শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে তুলকালাম

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৯
বিমান শ্রমিক লীগের ডাকা ধর্মঘটের জের হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তুলকালাম ঘটে। প্রধান এই বিমানবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন দেশ থেকে ১০টি ফ্লাইট এই বিমানবন্দরে অবতরণ করে। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ বন্ধ থাকায় শত শত যাত্রী অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কবলে পড়েন। এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা টার্মিনাল ভবনের অভ্যন্তরে ভাংচুর, বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং কর্তব্যরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাজেহাল করেন। ধর্মঘটের কারণে ঢাকা থেকে বিদেশগামী যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত হয়। এছাড়া সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিমানবন্দরের টারমাকে উড়োজাহাজের জট লেগে যায়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খান সকাল ১০টার দিকে বিমানবন্দরে যান। তিনি উদ্ভূত সংকট নিরসনের জন্য ধর্মঘটীদের সাথে বৈঠকে বসেন। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের ভিআইপি লাউঞ্জে দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠক শেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি-দাওয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করার লিখিত আশ্বাস দিলে নেতৃবৃন্দ ধর্মঘট প্রত্যাহারে সম্মত হন। অতঃপর বেলা ১টার পর ধর্মঘটীরা কাজে যোগ দিলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। সাত দফা দাবিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিবিএ অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতি মশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার, বিমানের প্রস্তাবিত পরিচালনা কাঠামো বাস্তবায়ন, কর্তব্যরত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যাহ্নভোজের ভাতা ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় উন্নীত, পার্সোনাল পে সমন্বয়, ইউনিফর্ম প্রদান, চিকিত্সার পূর্ণ সুবিধা বলবত্ এবং পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে কর্মরত সকল অস্থায়ী কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণ। এসব দাবিতে গত বছর মার্চ মাসে ‘বিমান বাঁচাও ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে বিমান শ্রমিক লীগ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার কর্মকর্তাদের কয়েকটি সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে বিমানমন্ত্রী ফারুক খানের হস্তক্ষেপে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। গত রবিবার বিমান শ্রমিক লীগ এককভাবে তাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন শুরু করে। সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ওই দিন বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমদকে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রধান কার্যালয় এলাকায় অবরুদ্ধ করে রাখে। পরদিন সোমবার সকাল থেকেই এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশমুখে অবস্থান নেয়। তারা কর্মকর্তাদের অফিসে ঢুকতে বাধা দেয়। বিকাল ৫টার মধ্যে দাবি মেনে নেয়ার জন্য তারা কর্তৃপক্ষকে আল্টিমেটাম দেয়। অন্যথায় মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্তও তারা ঘোষণা করে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম হযরত আমানত শাহ বিমানবন্দরে বিমানের শ্রমিক কর্মচারীরা ধর্মঘটে যায়। ফলে এসব বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। উড়োজাহাজ থেকে যাত্রীরা নেমে টার্মিনাল ভবনে এসে ধর্মঘটের বিষয়টি জানতে পারেন। ধর্মঘটের কারণে এসব উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর কাজও বন্ধ থাকে। যাত্রীরা তাদের বুকিং দেয়া লাগেজ পেতে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন। এতে তারা এক পর্যায়ে মারমুখি হয়ে টার্মিনাল ভবনে তুলকালাম কাণ্ড ঘটায়। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়ে। যাত্রীরা তাদের ভোগান্তির দৃশ্য ধারণ করার জন্য বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের টার্মিনাল ভবনের কনকোর্স হলের মধ্যে নিয়ে যান। এরপর এক শ্রেণীর যাত্রী রীতিমতো তাণ্ডব শুরু করেন। তাদের কাউকে কাউকে দেয়ালে লাগানো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র খুলে নিয়ে ভাংচুরের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিক্ষুব্ধ যাত্রীদের ভাংচুর, মারপিট, শ্লোগান, চেঁচামেচি, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজে টার্মিনাল ভবনে রীতিমতো অরাজকতার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। বিমানবন্দরে কর্তব্যরত বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মীরাও অসহায় হয়ে পড়েন। যাত্রীদের রোষাণলে পড়ার ভয়ে বিমানের কর্মকর্তারা পোশাক থেকে ব্যাচ খুলে সুকৌশলে কেটে পড়েন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কনকোর্স হলের ‘লস্ট এন্ড ফাউন্ড’ শাখার সামনে কতিপয় ক্ষুব্ধ যাত্রী সাদা পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে বিমানের কর্মকর্তা ভেবে ধাওয়া করেন। ধাওয়ার মুখে তিনি দৌড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করলে পা পিছলে মেঝেতে পড়ে গিয়ে আহত হন। পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এবিএম আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ তাদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত যাত্রীদের হাতে আতিকুর রহমান নাজেহাল হন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকাংশই দুর্ভোগের কবলে পড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ইকে-৫৮২ নম্বর ফ্লাইটটি সকালে বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই ফ্লাইটে দুবাই হয়ে রোম থেকে পিয়েত্রো গদো, জার্মানির বার্লিন থেকে হ্যান্সপেত পিয়েশমান ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে তাণ্ডব দেখে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। এরা দু’জন ইত্তেফাককে জানান, পেশাগত কাজে তাদের প্রায়ই বিভিন্ন দেশে যেতে হয়। কিন্তু কোথাও এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা পড়েননি। দুর্ভোগের চেয়ে এখানে এসে তাদের নিরাপত্তাহীনতাই বেশি করে ভাবিয়ে তোলে। মইনুল হোসেন নামক এক প্রবাসী বাংলাদেশি রিয়াদ থেকে গতকাল সকালে বিমানের ফ্লাইটে দেশে এসেছেন। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দুর্ভোগের কবলে পড়ে এক পর্যায়ে মারমুখি হয়ে যান। বিমানমন্ত্রী ফারুক খান নেতৃবৃন্দকে তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু মন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসে নেতৃবৃন্দ ধর্মঘট প্রত্যাহারে অপারগতা প্রকাশ করেন। তারা লিখিত আশ্বাস চান। পরে মন্ত্রীর নির্দেশে বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ধর্মঘটীদের ছয় দফা দাবি যত দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে লিখিতভাবে আশ্বাস দিলে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন নেতৃবৃন্দ। বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও বিমানের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সোয়া ১টায় পিএ সিস্টেমের মাধ্যমে টার্মিনাল ভবনে অবস্থানরত যাত্রীদের উদ্দেশে ঘোষণা করা হয় যে, সংকটের সমাধান হয়েছে। আপনারা শান্ত থাকুন। খুব তাড়াতাড়ি আপনাদের লাগেজ পৌঁছে দেয়া হবে। এই ঘোষণা শোনার পর যাত্রীদের বিক্ষোভের অবসান ঘটে। এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের দাবি নিয়ে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ গতকাল সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসেন। এতে সভাপতিত্ব করেন পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন আহমেদ। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যাত্রীদের বিক্ষোভ চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিমান কর্মচারীদের লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণায় গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৭ ঘন্টা চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সব ধরনের বিমানের ওঠানামা বন্ধ ছিল। এ সময় বিমান বন্দরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের শতশত যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হন। এর প্রতিবাদে দুবাইগামী একটি বিদেশি বিমান সংস্থার যাত্রীরা সকাল সাড়ে ১১টায় বিমানবন্দর টার্মিনালের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। দুপুরে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পর বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়।