গেমিংয়ের রাজপুত্ররা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩২
কথায় কথায় আমরা বলি এই সময়ের শিশুরা ঘরে বসে কম্পিউটার গেমস খেলতে খেলতে অলস হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মায়েরও অভিযোগের শেষ নেই তাদের সন্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু কম্পিউটার তথা অনলাইনে গেমস খেলেও এখন যে অনেকেই পরিচিতি পেয়েছেন, অর্জন করে চলেছেন একের পর এক শিরোপা, সে কথা ক’জনের বা জানা আছে? আমাদের দেশেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ওয়ার্ল্ড সাইবার গেমসের আসর। কম্পিউটার সোর্স আয়োজিত এ বছরের উত্সবে বাজিমাত্ করা চার তরুণকে নিয়ে রমনায় বসেছিলাম আমরা এক প্রাণোচ্ছল আড্ডায়। সঞ্চালনা করেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু আলিফ রহমান ক্যাটাগরি :নিড ফর স্পিড ‘চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর খুবই ভালো লেগেছিল, পরপর কয়েক বছর অংশগ্রহণ করে আসছি, সেই সাথে সেরা স্থানটাও আমার দখলে ছিল। এবারও সেই ভাবনা থেকেই অংশগ্রহণ। পড়াশোনার চাপে কতদিন আর খেলতে পারব জানি না, তবে জয় দিয়েই শেষ হোক, এমনটাই ইচ্ছা।’ তাসবীর মাহমুদ ক্যাটাগরি :কল অব ডিউটি ‘যখন থেকে খেলা শুরু করি, তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল সেরা হব আমার ক্যাটাগরিতে। এখন ভাবতে ভালো লাগে যে, দেশের সেরা টিমগুলোর ভেতর আমরা জায়গা করে নিতে পেরেছি। দুই বছর যাবত্ আমরা অনেকগুলোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এবারের ফলাফলেও বরাবরের মতোই তাই অনেক খুশি হয়েছিলাম।’ ইরফান রেজা খান ক্যাটাগরি :কল অব ডিউটি ‘আমি ২০০৫ সাল থেকেই অংশ নিয়ে আসছি, প্রথম প্রথম ফিফা খেলতাম। ২০০৭ সালে ফিফাতে চ্যাম্পিয়নও হই। তারপর এবারই কল অব ডিউটিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। দুইটি আলাদা ক্যাটাগরিতে আমি ভালো করতে পেরেছি, সেটা ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। টিমে খেলার সুযোগ হওয়াতে এই ফলাফল বলে আমি মনে করি।’ সালমান হোসেন ক্যাটাগরি :ফিফা ২০১২ ‘আমি যখন ২০১০ সালে এশিয়ান ডব্লিউসিজি-তে চ্যাম্পিয়ন হই সেবার অনেক খুশি হয়েছিলাম, অনেক চেষ্টাও করতে হয়েছিল। পড়াশোনার চাপে তখনকার মতো আর সময় দিতে পারি না। তবে এইবার খুব কম ট্রিক্স জেনেও কীভাবে জানি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলাম। যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম তাই ফলাফলটা দেখে। আমাদের দেশে দিনকে দিন সাইবার গেমস আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে বোঝাই যাচ্ছে।’ ঢাকার ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (আইইউবি) প্রাঙ্গণে গত নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব সাইবার গেমস প্রতিযোগিতা (ডব্লিউসিজি) বাংলাদেশ ২০১২। আয়োজক ছিল কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড ও আইইউবি। আমাদের আড্ডায় বেশ উচ্ছল ছিলেন তাসবীর মাহমুদ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তিনি। গেমস খেলেই অবসর কাটানো এই ছেলের প্রথম কম্পিউটার গেম ছিল ভাইস সিটি। প্রিয় বন্ধু ঈশান জামানই তাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন গেমিং জোনের সাথে। এরপর সেখানে খেলা শুরু করলেন নিয়মিতভাবে। সময়টা ২০০৫ সাল হবে। তারপর ২০০৯ সালে ওয়ার্ল্ড সাইবার গেমসের আসরে অংশ নিয়েছিলেন। তবে সেবার প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়তে হয়েছিল তাকে। এরপর ২০১০ সালের শেষ দিকে আবার ঈশান সাথেই গ্রুপ ‘ভয়েড’ নিয়ে খেলা শুরু করলেন। তারপর থেকে তাকে আর কখনোই হারের মুখ দেখতে হয়নি, এবারও পুরোদস্তুর চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলেন কল অব ডিউটিতে। কেউ চাইলে তাদের সাথে যোগ দিতে পারেন এই মাধ্যমে ww. facebook . com / voidteam। তাসবীরের ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকাতেই। আগে তার ফুটবল খেলা হতো খুব, এখন সেটাও বোধকরি খেলার মাঠ থেকে কম্পিউটারে এসে উঠেছে। তার সাথে কথা বলতে বলতেই আলোচনায় যোগ দিলেন আলিফ রহমান। তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারাতেই গেমার গেমার একটা ভাব আছে বোঝা যায়, হাসতে হাসতে বললেন তার বন্ধুরা। যাই হোক, তার শুরুটা এক যুগ আগে। চাচাতো ভাইয়ের পিসিতে খেলতে যেতেন বাসা থেকে বেশ দূরে। নিতান্তই বাচ্চাদের অ্যাজ অব অ্যাম্পায়ার দিয়ে শুরু। নিড ফর স্পিড আসার পর রীতিমতো ভক্ত বনে গেলেন গেমটির। রাতদিন সেটা নিয়েই পড়ে থাকতেন। এই জনপ্রিয় গেমটির এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ সবগুলো ধাপ পার করে দারুণ হাত পাকিয়েছেন তিনি। বছর ধরে ধরে তার অর্জনের গল্প শুনলে রীতিমতো থমকে দাঁড়াতে হয়। এক ডজনের বেশি স্বীকৃত পুরস্কার তার থলিতে। এবার ডব্লিউসিজিতেও এনএফএস-এর ট্রফিটা তার হাতেই। কেউ চাইলেই তাদের গ্রুপে যোগ দিতে পারেন, www . facebook . com/ R Vgaming, এ ছাড়াও ওয়েবসাইটটিতেও চোখ রাখতে পারেন গেমপিয়াসীরা www .redviperz . com। আমাদের সাথে ততক্ষণে গাজীপুর থেকে এসে যোগ দিয়েছেন সালমান হোসেন। আইইউটির ছাত্র সালমান বেশ শান্ত হলেও বল পায়ে ফিফার মাঠে দুর্দান্ত, ফিফা ২০১২-তে এবারের চ্যাম্পিয়ন তিনি। সৌদি আরবে শৈশব কাটানো এই ছেলেটা ছেলেবেলায় বাবা আর ভাইদের সাথে সারাদিন কম্পিউটার নিয়েই পড়ে থাকতেন। প্রথমবার তিনি ২০০৯ সালে ইউল্যাবে অনুষ্ঠিত ডব্লিউসিজির এশিয়ান আয়োজনে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়েন তিনি। ধাপে ধাপে জিতে এবার তিনি চ্যাম্পিয়ন। শত শত প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে শিরোপা এখন তার হাতে। ফুটবল খেললেও বল তার সঙ্গী হয় না। সঙ্গী হয় গেমস প্যাড, জয়স্টিক, কি-বোর্ড আর ছোটবেলায় ঘরের কম্পিউটারে খেলতে খেলতে এখন দক্ষ সাইবার গেমস খেলোয়াড় হয়েছেন তিনি। চিকিত্সক বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান সালমানের দেশের বাড়ি নীলফামারী। শিক্ষাজীবন কেটেছে ঢাকাতেই। কম্পিউটার সায়েন্সে নিজের দক্ষ ক্যারিয়ার গড়তে চান তিনি। সবার থেকে আলাদা একজন ইরফান রেজা খান, পড়াশোনার পাঠ রেখে পুরোদস্তুর গেমসে মন তার। থ্রিডি অ্যানিমেশনের কাজ করছেন নিজের মতো করে, বন্ধুদের সহায়তাতে গেম তৈরিরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উইন্ডোজ ৩ পয়েন্ট ১ মানের কম্পিউটারে তার খেলা শুরু। প্রিন্স অব পার্সিয়ার সবগুলো গেম ছিল তার পছন্দের। ২০০৫ আর ২০০৭-এ ডব্লিউসিজি-তে অংশ নিয়ে তিনি ফিফা থেকে রানার্স-আপ ও চ্যাম্পিয়ন হন। এবার অংশ নিয়েছিলেন কল অব ডিউটিতে। বরাবরের মতো সেরাটা তার দলের ঝুলিতেই। িইরফানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার পরিবার থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয় কি না। বেশ মজা করে বললেন, সব সময়ই চাপ দেওয়া হতো পড়াশোনার, তবে একবার পুরস্কার পেলে অনেকদিন আর কিছু বলত না। এখনতো অহরহ পুরস্কার পাই, তাই সেভাবে আর কিছু বলেন না বাবা-মা। এবারের ডব্লিউসিজিতে বিজয়ীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেলেও ব্যক্তিগতভাবে ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন অনেকে। বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের অনলাইন গেমসে হারান প্রায় প্রতিনিয়ত। তবে পৃষ্ঠপোষকতা ও অন্যান্য সুযোগের অভাবে সরাসরি লড়তে পারেন না। ‘বিদেশে অনেক বড় আয়োজন আর গুরুত্বের সঙ্গে এ ধরনের প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। দেশে এ ধরনের আয়োজন করা গেলে আমরাও আরও ভালো ফল করতে সক্ষম হব,’ এ ধরনের কথার বাঁকে আমাদের আলোকচিত্রী ছবি তুলে নিতে থাকলেন গেমিং রাজ্যের এসব রাজপুত্রদের। চোখে তাদের বিজয়ের হাসি। তাদের এই হাসিতে স্পষ্ট আভাস, আগামীর নেতৃত্বে আসছে এরাই।