আবারও হাতের মুঠোয় সোনার বল—চতুর্থবারের জন্য ব্যালন ডি’অর লিওনেল মেসির। এর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গড়লেন নতুন ইতিহাস। জিনেদিন জিদান, রোনাল্ডোদের পরপর তিনবার সোনার বল জেতার কীর্তিকে ছাপিয়ে গেলেন তিনি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, আন্দ্রে ইনিয়েস্তা ও লিওনেল মেসি—এবারের পুরস্কারের দাবিদার ছিলেন এই তিনজন। কিন্তু, বাস্তবে লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী—মেসি না রোনাল্ডো! বিশ্বসেরা ফুটবলারের খেতাব হাতে উঠবে কার, এই নিয়েই ছিল জল্পনা-কল্পনা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বহু প্রত্যাশিত ক্লাইম্যাক্সের সমাপ্তি ঘটল মেসির হাতে। গার্ড মুলারের চল্লিশ বছরের রেকর্ড ভাঙা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবল মিলিয়ে ৯১ গোল—একের পর এক রেকর্ডের পাশে ফের অনন্য কীর্তি গড়লেন মেসি। চতুর্থ ব্যালন ডি’অর-এর মালিক লিওনেল মেসি ছাড়া আর কেই বা হতে পারেন!
অনেক ধারাভাষ্যকার, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক ফুটবলার মেসিকে প্রায়ই বর্তমান সময়ের সেরা ফুটবলার হিসেবে গণ্য করে থাকেন। মেসি ৫টি লা লিগা, ২টি কোপা দেল রে, ৫টি স্প্যানিশ সুপার কোপা, ৩টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ২টি সুপার কাপ ও ২টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছেন। ২০১২ সালে মেসি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে এক ম্যাচে ৫ গোল করে ইতিহাস গড়েন। এ ছাড়াও তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগে জোসে আলতাফিনির এক মৌসুমে করা ১৪ গোলের রেকর্ডও স্পর্শ করেন। মেসিই একমাত্র ফুটবলার যিনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগের চারটি মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। মেসি ২০১১-২০১২ মৌসুমে ৯১ গোল করে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের বিশ্ব রেকর্ড গড়েন এবং একই মৌসুমে লা লিগায় ৫০ গোল করে এক মৌসুমে লা লিগায় সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড গড়েন। তিনি ২০১২ সালে বার্সেলোনা ও জাতীয় দলের হয়ে ৯১ গোল করে জার্ড মুলারকেও ছাড়িয়ে যান। মেসি ২০০৫ সালে ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে ৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার কৃতিত্ব অর্জন করেন। মেসি ২০০৬ সালে প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ খেলেন। তিনি ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কনিষ্ঠতম আজেন্টাইন। ২০০৭ সালে কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা রানার আপ হয় এবং মেসি টুর্নামেন্টের কনিষ্ঠ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ২০০৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে মেসি আর্জেন্টিনা অলিম্পিক ফুটবল দলের হয়ে স্বর্ণপদক জেতেন। এটিই তার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা। মেসির খেলার ধরন ও সক্ষমতার কারণে তাকে আরেক আর্জেন্টাইন গ্রেট দিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে তুলনা করা হয়, যিনি নিজেই মেসিকে নিজের ‘উত্তরসূরি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
মেসির আদ্যোপান্ত
মেসি আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন তার পিতার নাম জর্জ মেসি ও মা’র নাম সেলিয়া মারিয়া। জর্জ একটি স্টিল কারখানার কর্মী ছিলেন এবং মারিয়া ছিলেন একজন পার্ট-টাইম ক্লিনার। মেসির বড় দুই ভাইয়ের নাম মাতিয়াস ও রদ্রিগো এবং বোনের নাম মারিয়া সল। ৫ বছর বয়সে মেসি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলি’র হয়ে খেলা শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে মেসি রোজারিও শহরের ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলতে শুরু করেন। তিনি একটি স্থানীয় যুব ক্লাবের অংশ হয়ে পড়েন যা পরবর্তী ৪ বছরে মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছিল। ১১ বছর বয়সে মেসির বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনের সমস্যা ধরা পড়ে। স্থানীয় ক্লাব রিভার প্লেট মেসির প্রতি তাদের আগ্রহ দেখালেও মেসির চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করা তাদের পক্ষে সেসময় সম্ভব ছিল না। স্পেনে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বার্সেলোনার তত্কালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর চার্লস রেক্সাসের নজরে আসেন মেসি। মেসির ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে রেক্সাস তখনই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে তিনি ন্যাপকিন পেপারে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। বার্সেলোনা মেসির চিকিত্সার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়। এরপর মেসি এবং তার বাবা বার্সেলোনায় পাড়ি জমান। সেখানে মেসিকে বার্সেলোনার যুব একাডেমীতে নথিভুক্ত করা হয়।
মেসি ২০০০-২০০৩ সালে বার্সেলোনার যুব একাডেমীর ইনফান্টিল বি এবং ক্যাডেট বি ও এ দলে খেলেছেন। এ সময় তিনি ৩০ ম্যাচে ৩৭ গোল করেন। ২০০৩-২০০৪ মৌসুমে মেসি পাঁচটি দলে খেলেছেন। তিনি জুভেনিল বি দলে খেলে ১টি গোল করেন এবং জুভেনিল এ দলে খেলার সুযোগ লাভ করেন। সেখানে তিনি ১৪ ম্যাচে ২১ গোল করেন। ২০০৩ সালের ২৯ নভেম্বর বার্সেলোনা সি দলে এবং ২০০৪ সালের ৬ মার্চ বার্সেলোনা বি দলে তার অভিষেক হয়। একই খেলার ধরন ও দৈহিক উচ্চতার কারণে, মেসিকে প্রায়ই তার স্বদেশি দিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে তুলনা করা হয়। মেসি অন্যান্য খেলোয়াড়দের তুলনায় অধিক ক্ষিপ্র এবং তিনি অতি দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেন। এ ছাড়াও তিনি কৌশলে ট্যাকল এড়িয়ে যেতে পারেন। তার খাটো ও শক্তিশালী পায়ের কারণে অতি অল্প সময়ে তিনি অধিক গতি অর্জন করতে পারেন। তার দ্রুতগতির পা তাকে গতিশীল অবস্থায়ও ড্রিবলিং করার ক্ষমতা প্রদান করে।
টুকরো খবর
মেসি ২১ বছর বয়স হওয়ার আগেই কয়েকবার ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন এবং ২২ বছর বয়সে দু’টি পুরস্কারেই ভূষিত হন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ২০১১ সালে ৩২ জনের নাম ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করে। এ তালিকায় ছিলেন স্টিভ জবস, আঙ্গেলা ম্যার্কেল, বারাক ওবামা প্রমুখ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব। মেসিও ছিলেন সে তালিকায়।
১৯৭২ সালে গার্ড ম্যুলারের করা দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত্ অক্ষত ৮৫ গোলের বিশ্বরেকর্ডটি তিনি ২০১২ সালে ভেঙে দেন।
