স্মরণকালের হাড়কাঁপানো শীত, কারো কারো মাথার উপর চটের সামিয়ানার মতো এক চিলতে ছাদ না থাকার অবর্ণনীয় কষ্ট কোন কিছুই দমাতে পারেনি ধর্মপ্রাণ লাখো মুসল্লিকে।
গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দিন টঙ্গীর তুরাগ তীরে লাখো মুসল্লির ঢল নামে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জিকির আসকার ইবাদত বন্দেগিতে টঙ্গী এখন এক পবিত্র পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজকে ঘিরে ভোর থেকেই তুরাগ তীরে মানুষের ঢল নামে। এর আগে শুক্রবার প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১মিনিটে ‘আল্লাহু আল্লাহু’ জিকিরের মধ্য দিয়ে ৪৭তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হয়। গতকাল ইজতেমার প্রথম দিনেই ইজতেমা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণকালের বৃহত্তম জুমার নামাজ। আয়োজকদের ধারণা, গতকাল আনুমানিক ১০ লক্ষাধিক মুসল্লি জুমার নামাজ আদায় করেছেন।
নামাজ আদায় করতে রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি ছুটে আসেন। ইজতেমার মাঠ উপচে জামাত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পাশ ঘেঁষে ইজতেমা মাঠের উত্তর দিকের রাস্তায়ও লোকজন। মূল প্যান্ডেলে জায়গা না পেয়ে মুসল্লিদের রাস্তায় কিংবা মহাসড়ক ও খোলা জায়গায় খবরের কাগজ, জায়নামাজ, পলিথিন ও হোগলা বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। বেলা পৌনে দুটার দিকে অনুষ্ঠিত বৃহত্তম এ জুমার নামাজের ইমামতি করেন কাকরাইল মসজিদের ইমাম মাওলানা হাফেজ জুবায়ের হাসান। এবার বিশ্ব ইজতেমার মূল মঞ্চের বাইরে তুরাগ নদীর পশ্চিম পাড়ে বিশেষভাবে স্থাপিত মঞ্চ থেকে জুমার নামাজের ইমামতি করা হয়। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে ইমাম তার বয়ানে বলেন, মসজিদকে আমরা যেন সর্বদা আবাদ ( ইবাদত বন্দেগি) করি। বেশি বেশি মসজিদে আবাদ করলে আল্লাহ তাকে বেশি ভালবাসেন। জুমার দিনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার চেয়ে বেশি মূল্যবান ও ফজিলতপূর্ণ দিন হচ্ছে জুমার দিন। জুমার দিনে নামাজ আদায় করে হারাম ব্যতীত আল্লাহর কাছে যা চাইবেন আল্লাহ তাই কবুল করে থাকেন।
গতকাল জুমার নামাজ আদায় করার জন্য গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, টঙ্গী পৌর সভার মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খানসহ সরকারি-বেসরকারি ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ইজতেমা মাঠে উপস্থিত হন।
গতকাল বাদ ফজর হতে মাগরিব পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ ঈমান, আমল ও দাওয়াতের মেহনত সম্পর্কে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বয়ান করেন। শুক্রবার বাদ ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে যারা বয়ান করেছেন তারা হলেন- পাকিস্তানের হযরত মাওলানা তারিক জামিল, বাংলাদেশের মাওলানা মোহাম্মদ হোসেন, ভারতের মাওলানা হযরত জোবায়েরুল হাসান ও ভারতের মাওলানা মোহাম্মদ শা’দ।
ইজতেমা মাঠে জুমার নামাজের বিস্তৃতি : ইজতেমা মাঠের ১৬৫ একর জায়গা ছাড়িয়ে আশপাশের রাস্তাঘাট ও দালানের ছাদে মানুষ জুমার নামাজ আদায় করেন। এ বছরও দু’পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হলেও মুসল্লি সমাগম অন্যান্য বছরের মতই লক্ষ্য করা গেছে। ১৬৫ একর জমিতে সুবিশাল চটের প্যান্ডেলের ভেতর তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। শুক্রবার সন্ধ্যায়ও টঙ্গীর তুরাগ পাড়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আসা অব্যাহত ছিল। আয়োজক সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ইজতেমা স্থলে ৮৫টি দেশের প্রায় দশ হাজার বিদেশি মেহমান এসে হাজির হয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর বিদেশি মেহমানসহ মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধনী-গরীব একাকার : বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মধ্যে ধনী- গরীব সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সাদা-কালো নির্বিশেষে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণকে সুবিশাল এক প্যান্ডেলের নীচে মহান আল্লাহতায়ালার জিকিরে মুশগুল থাকতে দেখা যায়। এদিকে শীতার্ত আবহাওয়া সত্ত্বেও ইজতেমা অভিমুখী মুসল্লিদের আগম অব্যাহত রয়েছে। অগণিত মুসল্লির ভিড়ে অশীতিপর বৃদ্ধ যেমন রয়েছেন তেমনি তরুণ ও কিশোরের সংখ্যাও কম নয়। ট্রেন, বাস, ট্রাক, নৌকাসহ বিভিন্ন যানবাহন ছাড়াও মুসল্লিরা পায়ে হেঁটে ইজতেমাস্থলে পৌঁছাচ্ছেন। এবারের ৪৮ তম বিশ্ব ইজতেমায় র্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তীক্ষ দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ইজতেমার কার্যক্রম।
বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প : বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের চিকিত্সা সেবা প্রদানের জন্য ইজতেমা ময়দানের উত্তর পাশে নিউ মন্নু কটন মিলের অভ্যন্তরে অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী মেডিক্যাল টিম বিনামূল্যে ওষধ প্রদান ও সার্বক্ষণিক চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
২০ মুসল্লি টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি : গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ সৈয়দ মোঃ হাবিবুল্লাহ জানান, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ইজতেমায় আগত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট ১ হাজার ৮৯৮ জন রোগী টঙ্গী হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য এসেছেন। এদের মধ্যে ২০ জন রোগী এখানে ভর্তি রয়েছেন। আর ৬ জনকে গুরুত্বর অবস্থায় টঙ্গী হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
আরো একজন মুসল্লির মৃত্যু : গতকাল ইজতেমায় আগত ৩৬ নং খিত্তায় এক বৃদ্ধ হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। তার নাম ফজলুর রহমান মোল্লা (৬০), বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার কয়রা ডাঙ্গা গ্রামে। এ নিয়ে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মধ্যে একজন বিদেশি মুসল্লিসহ মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ জনে।
২১ জন ছিনতাইকারী আটক : বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকা থেকে গতকাল পকেটমার, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজসহ মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।
ভ্রাম্যমাণ আদালত: বিশ্ব ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন এবং বিভিন্ন অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন আইনে ৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জেলাভিত্তিক ৪০টি খিত্তায় মুসল্লিদের অবস্থান: বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ঢাকা জেলার কিছু অঞ্চলসহ ৩২ জেলার মুসল্লিরা অংশ নিচ্ছেন।
ইজতেমার পুরো ছাউনিকে ৪০ খেত্তায় ভাগ করে বিভিন্ন জেলার মুসল্লিদের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর খিত্তায় গাজীপুর, ৩-১২ নম্বর খিত্তায় ঢাকা জেলা, ১৩ নম্বর খিত্তায় সিরাজগঞ্জ, ১৪ নম্বর খিত্তায় নরসিংদী, ১৫ নম্বর খিত্তায় ফরিদপুর, ১৬ নম্বর খিত্তায় রাজবাড়ী, ১৭ নম্বর খিত্তায় শরীয়তপুর, ১৮ নম্বর খিত্তায় কিশোরগঞ্জ, ১৯ নম্বর খিত্তায় রংপুর, ২০ নম্বর খিত্তায় নাটোর, ২১ নম্বর খিত্তায় শেরপুর, ২২ নম্বর খিত্তায় রাজশাহী, ২৩ নম্বর খিত্তায় গাইবান্ধা, ২৪ নম্বর খিত্তায় জয়পুরহাট, ২৫ নম্বর খিত্তায় লালমনিরহাট, ২৬ নম্বর খিত্তায় হবিগঞ্জ, ২৭ নম্বর খিত্তায় দিনাজপুর, ২৮ নম্বর খিত্তায় সিলেট, ২৯ নম্বর খিত্তায় চাঁদপুর, ৩০ নম্বর খিত্তায় ফেনী, ৩১ নম্বর খিত্তায় চট্টগ্রাম, ৩২ নম্বর খিত্তায় বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি, ৩৩ নম্বর খিত্তায় বাগেরহাট, ৩৪ নম্বর খিত্তায় কুষ্টিয়া, ৩৫ নম্বর খিত্তায় নড়াইল, ৩৬ নম্বর খিত্তায় চুয়াডাঙ্গা, ৩৭ নম্বর খিত্তায় যশোর, ৩৮ নম্বর খিত্তায় ভোলা, ৩৯ নম্বর খিত্তায় বরগুনা এবং ৪০ নম্বর খিত্তায় ঝালকাঠি জেলার মুসল্লিরা অবস্থান করছেন।
