বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ, ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ, বত্সরের প্রথম দিনেই পাঠ্যবই বিতরণ, শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ উল্লেখযোগ্য। দেশের ইতিহাসে শিক্ষাখাতে সবচাইতে দুঃসাহসিক, যুগান্তকারী ও আশাব্যঞ্জক কর্মযজ্ঞ হইল বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ। প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি স্তরের সকল শিক্ষার্থী নূতন বত্সরের শুরুর দিনেই খালি হাতে বিদ্যালয়ে আসিয়া বাড়ি ফিরিয়াছে নূতন বই লইয়া। সংবাদ মাধ্যমগুলিতে হাস্যোজ্জ্বল শিক্ষার্থীদের সেইসব ছবি ও ভিডিও দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়াছি। পরপর চার বত্সর শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম দিনেই দেশের সকল ছাত্রছাত্রীর নিকট পাঠ্যপুস্তক পৌঁছাইয়া দেওয়া বর্তমান সরকারের সফলতার সবচাইতে বড় দৃষ্টান্ত। ইতোপূর্বে কোনো সরকারই ১ জানুয়ারি ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছাইতে পারে নাই। ‘ভিশন-২০২১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়িবার অভিপ্রায়ে এনসিটিবির ওয়েবসাইট তৈয়ার করিয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সকল পাঠ্যপুস্তকের পিডিএফ ভার্সন আপলোড করা হইয়াছে এবং মাধ্যমিক স্তরের ২০ হাজার ৫০০ স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম গড়িবার পদক্ষেপ নিয়াছে। ইহা ছাড়াও, ১৭ বত্সরের পুরাতন পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করিয়া এইবার যুগোপযোগী নূতন কারিকুলামে পাঠ্যপুস্তক প্রদান করা হইয়াছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ৩৭ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করিয়াছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ হাজার রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করিবার ঘোষণা দিয়াছে বর্তমান সরকার। শিক্ষাকাঠামোর নিম্নস্তরের এই সকল বৈপ্লবিক পদক্ষেপের জন্য সরকার ও তাহার শিক্ষামন্ত্রণালয়কে নিন্দুকেরাও নিশ্চয় মনে মনে সাধুবাদ জানাইবেন।
কিন্তু সাফল্যের এই প্রদীপ কালির পর্দায় ঢাকিয়া যাইবে উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রের দিকে তাকাইলে। বর্তমানে ৭২টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ লক্ষ ছাড়াইয়াছে। উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি ঘটিলেও গুণগত অবনতি কাহারও দৃষ্টি এড়াইবে না। শিক্ষার মানের অবনতি ও শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতায় তাহাদের শিক্ষাজীবন সবসময় অনিশ্চয়তার সূতায় দোল খাইতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অস্থিরতার পিছনে একশ্রেণীর শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনের ইন্ধন নিশ্চয় রহিয়াছে। তবে মূলে রহিয়াছে দলীয় আধিপত্য, ক্ষমতাসীনদের ভাগ-বাটোয়ারা, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী ও একচ্ছত্র করিতে ভিসিদের কর্তৃত্ব ও একনায়কসুলভ মনোভাব। আর এইসব কারণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জগন্নাথ, খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, এমসি কলেজসহ অর্ধশতাধিক বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করিতে হইয়াছে।
সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রণালয়ের। যুক্তিসঙ্গত কারণেই সার্বিকভাবে শিক্ষামন্ত্রীকে এই ব্যর্থতার দায়ভার লইতেই হইবে। কোনো সরকারই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য লইয়া ভাবেন না। তাহাদের উদ্দেশ্য কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় আধিপত্য ধরিয়া রাখিবেন। তাই নির্বাচন নয়, দলীয় আনুগত্যই ভিসি, প্রোভিসি ও অন্যান্য পদে নিয়োগের মানদণ্ড হইয়া উঠিয়াছে। ইউজিসি’র মতে, দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিদ্যমান অস্থিরতা শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকেই ব্যাহত করিতেছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আমাদের বিশেষ গুরুত্বারোপ করিতে হইবে এবং নগ্ন দলীয়করণ বন্ধ করিতেই হইবে। গুণ ও মানসম্পন্ন এবং সৃষ্টিশীল উচ্চশিক্ষাই পারে একটি জাতির মোড় ঘুরাইতে। রাষ্ট্রক্ষমতায় মহাজোট সরকারের শেষ বত্সরের চলা শুরু হইয়াছে। তাহারা কি একচ্ছত্র দলীয় আধিপত্যর লোভ সামলাইয়া উচ্চশিক্ষার অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরাইয়া দেওয়ার কথা ভাবিবেন?
