আপন ঠিকানায় ফেরা.....

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৬
ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির নানা শাখায় ছিল তার অবাধ বিচরণ। নাচ, গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, অভিনয়—সবই ছিল তার নখদর্পণে। তার বাবা এ কে শেয়াম আর মা চন্দ্রাদেবী দুজনই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাদের উত্সাহেই শানু নিজেকে এতদূর নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে জানালেন। স্কুল-কলেজে পড়াকালীন সময়ে জাতীয় শিশু সপ্তাহ ও জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদকসহ অনেকগুলো পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। শুধু কী তাই? সংস্কৃতির নানা শাখায় সাফল্যের পাশাপাশি একাডেমিক ক্যারিয়ারও তার স্বর্ণোজ্জ্বল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। শানু জানান, মাস্টার্স পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় জাতীয় পর্যায়ে ৯ম স্থান অধিকার করেন। এত মেধাবী একজন মানুষের তো প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা অথবা কর্পোরেট তারকা হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে তিনি হয়ে গেলেন শোবিজ তারকা। এমন কথা শুনে হাসতে হাসতে শানু বলেন, ‘আমাদের শোবিজ বিশেষ করে টিভি মিডিয়ায় এখন অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। ভালোভাবে বেঁচে থাকার পাশাপাশি সুন্দর জীবনযাপন করার সুযোগ আছে এখানে কাজ করে। সুতরাং এখানেও টিকে থাকা সম্ভব। মেধাবী মানুষরা শুধু কর্পোরেট তারকা আর সরকারি কর্মকর্তা হলে শোবিজে মেধাবী মানুষের সংকট দেখা দেবে।’ মিডিয়ায় নিজের স্বপ্ন পূরণের গল্প জানতে চাইলে শানারেই দেবী শানুর চোখ দুটি কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলা শুরু করলেন। তার ভাষ্যে, ‘আমার স্বপ্নের প্রথম ধাপটি ছিল লাক্স-আনন্দধারা মিস ফটোজেনিকে অংশগ্রহণ। ওই প্রতিযোগিতায় সেরা দশের একজন হই। এ অর্জনটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। এরপর আমার স্বপ্নগুলো আরও উত্সাহিত হয়ে মূলধারার মিডিয়ায় পাখা মেলতে শুরু করেছিল। কিন্তু বাবা কিছুটা বাদ সাধলেন। বললেন, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হোক, তুমি আরও বড় হও, তারপর তোমার স্বপ্নপূরণ। অবশেষে বাবার বাধ্যগত হলাম, আমার শহর সিলেটেই থেকে গেলাম। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিল্পী হলাম। মঞ্চেও কিছু ভালো কাজ করছিলাম। ২০০৪ সালে এল একটি দারুণ সুযোগ—সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত শাকুর মজিদের ‘বৈরাতী’-তে অভিনয় করলাম। কিছু বোঝার আগেই ‘ঝিলিক-চ্যানেল আই ঈদ অনুষ্ঠান পুরস্কার’-এ শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম। এবার এল ২০০৫ সাল। আমার স্বপ্নপূরণের আরেকটি বছর। আমার অমোঘ স্বপ্ন আবার আমাকে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার, রূপসী তোমার গুণের খোঁজে’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করল। যদিও এতটা বেশি কল্পনা আমিও করিনি। যখন সেরা সুন্দরীর মুকুটটা বাংলাদেশের প্রথিতযশা অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা আমাকে পরালেন, তখন মনে হলো—‘আহা! এ মুহূর্তটার জন্যই কি আমি ছোটবেলায় খেলাচ্ছলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতাম!’ অসাধারণ অনুভূতি। পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। স্বপ্নের হাওয়ায় ভাসছিলাম। এখন আমার স্বপ্নগুলো পাখা মেলে মূলধারার মিডিয়ায় চলে এসেছে। সেরা সুন্দরী হওয়ার পর থেকে গুণী নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আরও অনেক ভালো কাজ করে যেতে চাই। এরই মধ্যে বেশ কাজ করেছি।’ শানু অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—শাকুর মজিদের ‘বৈরাগী’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘পলাশ ফুলের গন্ধ’, হুমায়ূন আহমেদের ‘কবি’, সালাউদ্দিন লাভলুর ‘সাকিন সারিসুরি’, রেজানুর রহমানের ‘আহ ফুটবল বাহ্ ফুটবল’, সাগর জাহানের ‘আরমান ভাই বিরাট টেনশনে’, শিমুল সরকারের ‘চোরকাব্য’, রিপন নবীর ‘আপনঘর’, অরণ্য আনোয়ারের ‘কবিরাজ গোলাপ শাহ’ ও ‘কর্তাকাহিনি’ প্রমুখ। কাজের মাঝেই জেভিয়ার শান্তনু বিশ্বাস নামের এক সুদর্শনকে বিয়ে করে সংসারজীবন শুরু করেন শানু। তাদের ঘর আলো করে আছে একমাত্র পুত্র জেনাস ঋত বিশ্বাস। তাদের দু’জনের পরিচয়, বন্ধুত্ব, প্রেম ও বিয়ের গল্পটাও বেশ মজার। শানুর ভাষ্যে, ‘আমার জন্ম সিলেটে মণিপুর সম্প্রদায়ে। আর খ্রিস্টান ধর্মের ছেলে জেভিয়ার শান্তনু জন্মেছে বরিশালে। আমাদের দেশে মণিপুরী সম্প্রদায়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। যার ফলে ওই গোত্রের মানুষগুলো নিজেদের মধ্যে সবকিছু ভাগাভাগি করতেই পছন্দ করেন। বাঙালি সমাজে খুব একটা মেলামেশা করেন না। সেই ছোট্ট একটি গোত্রে জন্ম নিলেও আমি বেড়ে উঠেছি বিশাল বড় এক মন নিয়ে। সুশিক্ষার আলোয় আাালোকিত হয়ে জগতের সব মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। তবে ছোটবেলা থেকে নিজের সমাজকে নিয়েও ভাবতাম। যে কারণে কোনো অনিয়মই আমার জীবন চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু হঠাত্ করে কোত্থেকে এক ঝড় এসে আমাকে যেন এলোমেলো করে দিল। লাক্সতারকা হওয়ার পর মিডিয়াতে কাজ করার কারণে অনেক সময় ঢাকাতে থাকতে হয় আমাকে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন খুব একটা ঢাকাতে না থাকার কারণে বড় একা একা মনে হতো নিজেকে। মিডিয়ার অনেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেও কাছের বন্ধু হিসেবে কাউকেই মনে ধরত না। সেই সময়ে হঠাত্ করে বাজপাখির মতো উড়ে এলো জেভিয়ার। রুমানা রশীদ ঈশিতা তার প্রথম নির্দেশিত নাটক ‘নিঝুম এক অরণ্যে’ নাটকে তার সঙ্গে আমিও অভিনয় করি। সেই থেকে প্রায় সময়ই জেভিয়ারের সঙ্গে দেখা হতো। আস্তে আস্তে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। দু’জনের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হলো। একে অপরের কাছে নির্ভরশীল মানুষ হলাম। মনের অজান্তেই আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেললাম। ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর আমরা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হই। এরপর সংসার জীবন শুরু। সেই থেকে জেভিয়ার সারাক্ষণই বন্ধু হয়ে আমার পাশেই আছে। আমাদের ঘর আলো করে আছে একমাত্র পুত্র জেনাস ঋত বিশ্বাস। তাকে ঘিরে আমাদের দু’জনের আনন্দ লুটোপুটি খায় দিনরাতের পুরোটা সময়।’ মাঝে সংসারের প্রয়োজনে তিনি মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি নিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে শানু বলেন, ‘আমি মা হয়েছি। এখন আমার সন্তানের বয়স দুই বছর। ওর পরিপূর্ণ দেখাশোনা করতে এই বিরতির প্রয়োজন ছিল। সন্তান কিছুটা বড় হয়েছে। তাই আবার অভিনয়ে নিয়মিত হয়েছি। কেননা, অভিনয়কে পেশা হিসেবেই নিতে চাই।’ বিরতির পর কাজের মান নিয়ে আপস করা ঠিক হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে সব সময় সবদিকে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। মাঝে মাঝে কিছু এলোমেলো কাজ নিজের অজান্তেই হয়ে যায়। এখন অবশ্য অভিনয়ে বেশি করে সময় দিতে পারব।’ শানু আরও বলেন, ‘আমি অভিনয়ে থাকলেও সব সময় আমার সন্তানের খোঁজ নিই। আমার সংসারের মানুষজন আমাকে খুবই সাহায্য করে। সবার সাহায্য আছে বলেই এভাবে ভাবতে পারছি।’ তিন মাস হয়ে গেল শানু মিডিয়াতে নিয়মিত কাজ শুরু করেছেন। বর্তমানে তার অভিনীত দুটি ধারাবাহিক নাটক প্রচার হচ্ছে। এগুলো হলো—মাছরাঙা টিভিতে অরণ্য আনোয়ারের পরিচালনায় ‘কবিরাজ গোলাপ শাহ’ ও আরটিভিতে ‘অলসপুর’। ‘কবিরাজ গোলাপ শাহ’ নাটকে খুশু চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এখানে তার কোআর্টিস্ট সাদু খাদেম। নাটকে দু’জনে চোর থাকেন। এ নাটকে নিজের চরিত্র নিয়ে শানু বলেন, ‘সব মিলিয়ে এ চরিত্রে অভিনয়টা আমি এনজয় করেছি। আর দর্শকরাও আমাকে এ রকম চরিত্রে সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন।’ তিনি এখন অভিনয় করছেন বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটকে। এরমধ্যে অরণ্য আনোয়ারের পরিচালনায় ‘কর্তাকাহিনী’ ও ‘বুকে তার চন্দনের ঘ্রাণ’, দেবাশীষ বড়ুয়া দীপের ‘জ্যোতিরাজ টিপু সুলতান’ ও ‘ইলেকশান ইলেকশান’, আপেল মাহমুদের ‘ছবির হাট’, ফয়সাল রাজীবের ‘পর্দার আড়ালে কে’ ও ‘রুপালি ও রুপালি পর্দার গল্প’ প্রভৃতি। এ ছাড়া রবি ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে শফিক বাবুর পরিচালনায় ‘দুইবোন’ নামের একখণ্ডের নাটকে অভিনয় করেছেন। আগামীতে সাজ্জাদ সুমনের একটি ধারাবাহিকসহ আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয়ের কথা চলছে। এখন অভিনয়ের সঙ্গে আরেকটু ব্যস্ততা আছে নিজের ফিটনেস ফিরিয়ে আনার জন্য। মা হওয়ার পর কিছুটা মুটিয়ে গিয়েছিলেন। বিরতির পর মিডিয়াতে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে লাক্সতারকা শানু বলেন, ‘না আপাতত নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। ভালো কাজ হলে করব। যেকোনো ভালো কাজই করতে চাই।’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন