সুদহারের সীমা মানছে না বিদেশি ব্যাংকগুলো

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০১
বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতের উপর সুদের হার ও ঋণের উপর সুদের হারের ব্যাপ্তি পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দিলেও বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো তা মানছে না। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যাপ্তি দাঁড়াচ্ছে ১২ শতাংশীয় পয়েন্টে। সুদের হারের ব্যাপ্তি যাতে নির্দেশিত পয়েন্টে থাকে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে শিগগরি বৈঠকে বসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি সুদ নেয়ায় শিল্পোদ্যোক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কমছে বিনিয়োগ। ব্যাংক ঋণের উপর সুদের হার বেশি হওয়ার কারণেই ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। আর অতিরিক্ত সুদ গুণতে গিয়ে শিল্পোদ্যোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্পখাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা তোয়াক্কা করা হয়নি। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্প্রেড (আমানতের সুদের হার ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান) না মানায় ব্যাংকিং খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর মাস শেষে দেখা গেছে বিদেশি মালিকানাধীন নয়টি ব্যাংকের মধ্যে সাতটি ব্যাংক স্প্রেড সংক্রান্ত নীতিমালা মানছে না। এ সাতটি ব্যাংককে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই বৈঠকে বসবে বলে জানা গেছে। গেল বছরের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের ঋণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) প্রত্যাহার করে নেয়। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে পরে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে স্প্রেড নিম্নতর এক অঙ্ক তথা পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্টে সীমিত রাখতে বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত নভেম্বর শেষে নয়টি বিদেশি ব্যাংকের গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৮৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। ওই পর্যালোচনা মতে, এসব ব্যাংক গড়ে নয় দশমিক ২৯ শতাংশ সুদে আমানত রাখছেন এবং ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ হারে ঋণ দিচ্ছে। এ সময়ে ঋণ ও আমানতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবধান ছিল বিদেশি মালিকানার উরি ব্যাংকের। তাদের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৩, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নয় দশমিক ৬১, এইচএসবিসি আট শমিক ৬৬, সিটি ব্যাংক এনএতে আট দশমিক ৭৫, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে আট দশমিক ৭৫, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনে ছয় দশমিক ৪৯, হাবিব ব্যাংক ছয় দশমিক ৩০। তবে বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংক আল ফালাহ্্র চার দশমিক ৬৬ এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া পাঁচ শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যে স্প্রেড সীমাবন্ধ ছিল। এদিকে স্প্রেড বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা না মানার তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার দুইটি ও বেসরকারি খাতের ১৯টিসহ মোট ২১টি ব্যাংক। উল্লেখিত সময়ে ৪৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড় স্প্রেড ছিল পাঁচ দশমিক ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট। এরমধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে ৫ দশমিক ৩৫, রাষ্ট্রীয় মালিকানার চার বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪ দশমিক ৮৯ এবং বিশেষায়িত খাতের চারটি ব্যাংকে স্প্রেডের গড় ছিল দুই দশমিক ৮৫ শতাংশীয় পয়েন্টে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদি ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যুত্, গ্যাস সংযোগ না পাওয়া এবং বৈশ্বিক মন্দাসহ নানামুখী সংকটের কারণে এমনিতেই বিনিয়োগ হচ্ছে কম। তার ওপর অতিরিক্ত সুদের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস-চেয়ারম্যান ও বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, স্প্রেড বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নির্দেশনা রয়েছে তা ব্যাংকগুলো মেনে চলার চেষ্টা করছে। এ কারণে আগের চেয়ে বর্তমানে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান অনেক কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পুরোপুরি মানতে কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্প্রেড হিসাবায়নে পদ্ধতিগত কিছু সমস্যা থাকায় স্প্রেড কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। যেসব ব্যাংকের স্প্রেড পাঁচ শতাংশের ওপরে তাদের নামিয়ে আনতে বলা হবে। স্প্রেড হিসাবায়ন বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এসএমই ও ক্রেডিট কার্ড বাদ দিয়ে স্প্রেড হিসাব করার কথা। সেটা না হওয়ায় স্প্রেড কিছুটা কম-বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে স্প্রেড বিষয়ে নির্দেশনা মানছে না সব ব্যাংক। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমানতে সুদের হার একভাবে কম হওয়ার পরও ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় এ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। আমানতে কম সুদ দেয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিদেশি ব্যাংক এবং অন্যদিকে ঋণের ক্ষেত্রে বেশি সুদ নেয়ার ক্ষেত্রেও এসব ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে।