ভারতের এক ‘আমানতের’ ঘটনা পুরো বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ বর্বরতার বিচার চেয়ে পুরো ভারতবাসী ফুঁসে উঠছে। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তীব্র আন্দোলন দানা বেেঁধ উঠেছে দেশটির ভেতর। এজন্য রাষ্ট্রকে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলতে হয়েছে। বাসের ভেতর ধর্ষিতা আমানতের বিচারের দাবিতে যেখানে পুরো ভারত উত্তাল সেখানে আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন ধর্ষিতা সমাজের কিছু নষ্ট মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর তার মানসিক অবস্থা ভালো থাকার কথা নয়। তারপর আসে আইনের অধিকার লাভের কথা। সেখানে একজন ধর্ষিতাকে তা প্রমাণের জন্য দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হতে হয়। হোক থানা বা আদালত কোথাও ধর্ষিতার নিষ্কৃত মেলে না। অনেক বিচারপ্রার্থী শুধু থানা-পুলিশের গাফিলতির কারণেই বিচারের যথার্থতা নষ্ট করে ফেলেন। সময়মতো মেডিকেলের পরীক্ষা না করানোর কারণেই আইনের শাস্তি থেকে ধর্ষকরা রেহাই পেয়ে যায়। আর এর পেছনে ধর্ষণকারীদের অর্থ এবং তদবিরই বড় কারণ। তাই একজন ধর্ষিতাকেই প্রমাণ করতে হবে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তার অবশ্য কারণ রয়েছে। সমাজে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তা রোধ করতে হিমশিম খেতে দেখা যায়। কোনো কিছুতেই ধর্ষণকারীদের প্রতিহত করা যাচ্ছে না। তাই রাষ্ট্রকে আইনের ধারা পরিবর্তন করতে পর্যন্ত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য ২০০৩ সালের অধ্যাদেশে নেয়া হয়েছে বিশেষ শাস্তির বিধান। তারপরও কি সমাজ থেকে এ অপরাধ প্রবণতা কিছু কমছে? এক কথায় বলা চলে— না। তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ধর্ষিতার ন্যায়বিচার পেতে প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত হতে হচ্ছে।
২০১২ সালে দেশে নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সাত শ এগারো জন। তার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক শয়ে ১৯ জন,ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮৯ জনকে। টাঙ্গাইলের রসুলপুরের রেললাইনের পাশে একজন ১৫ বছরের স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ শেষে ফেলে যায় ধর্ষণকারীরা। কিন্তু ধর্ষিতাকে তার পরিবার থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তার পাশে মা ছাড়া আর কেউ দাঁড়াননি। কী নির্মম। যেখানে নিজ পরিবারের সহানুভূতি পায়নি সে বাইরে আর কী সহযোগিতা পাবে! ১ এপ্রিল কাফরুলে ২ বছর চার মাস বয়সী একজনকে ধর্ষণ করা হয়। ১ আগস্ট লৌহজংয়ে ধর্ষিত হয় একজন প্রতিবন্ধী। ২৭ সেপ্টেম্বর রামগড়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়। ১২ জুন মিরসরাইয়ে ছয় বছরের শিশু ধর্ষিত হয়। ২ জুন রাজধানীর হাতিরপুলের নাহার প্লাজায় ১৭ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। তার ছাব্বিশ টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয়। এ দেশে পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ এবং হত্যা করা হলেও কোনো সংস্থাকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। নারী নির্যাতন রোধে দেশের আইনের কঠোর প্রয়োগ করলেই চলবে না। তার জন্য প্রয়োজন আদর্শমূলক শিক্ষাব্যবস্থা। সেটা পরিবার থেকেই আগে শেখাতে হবে। আমাদের সমাজ দূষিত হয়ে পড়ার মূলত কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করছে পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের সমাজে ঢুকে পড়া। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ পুরো বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে। অন্যদিকে মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ার কারণে সমাজ দিন দিন কলুষিত হয়ে পড়ছে। সেটাও একটা বড় কারণ। তাই এগুলো রোধ করতে হবে সর্বাগ্রে। একটি দেশের ধর্ষণের যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে করে শিউড়ে উঠতে হয়। সমাজে নির্যাতন বেড়েই চলেছে তার প্রতিকার আগে নিতে হবে। তাহলে যদি এ থেকে সমাজ রক্ষা পায়।
মুন্সীগঞ্জ
