পুলিশের সঙ্গে শিক্ষকদের সংঘর্ষ প্রেসক্লাব এলাকা রণক্ষেত্র

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:০৩
এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলরত নন-এমপিও শিক্ষকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে গতকাল বুধবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকা। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পুলিশের প্রতি শিক্ষকদের ইট-পাটকেল এবং শিক্ষকদের ওপর পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সংঘর্ষে শিক্ষক-পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় পথচারীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল সকাল থেকেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আর এ কারণে যানজটের কবলে ছিল রাজধানীবাসী। শিক্ষক-কর্মচারীরা সকাল ১০টায় ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেন। পরে পূর্বঘোষিত অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। শিক্ষকরা দুপুর ১টায় বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলে প্রথমে পুলিশ তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে সামনে এগুনোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের প্রতি তরল গ্যাস নিক্ষেপ করে। উত্তেজিত শিক্ষকরা তখন পুলিশের ওপর ইট-পাটকের নিক্ষেপ করেন। এ সময় দফায় দফায় ধাওয়া, পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো প্রেসক্লাব এলাকা। একই সময়ে পুলিশ শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। শিক্ষকরা ভীতসন্তস্ত্র হয়ে এদিক- ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। পথযাত্রীরাও দৌড়ে পালাতে থাকেন। ঘন্টাকালব্যাপী সংঘর্ষ চলার পর শিক্ষকরা প্রেসক্লাব এলাকায় অবস্থান নিতে চাইলেও ব্যর্থ হন। পুরো এলাকা পুলিশ-র্যাবের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শিক্ষকরা জড়ো হতে চাইলেই পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শিক্ষকরা শিক্ষা ও অর্থমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। পৌনে ৩টার দিকে শিক্ষক-কর্মচারীরা আবার মিছিল বের করার চেষ্টা চালালে পুলিশ ৮/১০ রাউন্ড টিয়ারশেল ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখনো পুরো এলাকা ছিল থমথমে । পরে বিকাল ৪টায় তারা সাংবাদিক সম্মেলনে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। শিক্ষকরা দাবি করেছেন, এ সংঘর্ষে দুই শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী গুরুতর আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৫ জনের গায়ে রাবার বুলেট লেগেছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশও আহত হয়। আহত শিক্ষকদের এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষক-পুলিশ সংঘর্ষে পুরো এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে রাজধানীতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান ধর্মঘট শেষে শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতারা। একই সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীরা অর্থ ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং মঙ্গলবারের শিক্ষা ভবন কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপকারী পুলিশ সদস্যদের অপসারণও দাবি করেন। কর্মসূচি ঘোষণা ঃ গতকাল নন-এমপিও শিক্ষকরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। সকাল ১০টা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে। এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার কুণ্ডু গতকাল তোপখানা রোডের বাসদ কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পুলিশের বক্তব্য ঃ পুলিশের রমনা জোনের ডিসি সৈয়দ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা মঙ্গলবারের মতো বুধবারও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছি। কিন্তু তাঁরাই পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। একপর্যায়ে পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপে বাধ্য হয়েছে। ঘটনায় রমনা জোনের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমানসহ পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের ধারণা, ‘শিক্ষকদের প্রতি আমাদের যে দুর্বলতা আছে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত এ ঘটনা ঘটিয়েছে। শিক্ষকরা কখনো এমন আচরণ করতে পারেন না।’ শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য ঃ নন-এমপিও শিক্ষকদের সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার কুণ্ডু সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেন, পুলিশ পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আর এতে ২৫০ শিক্ষক-কর্মচারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছোঁড়ার ঘটনায় জামায়াত জড়িত বলে পুলিশের অভিযোগে তিনি বলেন, আমরা সকলে শিক্ষক। আমাদের কারো সাথে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি বলেন, শিক্ষকরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। আর এই কর্মসূচি পণ্ড করার জন্য পুলিশ তাদের এজেন্ট দিয়ে এই ন্যক্করজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। শিক্ষকদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি এশারত আলী বলেন, পুলিশের রাবার বুলেট ও টিয়ারশেলে অসংখ্য শিক্ষক আহত হয়েছেন। শিক্ষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রায় সাত হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওর অপেক্ষায় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এক লাখের মতো শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওর দাবিতে দীর্ঘদিন থেকেই আন্দোলন করছিলেন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা। গত মে মাসে এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষকদের বৈঠকও হয়। পরবর্তীতে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষা সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা। ১ সেপ্টেম্বর তাদের আন্দোলনে কর্মসূচিতে লাঠিপেটা করে পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করবেন বলে আশ্বাস দেয়ার পর কর্মসূচি স্থগিত করেন শিক্ষকরা। অবশ্য ওই বৈঠক পরে স্থগিত করা হয়। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন শিক্ষকরা। এর মধ্যে দাবি আদায় না হওয়ায় সোমবার থেকে ফের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা।