রাজধানীর উপকণ্ঠে অর্থাত্ উত্তরদিকে কহর দরিয়ার কথা বললে এমন অনেকেই আছেন যারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। কোথায় বিশাল নদী যেটি ঢাকা ও গাজীপুরের সীমানা ভাগ করে দিয়েছে। বড় বড় ঢেউ তোলা সেই কহর দরিয়া ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এক সময়কার বিশাল নদী কহর দরিয়ার নাম পাল্টে গেছে বহু আগেই। এটি ক্রমান্বয়ে ভরাট হতে হতে তুরাগ নামে এখন ছোট খালের রূপ ধারণ করে বহমান রয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমার শুরুটা ছিলো কহর দরিয়ার তীরে। তারই ধারাবাহিকতা চলছে এবং চলতেই থাকবে। পবিত্র হজ্বের পর বিশ্বের কোথাও মুসলমানদের এতো বিশাল জমায়েতের নজির নেই। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমার জন্য পৃথিবীর যে প্রান্তে মুসলমান আছে সেখানেই পৌঁছে যায় বাংলাদেশের নাম। এখন সবার দৃষ্টি এবং গন্তব্য হচ্ছে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে।
অনেকেই বিশ্ব ইজতেমাকে সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত পবিত্র হজ্বের পর "্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বলে থাকেন। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট আলেম-উলামারা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের মতামত হচ্ছে পবিত্র হজ্বের সাথে কোন ধরনের জমায়েতের তুলনা করা সমীচীন নয়। পবিত্র হজ্ব আর বিশ্ব ইজতেমা এক বিষয় নয়। দু'টো সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্ব ইজতেমার কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলমানরা প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে জমায়েত হন। ইজতেমা ময়দানের প্রতি এক ধরনের আবেগ জড়িয়ে গেছে। সে সাথে রয়েছে ধর্মীয় অনুভ"তি। প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আয়োজকদের মতে, এবার গত বছরের চেয়ে সমাগম আরো বেশি হবে। ধারণা করা হচ্ছে এ সংখ্যা ৪০ লাখের ঘর ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সেভাবেই এবার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমা কি এবং কেন? প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে সারাদেশের মুসলমানরা ছুটে আসেন ইজতেমা ময়দানে। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে টঙ্গীতে পৌঁছাতে পথে পোহাতে হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। এতো কষ্ট সহ্য করার পরও থেমে নেই ইজতেমামুখি মুসল্লীদের কাফেলা। বছরের চাকা ঘুরছে, আর বেড়েই চলেছে কাফেলার লোক সংখ্যা।
দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর যেসব মুসল্লীর সমাগম হয়, তারা কি জন্যে আসেন এবং যাওয়ার সময় সাথে করে কি নিয়ে যান? বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে এ ধরনের প্রশ্ন করাকে অনেকে অযৌক্তিক মনে করতে পারেন। কিংবা তাদের বক্তব্য হতে পারে— এমন প্রশ্ন না করাই উত্তম। কিন্তু আলেম-উলামারা বলেন ভিন্ন কথা। তাদের মতামত হচ্ছে —কেন বিশ্ব ইজতেমা এবং এখান থেকে কি পাওয়া যাচ্ছে সেটি জানার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে যারা এখনো ইজতেমামুখি হননি কিংবা আগামীতে হবেন তাদের জন্য এ জানাটা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও আগামী প্রজন্মের জানা প্রয়োজন টঙ্গীতে দেশ-বিদেশের মুসলমানদের এতো বিশাল জমায়েত কেন?
বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে পবিত্র কোরআন ও আখেরি নবী রাসূল (সা.) আনীত ইসলাম ধর্মের দাওয়াত পৃথিবীর সর্বত্র মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। ইজতেমা সম্পর্কে বিশিষ্ট আলেম ও পশ্চিম রামপুরা ওয়াপদা রোড মুহাম্মাদীয়া দারুল উলুম জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা রশিদ আহমদ দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব ইজতেমা হচ্ছে মুসলমানদের জন্য আখেরাতের পথ দেখানোর জমায়েত। ইজতেমায় দাওয়াতের কাজ করা হয়। যেসব দেশ-বিদেশের মুসল্লীরা জমায়েত হন তারা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের জীবন ও চরিত্র গঠন করেন। সে সাথে মহান রাব"ুল আল আমিন ও তাঁর প্রেরিত রাসূলের (সা.) প্রতি তাদের মহব"ত সৃষ্টি হয়। ইজতেমা শেষে অংশগ্রহণকারী মুসল্লীরা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর যে দেশে মুসলমান আছে সেখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন।
বিশ্ব ইজতেমার আরো উদ্দেশ্য আছে। মাওলানা রশিদ আহমদ বলেন, সে সব হচ্ছে দিন দিন মানুষ বিশেষ করে মুসলমানদের মাঝে কোরআন ও রাসূলের (সা.) প্রতি আগ্রহ কম দেখা যায়। যাদের আগ্রহ কম বিশেষ করে ইজতেমার মাধ্যমে তাদেরকে কোরআন ও রাসূলের (সা.) প্রতি আগ্রহী করে তোলাই উদ্দেশ্য। আর এ লক্ষ্যে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের যে প্রান্তে মুসলমান আছে সেখানেই ইজমেতার উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। তবে এ কাজে সবার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। যেহেতু বাংলাদেশেই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, যারা ইজতেমায় আসেন তারা আখেরি মোনাজাত পর্যন্ত গভীর নিমগ্নে সময় কাটান। তাদের সবার মনযোগের দৃষ্টি নিব" থাকে বয়ানের দিকে। বিশ্ব ইজতেমায় যে বয়ান দেয়া হয় তার প্রতিটি শব্দ তারা মনের মাঝে ধারণ করেন। এরপর ইজতেমা ময়দান থেকে যে যার মত ফিরে গিয়ে প্রচার করেন ইসলামের দাওয়াত। ইজতেমায় উপস্থিত থেকে মনযোগ সহকারে বয়ান শুনে নিজের জীবনে অনুশীলন এবং তাকে যদি অপরজন অনুসরণ করতে পারেন তাহলে তার জীবনকে সফলতার দিকে এগিয়ে নেয়া যাবে। কোরআন, রাসূল (সা.) ও ইসলামের পথে জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার মাধ্যমেই জাহান্নামের অনন্তকাল আগুন থেকে মুক্তি পেয়ে যায়।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে মহান রাব"ুল আল আমিন বলেছেন,'ওয়ালাতাকুম মিনকুম উম্মাতুন ইয়াদুনা ইলাল খায়ির ওয়াইয়মুরুনা বিল মারুফী ওয়াইয়ান হাউনা আনিন মুলকার ওলাইকা হুমুল মুফলিহুন'। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয় যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে এবং সত্ কাজের আদেশ দিবে ও অসত্ কাজে নিষেধ করবে। তারাই সফলকাম হবে।
কোরআনের এ আয়াত সম্পর্কে মাওলানা রশিদ আহমদ বলেন, বিশ্ব ইজতেমায় আল্লাহর কথাই তো প্রতিফলিত হচ্ছে, যে কথা আল্লাহ সূরা আল ইমরানে বলেছেন। বাংলাদেশে বিশ্বের "্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জমায়েত থেকে সারা বিশ্বে কোরআনের এই আয়াতের কথাটিই ছড়িয়ে দেয়া হয়। আর এর মধ্যদিয়েই প্রতি বছরই বিশ্ব ইজতেমায় মুসল্লীদের অংশগ্রহণ সফলতার পথে এগিয়ে চলেছে। যে কারণে বছরের চাকা ঘুরলেই ইজতেমায় মুসল্লীদের জমায়েতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
এদিকে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজক কমিটির মতে, প্রতি বছরই ইজতেমার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয় নির্ধারিত সময়ের বেশ আগে। অর্থাত্ তুরাগের তীরে উপস্থিত হওয়ার আগে প্রতি দুই থেকে তিনটি মহল্লা মিলে ইজতেমা সফল করার জন্য সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করা হয়। আর সারাদেশে এ কাজটি ইতোমধ্যে সফলভাবে শেষ হয়েছে।
