অতিরিক্ত সার ব্যবহারের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৪০
যেকোনো ফসল চাষ করতে গেলেই জমিতে সাধারণত যেসব সার ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ জাতীয় সারই বেশি ব্যবহার করা হয়। ইদানিং জমির মাটি পরীক্ষা ছাড়াই কেউ কেউ চুনও ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়া বাড়িতে তৈরি ছত্রাকনাশক হিসেবে কপার জাতীয় ছত্রাকনাশক বা বাড়িতে তৈরি বোর্দো মিশ্রণও ব্যবহার করেন। জিংক সার হিসেবে সস্তায় পাওয়া যায় বলে দস্তা সারের অহেতুক ব্যবহারও কিন্তু কম নয়। পরিমাণের চেয়ে বেশি হলে বা ব্যবহারের প্রয়োজন না হলে যেকোনো রাসায়নিক সার মাটির ক্ষতি করতে পারে। মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে মাটির বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের অবস্থা বুঝে সার ব্যবহার করা উচিত। আবার এক ফসলে সার ব্যবহার করলে পরের ফসলে সার কম লাগে বা না দিলেও চলে সেদিকটিতেও লক্ষ্য রাখতে হয়। জমিতে একবার চুন ব্যবহারের পর পরের বছর চুন ব্যবহার করতে হয় না। গাছের সমস্যার কারণে কপার জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহারের আগে মাটিতে তার অবস্থা জেনে ব্যবহার করা ভাল। প্রয়োজন হলে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে ব্যবহারের পর মাটিতে না মেশে। অর্থাত্ সার ব্যবহারের সময় লক্ষ্য রাখতে হয়, কোনোক্রমেই যেন তা মাটিতে অতিরিক্ত পরিমাণে জমা না হয়। যদি মাটিতে সারের পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে যায় তখন বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে গাছ অন্যান্য সারের উপাদানগুলোর স্বাভাবিক গ্রহণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নাইট্রোজেন সার অতিরিক্ত ব্যবহারে:অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে সাধারণত গাছের কোষ প্রাচীর পাতলা হওয়ায় কাঠামোগত শক্তি কমে যায়। গাছের কাণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা ও নরম হয় এবং কাণ্ডের চেয়ে পাতাই বেশি ভারী হয়, এতে গাছ সহজেই হেলে পড়ে। এই অবস্থায় গাছের প্রতিরোধ শক্তি কমিয়ে দেয় ফলে গাছ রোগ ও পোকামাকড় দ্বারা সহজেই আক্রান্ত হয়। পাতার রঙ কালচে সবুজ রঙ ধারণ করে। পাটের আঁশের মান কমে যায়। নাইট্রোজেন বেশি হওয়ার সাথে সাথে ফসফরাস ও পটাশিয়াম কম থাকলে ফুলের বৃদ্ধি কমে যায়, দানা জাতীয় ফসলের পরিপক্বতায় দেরি হয়। টমেটোর ফলন কমে যায়, সুগারবিটের চিনির পরিমাণ কমে যায়। আলুতে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। ফসলের শিকড়ের বৃদ্ধি কম হতে পারে এবং ফসলও অনিয়মিতভাবে পাকতে পারে। ১. নাইট্রোজেন জাতীয় সার বেশি ব্যবহারে মাটিতে বোরন, জিংক ও কপারের ঘাটতি হয়। ২. নাইট্রোজেনজনিত কারণে মাটিতে বোরনের ঘাটতি হলে ধানের সবচেয়ে কচি বা নতুন পাতা ও তার পরের পাতায় সাদা সাদা দাগ পড়ে। দাগগুলো একসাথে মিশে গিয়ে বড় আকার ধারণ করে এবং শুকিয়ে যায়। নতুন পাতা বের হয় না। এতে ধানগাছ খাটো হয়ে যায়। গমের পাতায় হলুদাভ দাগ দেখা দেয় এবং গমের শীষ সম্পূর্ণ বের হয় না। শীষে যেসব দানা হয় সেগুলো ঠিকমত পুষ্ট হয় না। চিটার ভাগ বেশি হয়। ভুট্টার পাতার শিরার মাঝের অংশে সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। যা পরে শুকিয়ে পত্রফলক ফেটে যায়। পাটের পাতা বিকৃত হয়। ৩. বোরনের ঘাটতি হলে ফুলকপির চারার পাতা বেশ পুরু হয়ে যায়। চারা বেটে হয়। ফলে ভেজা ভেজা দাগ পড়ে। সে দাগগুলো পরে পচে যায়। ফুলের নিচের কাণ্ডে ভেতরের অংশে ফাঁপা দেখা যায়। কখনো কখনো দুর্গন্ধও হতে পারে। ৪. বোরনের ঘাটতি হলে মূলা ও গাজর বড় হয় না। কিছুটা বড় হলেও ফেটে যায়। শিম ও বরবটির পাতা গাঢ় সবুজ ও ভঙ্গুর হয়। ফুল দেরিতে আসে ও শুঁটিতে বীজ হয় না। কিছু বীজ হলেও সেগুলো বড় হয় না বা পুষ্ট হয় না। আলুর খোসা খসখসে হয় ও গায়ে ফাটল দেখা যায়। বেগুন ও টমেটো ফল কুঁকচে যায় এবং ফল ফেটে যায়। ৫. বোরনের ঘাটতি হলে পেঁয়াজের পাতা শুকিয়ে নিচের দিকে গুটিয়ে রিঙের মত হয়ে যায়। বাঁধাকপির পাতাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ভেতরের দিকে গুটানো স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। সরিষার ফুল ও শুঁটির গঠন ঠিকমত হয় না। দানাও পুষ্ট হয় না। ৬. বোরনের ঘাটতি হলে পেয়ারা ফলের বোঁটার চারদিকে বাদামি দাগ দেখা যায়। দাগগুলোর স্থানে পরে ফাটল ধরে। ফলের গায়ে কালো কালো দাগ দেখা যায়। নারিকেলের ফুল ও কুড়ি ঝরে যায়। বোঁটার কাছাকাছি কালো হয়ে চুপসে যায় ও ফেটে যায়। কচি আম ফেটে যায়। কখনো কখনো পরিপক্ব হওয়ায় আগে আগে বড় আকারের আম ফেটে যায়। পেঁপে ফলের বিকৃতি দেখা দেয় এবং ফল আঁকাবাঁকা হয়ে যায় বা কুঁচকে যায়। আনারসের ডগার পাতা শুকিয়ে যায়। লেবু ফলের খোসা মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। কখনো কখনো ফেটেও যায়। ৭. মাটিতে জিংকের অভাব হলে ধান গাছের কচিপাতা সাদা হয়ে যায়। ধান গাছের অন্যপাতা হলুদাভ ও পাতার আগার দিকে বাদামি রঙের দাগ দেখা দিতে শুরু করে। অভাব তীব্র হলে পুরাতন পাতায় মরিচা পড়ার মত দাগ দেখা যায়। ক্ষেতে কোথাও কোথাও ধানের চারা বড় হয়, আবার কোথাও কোথাও ছোট হয়। ধানের পাতার আকার ছোট হয়। পুরোনো পাতার কিনারা শুকিয়ে যায়। গম গাছের পাতায় বাদামি রঙয়ের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ভুট্টা গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়, গাছ খাটো হয়, নতুন মোচা সাদাটে হয়। লেবু গাছের পাতাগুলো কুঁকড়ে ও গুটিয়ে যায়। কখনো কখনো খুব সরু হয়ে যায়। ৮. কপারের অভাবে কচিপাতা প্রথমে বিবর্ণ হয়। পরে পাতার কিনারা বরাবর হলদে হতে শুরু করে। কাণ্ডের ডগা শুকিয়ে যায়। কাষ্ঠল জাতীয় গাছে হলে সেটি হয় আগা মরা রোগের লক্ষণ। দানা জাতীয় শস্যে এর তীব্র অভাব হলে শিকড়ের বৃদ্ধি বা বিস্তার কমে যায়। ফুল আসার আগে গাছে শুকিয়ে বা মরে যেতে থাকে। চারা অবস্থায় ভুট্টার পাতার আগা হলদে হয়ে যায়। আলু গাছ বেটে হয়ে যায় এবং গাছ গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করে। টমেটো গাছ বেটে হয়, পাতা ছোট হয়, ফুল ঝরে পড়ে এবং ফলও কম ধরে। লেবু গাছের চামড়া বা ছালের নিচে আঠার মত থলি তৈরি হয় এবং ফল ফেটে যায়। (চলবে) লেখক:উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর