অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলরাই বৈষম্যের শিকার

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৭
‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বৈষম্য নিরোধ আইনের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক সেমিনারে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, মানুষ দুইভাবে বৈষম্যের শিকার হন। এর মধ্যে যারা দরিদ্র বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, তারা প্রত্যেকটি পদে পদে বৈষম্যের শিকার হন। আর ১৯৭৫ এর পর থেকে দেখে আসছি প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকলেও বৈষম্যের শিকার হন। তবে আমরা যে প্রান্তিকতার কথা বলছি সে অর্থে এই বৈষম্য এক নাও হতে পারে। নতুন যে বৈষম্য নিরোধ আইনটি হবে, এর চরিত্র হবে ফৌজদারি চরিত্র। যে কোন ধরনের বৈষম্য, সেটা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। একই সঙ্গে সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে মানবাধিকার ভিত্তিক সংগঠন ফেয়ার ও বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশের ৫৫ লাখ দলিত জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর বসবাস। যারা বিভাজন ও পেশাগত কারণে বিভিন্নভাবে মূল স্রোতধারার মানুষের দ্বারা ঘৃণা ও বৈষম্যের শিকার। সংবিধানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ ভেদে কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্য না করার অঙ্গীকার করা হলেও দেশে বৈষম্য নিরোধ আইন না থাকার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বেড়েই চলছে। এ প্রসঙ্গে একটি বৈষম্য নিরোধ আইন প্রয়োজন। ব্যারিস্টার সারা হোসেন মূল প্রবন্ধে বৈষম্যের সংজ্ঞা, বৈষম্যের বাস্তব অবস্থা, প্রচলিত প্রতিকারগুলো, সংশোধনীর সুযোগ ও ভবিষ্যত্ কর্মপন্থার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল নারী নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে বলেন, সবশ্রেণীর নারী আজ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেখানে আদিবাসী ও দলিত নারীরা আরো বেশি নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। তাদের উপর নির্যাতন হলে, অপরাধকারীর কোন ধরনের শাস্তি হয় না, যার কারণে নারীদের উপর নির্যাতন বাড়ছেই। মেজবাহ কামাল বলেন, ধর্ষণের মামলায় সাত দিনের মধ্যে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া প্রয়োজন। আজ নিরাপত্তার কারণেই বাল্য বিবাহ বাড়ছে। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে লড়াই সেখানে তিনটি দিক রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক একটা বিষয় আছে, এটা শুধু মর্যাদার প্রশ্ন হয়, একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রান্তিক জনগণ কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, অর্থাত্ এর একটা শ্রেণীগত দিক আছে। দ্বিতীয় হচ্ছে, এখানে লড়াইটা দীর্ঘ হবে, কারণ এখানে ধর্ম, পিতৃতন্ত্র, সমাজপতি এবং রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এতোগুলো প্রতিবন্ধকতার বিপক্ষে আমরা হয়তো কাঙ্ক্ষিত আইন পাবো না এবং সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হচ্ছে তা চাইলেই বদলাতে পারবো না। সে কারণে স্থির থেকে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। অন্য আর একটি বিষয় মনে রাখতে হবে সেটি হচ্ছে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাষ্ট্র হাতে গোনা কয়েকজনকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে, যার কারণে তারা রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলতে থাকে, তাতে করে মূল যে লড়াইয়ের জায়গাটা সেটা নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের সভাপতি মুকুল শিকদার, জাতীয় মহিলা প্রতিবন্ধী পরিষদের সাবেক সভাপতি উম্মে কুলসুম রঞ্জনা প্রমুখ। সেমিনারটি পরিচালনা ও সমাপনী বক্তব্য রাখেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।