ভালোবাসার সম্পর্ক ঐস্বর্গীক একে কলঙ্কিত করার পক্ষে আমি নই

ইভ এন্সলার উদ্যামে উত্তরণে শতকোটি

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:২৩
‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’ রচনা ও মঞ্চায়ন করতে গিয়ে এন্সলারের যে অভিজ্ঞতা হয়, তা-ই তাকে ভি-ডে আন্দোলন গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। এই ভি-ডে (ভ্যালেন্টাইন ডে) পরিণত হয় নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন বন্ধে বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলনে। এন্সলার বরাবরই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে নিবেদিত প্রাণ। তিনি সব সময়ই স্বপ্ন দেখেন, এমন একটা পৃথিবীর, যেখানে নারীরা শুধু কোনো রকমে টিকে থাকবে না, হবে সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রতি তিনজনে একজন নারী শৈশবে পুরুষ দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। ইভ নিজেই নিজের বাড়িতেই একসময় এধরনের নির্যাতনের শিকার হন। সেই শৈশবের কথা তিনি বুলতে পারেননি কখনো। খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের মতো আরো নারীদেরকে যারা ঘরে নির্যাতনের শিকার হয়ে মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের সাথে কথা বলে ইভের মনে হয়েছে, আর নয় চুপ করে বসে থাকা। নামতে হবে আন্দোলনে। বর্তমানে ভি-ডে একটি বিশ্বজনীন আন্দোলন, যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সহিংসতা বিরোধী সংগঠনগুলোকে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে। এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম চালু রাখতে এবং এর পরিধি বাড়াতে সাহায্য করছে। পাশাপাশি সারাবিশ্বে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি যে সহিংসতা (যার মধ্যে আছে ধর্ষণ, প্রতারণা, বন্দীত্ব, অত্যাচার, নারীর যৌনাঙ্গচ্ছেদ, যৌন দাসত্ব) তা বন্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলায়, সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে কাজ করছে। প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা মিলে ‘দ্যা ভ্যাজাইনা মনোলগ’ মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করে। তারা অভিনব উপায়ে মানুষকে সমবেত করেন, ফিল্ম প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন এবং আয়োজন করেন বিভিন্ন কর্মসূচির। এসবের মাধ্যমে সবার সামনে প্রকৃত তথ্য ও চিত্র তুলে ধরেন তারা। নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলানোর লক্ষ্যেই এইসব আয়োজন। এই আয়োজনগুলো থেকে অর্জিত অর্থ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয় যা নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ভি-ডে শুরুর পর থেকে অদ্যাবধি এই উপায়ে ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এই অর্থ ১৬০টির বেশি দেশে, ৪৮টির বেশি ভাষাভাষী ১২ হাজার কমিউনিটি’র সহিংসতা বিরোধী কর্মসূচি পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে। এর ফলস্বরূপ ৩০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে সহিংসতা বন্ধের বার্তা। ভি-ডে এর “ভি’’ বর্ণটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে ভিক্টরি, ভ্যাজাইনা, ভ্যালেন্টাইন। ২০১০ সাল থেকে ‘দ্যা ভ্যাজাইনা মনোলগ’ মঞ্চায়নে স্থানীয় অফিসিয়াল সংগঠন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ভি-ডে ঢাকা। এই আন্দোলন বাংলাদেশে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কিত সংলাপে নতুন ধারা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। সহিংসতা প্রতিটি নারীর জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনা নয়। কিন্তু বাংলাদেশি নারীরা যে কোনো বয়স, পেশা বা মর্যাদার অধিকারীই হন না কেন; প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য, অব-মূল্যায়ন বা আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে হয়— পথ থেকে গৃহ সর্বত্রই। এই আন্দোলন বাংলাদেশের নারী-পুরুষকে একাত্ম করার একটি মঞ্চ। এই একাত্মতা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের নারীর সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার পক্ষে এক অনবদ্য সংহতি। ১৫ বছর পূর্তিতে ভি-ডে চলমান আন্দোলনের সাথে সঙ্গতি রেখে আরেকটি ভিন্নধর্মী কার্যক্রমের সূচনা করেছে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং (ওবিআর)’ বা ‘উদ্যামে উত্তরণে শতকোটি’। সা ক্ষা ত্ কা র প্রশ্ন: নারী নির্যাতনের এই অবস্থার জন্য কোন বিষয়কে আপনি বেশি দায়ী মনে করেন? উত্তর: আমি যেখানেই যাই দেখি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। আর এই সমাজ চায় নারীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। সমাজের ধনী ঘরের নারীরা ধর্ষণের শিকার হয় না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই প্রয়োজনের জন্য বেরিয়ে আসে কিংবা ঘরে থেকেই ধর্ষণের শিকার হয়। প্রশ্ন: নারী নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন— এই দুইটি বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন? উত্তর: নির্যাতনই তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেখানে নারী নির্যাতিত হবে সেখানে মানবাধিকার টিকে থাকতে পারে না। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমি তাদের সাথেই থাকবো যাদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। প্রশ্ন: কীভাবে আপনি এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন? উত্তর: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর এই বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই আমার এই আন্দোলন— আমি আমার মাকে ভালোবাসি। প্রত্যেকেই তাদের মাকে ভালোবাসে। নারী মা, বোন, প্রেয়সী। ভালোবাসার সম্পর্ক ঐস্বর্গীক একে কলঙ্কিত করার পক্ষে আমি নই। তাই কিছু করার আগ্রহ থেকেই অন্য নারীদের সাথে কথা বলতে শুরু করি। এভাবে শুরু করি আমার এই আন্দোলন। প্রশ্ন: এই আন্দোলন নিয়ে আপনি কতোটা আশাবাদী? উত্তর: আমি দেখেছি, পৃথিবীর কোথাও নারী নির্যাতন মুক্ত নয়। প্রেক্ষাপট, ধরন, প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে, নির্যাতন কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না। নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি’ই পারে এই নির্যাতন রোধ করতে। পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন সাতশ কোটি। অর্ধেক তার নারী এবং তার এক তৃতীয়াংশ নির্যাতনের শিকার। আমি বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখেছি মানুষ বলতে চায়, একাত্ম হতে চায়। একারণে একটি মেয়ে তার শৈশবে নির্যাতনের কথা অকপটে বলেছে। আগে কিন্তু সে বলেনি। আমি নিজে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি তা বলেছি। তরুণদের দেখেছি এই বিষয়ে অনেক উত্সাহী হয়ে সহযোগিতা করতে চায়। প্রশ্ন: ভি-ডেতে আপনি কী করবেন? উত্তর: বিশ্বে প্রায় একশ কোটি নারী নির্যাতিত হচ্ছে। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ভি-ডে এর ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শত কোটি নারী এবং তাদের যারা ভালোবাসে, সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে— পথে বেরিয়ে আসতে, নেচে উঠতে, জেগে উঠতে এবং এই সহিংসতায় যবনিকা টেনে দেয়ার দাবিতে মুখর হবো। ১৮৪টি দেশ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। সারা বিশ্বের সমাজকর্মীদের সঙ্গে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, তারকা, জননেতা এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন জেগে উঠেছে। ‘উদ্যামে উত্তরণে শতকোটি’ স্লোগান সামনে নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশেও ওবিআর-এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গার্মেন্ট সেক্টর, প্রেসক্লাবসহ বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই আমার সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে। আমি সবাইকে বলবো সেদিন অন্তত ১৫ মিনিটের জন্য আঙ্গুল তুলে নির্যাতন বন্ধের পক্ষে দাঁড়ান। প্রশ্ন: আপনার ভবিষত্ পরিকল্পনা কী? উত্তর:১৪ তারিখের প্রোগ্রাম শেষ করে আমি ঘুমাবো। আবার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করবো। একদিনে অবস্থার পরিবর্তন হবে না। আমরা (নারীবাদীরা) বিপ্লবী। আমরা চাই নারী-পুরুষে সমতা এবং এ সমতা চাওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। প্রতিটি সমাজ এমন হওয়া উচিত যেখানে নারী অধস্তন নয়, নারী সম এবং স্বাধীন। তারাই আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রাখে, যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়, পুরুষের কর্তৃত্বাধীন ক্ষমতার নিচে যারা বাস করতে চায়। সমাজ এমন হওয়া উচিত যেখানে ক্ষমতার সমবণ্টন হয়। সুখবর হলো, নারীরা এখন তাদের ক্ষমতা চাইছে। এ আন্দোলন ক্রমে সবখানে ছড়িয়ে পড়বে এবং এ আন্দোলনে নারীরাই জয়ী হবে।