার কোনভাবেই এড়াতে পারবে না।
ব্যবসা কিংবা রাজনীতি নিয়ে বিরোধ যাই থাকুক না কেন এ ধরনের ঘটনা চলতে পারে না। ব্যবসায়িক শত্রুতা হাসিল করতে অন্য কোন পক্ষ এখানে ব্যবহূত হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ যদি সত্যিই র্যাব না হয়ে র্যাবের পরিচয় দিয়ে কেউ এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে তাহলে সেটি আরো বড় আতংকের খবর। র্যাব কিংবা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও এটা বড় চ্যালেঞ্জ তাদের ইমেজ রক্ষার জন্য। বিষয়টি তাদের ইমেজ রক্ষার জন্য হলেও দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের খুঁজে বের করতে হবে। যদি সত্যিই ওই হাতকড়া আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর না হয়ে থাকে তাহলে দেখতে হবে কোত্থেকে এলো পুলিশের ওই হাতকড়া। একে তো বর্বর হত্যাকাণ্ড, তার সঙ্গে সরকারি বাহিনীর পরিচয় দেয়ার অপরাধের তদন্ত হওয়া দরকার।
আর যদি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তবে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে তাদের নিজেদের স্বচ্ছতার জন্য। কারণ একজন কিংবা দু’জন খারাপ মানুষের দায় কোন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিতে পারে না। এ ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ড যেই ঘটিয়ে থাকুক সমাজ-রাষ্ট্র তাকে ক্ষমা করতে পারে না। তাই রফিকুলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করা এখন আইন-শৃংখলা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক :সাংবাদিক
