আজ প্রথমপর্বের আখেরি মোনাজাত

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৮
এতটুকু তিল ধারণের জায়গা নেই বিশ্ব ইজতেমা প্রাঙ্গণে। তারপরও মানুষের স্রোত এসে থামছে তুরাগ তীরে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় ছুটে আসার ব্যাকুলতা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে গতকাল শনিবার গোটা টঙ্গী শহর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লির পদভারে মুখর শিল্প নগরী। আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান ও রাসুল (সঃ) প্রদর্শিত তরিকা অনুযায়ী জীবন গড়ার আহ্বান জানিয়ে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির জিকির আসকার, ইবাদত বন্দেগী আর পবিত্র কোরআনের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ বয়ানের মধ্য দিয়ে গতকাল ইজতেমার দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়। আজ রবিবার জোহরের নামাজের আগে বহু প্রত্যাশিত আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৪৭তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ইজতেমা ময়দানের বিদেশি নিবাসের পূর্বপার্শ্বে বিশেষভাবে স্থাপিত মোনাজাত মঞ্চ থেকে বেলা ১২ থেকে ১টার মধ্যে শুরু হবে আখেরি মোনাজাত। মোনাজাতে প্রায় ৭০ লাখ মুসল্লি অংশ নেবেন বলে আয়োজকরা ধারণা করছেন। এর আগে অনুষ্ঠিত হবে হেদায়েতি বয়ান। ভারতের হযরত মাওলানা সা’দ হেদায়েতি বয়ান করবেন। তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বীদের পরামর্শের ভিত্তিতে তাবলিগ জামাতের দিল্লীর মারকাজের শূরা সদস্য হযরত মাওলানা জোবায়েরুল হাসান বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ এ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। দোয়া মঞ্চের পাশে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বাটা সু ফ্যাক্টরির ছাদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং হোন্ডা কারখানার ছাদে বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আখেরি মোনাজাতে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে বলে আইন-শৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বশীল একটি সূত্র থেকে জানা গেছে। ৪ দিন বিরতির পর আগামী ১৮ জানুয়ারি থেকে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। আগামী ২০ জানুয়ারি এ পর্বের আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে ইজতেমার পরিসমাপ্তি ঘটবে। বয়ান শুনতে মশগুল ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা : গতকাল শনিবার বাদ ফযর বয়ান করেন দিল্লী থেকে আসা তাবলিগ জামাতের মুরুব্বী মাওলানা মোহাম্মদ শওকত আলী। উর্দু ভাষায় প্রদত্ত তার বয়ান বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মজিদ। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইসমাইল হোসেন। বাদ জোহর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা নিয়াজী আজমত উল্লাহ। তরজমা করেন মাওলানা নূর রহমান। একই সঙ্গে এসব বয়ান বিভিন্ন ভাষা ভাষীদের পৃথক পৃথক জামাতে তরজমা করে শুনানো হয়। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে মুসল্লিরা তাবলিগের মুরব্বীদের গুরুত্বপূর্ণ এসব বয়ান শোনেন। ১৫ হাজার বিদেশি মেহমান : গতকাল শনিবার বিকাল পর্যন্ত বিশ্বের ৮৭টি দেশের প্রায় ১৫ হাজার তাবলিগ অনুসারী বিদেশি মেহমান ইজতেমাস্থলে পৌঁছেছেন বলে বিদেশি নিবাসের একজন জিম্মাদার জানান। আরো ১৮ পকেটমার আটক : ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকা থেকে আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শনিবার বিকাল পর্যন্ত আরো ১৮ পকেটমারকে গ্রেফতার করেছে। আগের দিন ২১ জন পকেটমারকে আটক করা হয়েছিল। বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে এ বছর নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দেড় শতাধিক যৌতুক বিহীন বিয়ে: ইজতেমার দ্বিতীয় দিনে গতকাল বিকালে ইজতেমাস্থলে হযরত ফতেমা (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) বিয়ের দেন মোহর অনুসারে বিনা যৌতুকে দেড় শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন হয়। বর-কনের অভিভাবকদের সম্মতিতে এসব বিয়ে পড়ান হয়। মুসল্লিদের দুর্ভোগ:গত কয়েকদিন ধরে রাতে প্রচণ্ড শীত অনুভূত হওয়ায় ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। বিশেষতঃ বয়স্ক মুসল্লিদের ওজু, গোসল ও পয়ঃপ্রণালী কার্য সম্পাদনের সমস্যায় পড়তে হয়। এদিকে লাখ লাখ মানুষের পদধূলি আর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ধুলোয় ছেয়ে গেছে ইজতেমা এলাকা আর টঙ্গীর রাস্তাঘাট। আরো এক মুসল্লির মৃত্যু : গত শনিবার রাতে ইজতেমায় আগত আরো এক মুসল্লি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে...............রাজিউন)। তার নাম সামসুল হক (৬০), তার বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা থানার বড়চর গ্রামে। এনিয়ে ইজতেমায় আগত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৫ জনে। এছাড়া গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ইজতেমায় আগত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৮৬ জন রোগী টঙ্গী হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন চিকিত্সা ক্যাম্পে এসেছেন। এদের মধ্যে ৮৩ জন রোগী টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মোনাজাত শোনার জন্য মাইক সংযোগের ব্যবস্থা: এবার আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণ সহজতর করার লক্ষ্যে জেলা তথ্য অফিস ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের উদ্যোগে চেরাগ আলী মার্কেট থেকে উত্তরা আব্দুল্লাপুর পর্যন্ত মহাসড়ক ব্যতিত শাখা সড়ক ও অলিগলিতে মাইক সংযোগ এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ইজতেমা মাঠের কট্রোল রুমের আশপাশের এলাকা, মন্নু রোড, স্টেশন রোড, বাটা ফ্যাক্টরির অভ্যন্তর, হোন্ডা ফ্যাক্টরির অভ্যন্তর, টেলিফোন শিল্প সংস্থার মাঠের পুলিশ কন্ট্রোল রুম এলাকাসহ ১০টি পয়েন্টে মাইক সংযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা গণযোগাযোগ অধিদপ্তর উত্তরা আবদুল্লাপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে মাইক সংযোগের ব্যবস্থা করেছে বলে তথ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে। মিডিয়া সেন্টার: বিশ্ব ইজতেমার সংবাদ পরিবেশন করতে আসা দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সুবিধার্থে টঙ্গী প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ একটি মিডিয়া সেন্টার চালু করেছে। টঙ্গী পৌর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় চালু করা এই মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ কর্মীদের জন্য সংবাদ সংগ্রহ ও সংবাদ প্রেরণের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যানবাহন চলাচল ও পার্কিং : আখেরি মোনাজাতে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গাজীপুর জেলা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশ বিশেষ যানবাহন ও পথচারী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আজ মোনাজাতের দিন গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত (ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক) ২০০টি বাস চলাচল করবে বলে জেলা পুলিশ সুপার-এর কার্যালয় জানিয়েছে। এ সুবিধা বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মোনাজাতের দিনও থাকবে। এছাড়া সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল রাখতে গতকাল রাত ১২টা থেকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, টঙ্গীর মরকুন এবং কালিয়াকৈরের চন্দ ামোড় থেকে শুধু ইজতেমার মুসল্লিদের গাড়ি চলতে দেয় হবে। পার্কিং-এর জন্য টঙ্গী কলেজ মাঠ, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন রোডের ফ্যাক্টরি, সিনেমা হল সংলগ্ন মাঠ, টঙ্গী বাস্তুহারা কলোনি সংলগ্ন মাঠসমূহ ও টঙ্গী বোর্ডবাজারস্থ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ রবিবার ঢাকা মহানগরী এলাকা হয়ে বিশ্ব ইজতেমায় গমনকারী যানবাহনসমূহের জন্য যেসব স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে তা হল- উত্তরা ৩নং সেক্টরস্থ জসিম উদ্দীন সড়ক সংলগ্ন মাঠ, উত্তরা ৭নং সেক্টরস্থ রবীন্দ সরণি সংলগ্ন মাঠ, উত্তরা ৬নং সেক্টর সংলগ্ন সাবেক হাজী ক্যাম্প মাঠ, উত্তরা ৯নং সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ ও তত্সংলগ্ন স্থান এবং উত্তরা পশ্চিমে উত্তরা ১১, ১২ ও ১৩নং সেক্টরের হাউস বিল্ডিং স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন মাঠ। আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিগণকে বহনকারী সব ধরনের যানবাহনের জন্য ঢাকা-টঙ্গী সড়কে পার্কিং নিষেধ থাকবে। অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় তথ্য : মুসল্লিদের যে কোন প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ৯৮১৩৪০১-২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। জেপির শুভেচ্ছা বিশ্ব ইজতেমায় আগত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি- জেপি’র চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আমরা ইজতেমায় আগত সকল মুসল্লিদের সুস্বাস্থ্য ও সুখ-শান্তি কামনা করি এবং আশা করি, এই ইজতেমার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি আরো দৃঢ়তর হবে এবং এই অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই ইজতেমা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।