জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের যোগান কমে যাওয়ায় নতুন মুদ্রানীতি তৈরিতে চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ থাকায় নীতিনির্ধারকরা পড়েছেন উভয় সংকটে। কেন্দ ীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে জানান, মূল্যস্ফীতির লাগাম ধরাই হবে আগামী মুদ্রানীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী ৩০ জানুয়ারি নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
অর্থবছরের দ্বিতীয়ভাগে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ঠিক রাখতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ আরো বাড়বে। ব্যাংকিং খাত থেকে এবারের বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এবার অনুদান ছাড়া সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি রয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৩ হাজার কোটি টাকাই নেয়া হবে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। আর বিদেশি ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ বাদে বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা নেয়া হবে ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ পড়বে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, সামনে নির্বাচনের বছর। এসময় সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য ব্যাংক থেকে প্রচুর ধার করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেও এটি আটকাতে পারবে না। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইবে মূল্যস্ফীতি দুই অংকের নিচে রাখতে। তা করতে গেলে মুদ্রানীতি শিথিল করার সুযোগ নেই। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুত্ ও গ্যাসের অভাব রয়েছে। শুধু ঋণ দিলেই তো হবে না। এদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ নিরুত্সাহিত হবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা এখনো আটকে আছে। তা পেতে হলে মুদ্রানীতি সম্প্রসারণের সুযোগ নেই।
মুদ্রানীতি তৈরির সাথে যুক্ত কেন্দ ীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার জন্য নতুন মুদ্রানীতিতে কৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাত্ জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকলেও ডলারের সাথে টাকার মূল্যের বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। তিনি জানান, শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামালসহ সামগ্রিক আমদানি কমে গেছে। জুলাই-নভেম্বরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২৮ শতাংশেরও বেশি কমেছে। কাঁচামাল আমদানি কমেছে ১২ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে গেছে। মূল্যস্ফীতি আটকানোর লক্ষ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো কমানো হলে সামগ্রিক বিনিয়োগ কমে যাবে। ওই কর্মকর্তার মতে, বাড়তি জ্বালানি তেলের দাম মূল্যস্ফীতিকে উসেক দেবে। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাবে। নতুন মুদ্রানীতিতে এসব সমন্বয় করা দুরূহ হবে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।
গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের (২০১২-১৩) প্রথম ভাগের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বলেছিল, জাতীয় বাজেটের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার জন্য অনুত্পাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমানোর কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য, বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এজন্য ৩০ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে কেন্দ ীয় ব্যাংক বাজার থেকে উদ্বৃত্ত টাকা তুলে নেয়। ব্যাংকগুলোতেও টাকার সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। অনুত্পাদনশীল খাতে ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় কেন্দ ীয় ব্যাংক। এসব পদক্ষেপের ফলে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫৫ ভাগে নেমে আসে। তবে ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ১৪ শতাংশে।
ডিসেম্বরে ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অংকের ঘরে অবস্থান করছে।
