ভিন্নমতহীন মিডিয়ার যুগে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের ব্যক্তিগত ইতিহাস

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১১
ভিন্নমতহীন মিডিয়ার এই যুগে আপনি এখানে ‘আনঅফিসিয়ালি সেন্সরড’ এক লেখকের কলাম পড়া শুরু করতে যাচ্ছেন। এমন এক লেখক যার ছাত্রজীবনের কোনো রচনা কোনো জাতীয় দৈনিক বা সাপ্তাহিক কখনো প্রত্যাখ্যান করেনি, অথচ যাকে প্রধান একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ১৮ বছর শিক্ষকতা করার পর আজ নিজের রচনা ছাপানোর জন্য একটি ‘নিরাপদ মিডিয়া’ খুঁজতে হচ্ছে। ‘নিরাপদ মিডিয়া’ হচ্ছে এমন একটি মিডিয়া যেখানে নিজের কোনো লেখা পাঠানোর পর তাকে আর এই বলে হা-পিত্যেস করতে হবে না:ছাপবে তো! মার্কিন প্রফেসর নোম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট:দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ দ্য ম্যাস মিডিয়া (লন্ডন:দ্য বডলি হেড, ২০০৮) বইতে দেখিয়েছেন ‘আনঅফিসিয়াল সেন্সরশিপ’ তথা ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ বা ‘স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ’ কাকে বলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড়লোক মালিকদের কর্পোরেট মিডিয়ার সত্যিকারের স্বাধীনতার দৌড় কোনো গীর্জা পর্যন্ত, সেটি তারা দেখিয়েছেন বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সহকারে। তাতে দেখা গেলো, ঐসব মিডিয়ার মতপ্রকাশের আঙিনাটি আসলে খুব সংকীর্ণ একটি গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঐ সীমার মধ্যে আটে যেসব মতামত, কেবল সেগুলোই তারা প্রকাশ করেন। সীমার বাইরে গেলেই কোনো মত আর প্রকাশিত হয় না। সেন্সরড হয়। সেন্সরশিপের এই সীমাটি কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিরোধী কোনো রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন এসে নির্ধারণ করে দেয় না। এ কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর মিডিয়ার নিজের দিক থেকেও কোনো সেন্সর আইন জারি করা লাগে না। আইন-কানুন এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দিক থেকে মার্কিন মিডিয়া সত্যিই স্বাধীন। কিন্তু স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের সীমা নির্ধারণ করে মিডিয়া নিজেই। আর্থ-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিডিয়ার যে গড়ন-কাঠামো সেই কাঠামোর খুঁটিগুলোই নির্ধারণ করে দেয় কী ছাপা যাবে আর কী ছাপা যাবে না। খুঁটিগুলোর দিকে তাকালে আপনিও বুঝবেন এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আপনি কতটা কী প্রত্যাশা করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির দিকে তাকান। প্রথমেই দেখতে পাবেন কর্পোরেট মিডিয়া একটি বৃহত্ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ভয়ঙ্কর মাত্রায় কেন্দ্রীভূত। এর মালিকগোষ্ঠী সমাজের এক শতাংশ মানুষের অন্তর্গত। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর প্রধানতম তাড়না মুনাফার। খরচ কমানো এবং আয় বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য। তাহলে ব্যবসা নামক জিনিসটার স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছু কি এখানে ছাপানো সম্ভব? মুনাফা-তাড়নার জন্য অস্বস্তিকর এমন কোনো মত কি এতে প্রকাশ করা সম্ভব? ব্যক্তিগত মালিকানার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে কি এখানে কথা বলা সম্ভব? বড়লোক-গরিবের শ্রেণিবিন্যাসগত বৈষম্য ও অসমতার জন্য বেমানান হয় এমন কোনো কথা কি আদৌ এখানে তোলা সম্ভব? দেখুন দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য। কর্পোরেট মিডিয়ার আয়ের প্রাথমিকতম উত্স হচ্ছে বিজ্ঞাপন। এটি এর পাঠকগোষ্ঠীকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে দেয় টাকার বিনিময়ে। যার পাঠক-দর্শক-শ্রোতা বেশি তার বিজ্ঞাপন বেশি, টাকা বেশি। তাই যেভাবেই হোক, যে উপায়েই হোক, পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা বাড়ানো দরকার। তাহলে পাইকারি হারে পাঠক বাড়ানোর জন্য সস্তা, কিমাকার রুচি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প এর কাছে আছে কি? বিজ্ঞাপনী বেচাকেনাকে আড়াল করার স্বার্থে নানান ‘সমাজসেবা’মূলক কাজের ভান করা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকে কী? আর বিজ্ঞাপনদাতাদের স্বার্থের বিরুদ্ধাচরণকারী মতামতের বা ব্যক্তির ‘গলা’ কেটে ফেলা ছাড়া এই মিডিয়ার উপায় কী? খোদ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কোনো কথা প্রকাশের উপায় তার আছে কী? জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন, ব্যক্তির ও সমাজের প্রতিরোধের আওয়াজ ছাড়া আর যা কিছুই কর্পোরেট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয় তার সবই বিজ্ঞাপন ও পাবলিক রিলেশন্স মাত্র। সুতরাং বিজ্ঞাপন ও পাবলিক রিলেশন্সের বাইরে যা কিছু আছে তার সবই প্রকাশের অযোগ্য হয়ে পড়ে। নিজেই নিজের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা ছাড়া তখন আর পথ কোথায় এই মিডিয়ায়? তৃতীয় যে বৈশিষ্ট্যটিকে চমস্কি-হারম্যান শনাক্ত করেছেন তা হলো ‘বিশেষজ্ঞদের’ দেয়া তথ্যের ওপর মিডিয়ার নিরুপায় নির্ভরশীলতা। এসব ‘বিশেষজ্ঞ’রা আসলে সরকার, ব্যবসায়ী মহল এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিশেষ পছন্দের বুদ্ধিবৃত্তিক এজেন্ট মাত্র। এরা সব কেউ লাল রঙের কেউ বা নীল, কিন্তু আদতে একই পদার্থ। মিডিয়ার যতগুলো মুখ আছে সবই মূলত একই চেহারা, একই কণ্ঠস্বর। এছাড়া আপনাকে যদি সত্যি সারাদেশ থেকে দরকারি খবর জোগাড় করতে হয় এবং সেগুলোর সত্যিকারের বিশ্লেষণ পেশ করতে হয় তাহলে তো হাজার হাজার সংবাদদাতা, শত শত বিশ্লেষক দরকার পড়বে। খরচের সীমা-পরিসীমা থাকবে না। মুনাফা যাবে কমে। সুতরাং সমাজ-সংসারে যা-ই ঘটুক না কেন, ধূর্ত শেয়াল কর্তৃক বোকা কুমিরকে একই ছানা বারবার দেখানোর মতো হাতেগোনা দু-এক ডজন ‘বিশেষজ্ঞ’কে ক্রমাগতভাবে হাজির করে কর্পোরেট মিডিয়া। এজন্য তাকে বানাতে হয় সর্বগ্রহণযোগ্য বুদ্ধিজীবীর ভাবমূর্তি। বানাতে হয় এই ধারণা যে, কতিপয় বিশেষজ্ঞ ছাড়া আমরা নিজেরা নিজেদের জীবনের জ্ঞান অর্জন করতে, নিজেরা নিজেদের চালাতে অক্ষম। কাজেই শাসক-প্রশাসক, মন্ত্রী-মিনিস্টার, পার্লামেন্ট-পুলিশ, আইন-আদালত, কারাগার, মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় কতকগুলো কর্তৃত্ব কর্তৃপক্ষের কাছে জীবন সমর্পণ করে দিতে হবে আমাদের। একথা বলা ছাড়া মিডিয়ার উপায় কী? আর এসব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কথাবার্তাকে ‘অবাস্তব’ ‘আজগুবি’ ‘আবর্জনা’ হিসেবে নিউজ রুমের ঝুড়িতে ফেলে দেয়া ছাড়া কর্পোরেট মিডিয়ার পথ কই? কর্পোরেট মিডিয়ার চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে ‘ফ্ল্যাক’ অথবা ‘চিন্তা-চাবুক’। সাংবাদিকতা বিষয়ক নানা বিভাগ, নানান প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন পুরস্কার-তিরস্কার, সাংবাদিকতা-বিশেষজ্ঞদের লেখাপত্র এবং তাদের টকশো ইত্যাদির মাধ্যমে মিডিয়াকে ‘নিয়মানুবর্তিতা’ শিক্ষা দেয়ার হাতিয়ার হচ্ছে ‘ফ্ল্যাক’। মিডিয়া যদি প্রথম কয়েক দিনে বিডিআর-বিদ্রোহের সপক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে, তো পরের কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ‘বিভ্রান্তি’ তারা দূর করে ফেলে চিন্তা-চাবুকের চাবকানিতেই বটে। সুতরাং ‘বিভ্রান্তিকর’ যাবতীয় কিছুই মিডিয়াতে প্রকাশের অযোগ্য হয়ে পড়ে। কর্পোরেট মিডিয়ার পঞ্চম বৈশিষ্ট্যটি কর্পোরেট মতাদর্শ। কখনো ‘কমিউনিজম-বিরোধিতা’, কখনও ‘সন্ত্রাসবাদ-বিরোধিতা’, কখনো ‘ইসলাম-বিরোধিতা’র মতাদর্শ। আবার কখনও ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ তথা ‘নয়া উদারনীতিবাদ’-এর প্রতি ঢালাও সমর্থনের মতাদর্শ। এসব মতাদর্শই হচ্ছে মুনাফার ধর্ম, সেন্সরশিপের ধর্ম। কর্পোরেট মিডিয়ার ধর্ম। সুতরাং রাষ্ট্র-কর্পোরেট সেক্যুলার ধর্মের বাইরেকার ‘বিধর্মী’ কোনো মতামত-খবর মিডিয়ার কাছে স্রেফ ‘নাস্তিকতা’, যার জন্য সেন্সরশিপ ছাড়া উপায় থাকে না। মালিকানা-মুনাফা-ব্যবসা; আয় হিসেবে বিজ্ঞাপন; বিশেষজ্ঞ-নির্ভরতা; চিন্তা-চাবুক; এবং কর্পোরেট মতাদর্শ। কর্পোরেট মিডিয়ার এই পাঁচ খুঁটি বা পাঁচ বৈশিষ্ট্যকে চমস্কি-হারম্যান আখ্যায়িত করেছেন পাঁচ ‘ফিল্টার’ হিসেবে। সংবাদের বা মতামতের কাঁচামালকে অবশ্যই এসব ধারাবাহিক ফিল্টারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। পরিশেষে পড়ে থাকে কেবল সেই ‘পরিচ্ছন্ন’ তলানিটুকু, যা ছাপার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এই ফিল্টারগুলো সমাজে বিদ্যমান আলাপ-আলোচনা-তত্পরতার বা ডিসকোর্সের ভিত্তিমূল। এই মূলের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে খোদ সংবাদ ও মত প্রকাশের সংজ্ঞা। কাজেই এই পুরো প্রক্রিয়াটা ‘সাংবাদিকতা’ নামক যে জিনিস উত্পন্ন করে, তা আসলে বড়লোক শ্রেণির ধ্যান-ধারণা ও সমাজবিন্যাসের সপক্ষে পরিচালিত প্রোপাগাণ্ডা ছাড়া কিছুই না। অন্য যেকোনো প্রচারণা বা প্রোপাগাণ্ডার মতোই এ বস্তু অত্যন্ত সিস্টেমেটিক, অনুমানযোগ্য, একেপেশে এবং পৌনপুনিক। কর্পোরেট সাংবাদিকতার এই মডেলটিকে চমস্কি-হারম্যান তাই আখ্যায়িত করেছেন ‘প্রচারণা মডেল’ নামে। প্রচারণা মডেলের ফিল্টারগুলোর পরিণামেই সমাজে গড়ে ওঠে এলিট-একাধিপত্য এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কোণঠাসা করার যন্তরমন্তর-কলাকৌশল। গোটা প্রক্রিয়াটি চলে মুক্তবাজারের নিয়মেই; এবং তা এতই ‘স্বাভাবিক’ একটা প্রক্রিয়া যে সাংবাদিকরা সাধারণত টেরই পান না যে, তারা কোনো সেন্সরড প্রচারণা-সিস্টেমের ভেতরে কাজ করছেন। তারা ভাবেন তারা কতকগুলো পেশাগত সংবাদ-মূল্যের ভিত্তিতে ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ সংবাদ-মতামত বাছাই করছেন। ফিল্টারগুলোর বাধা সাপেক্ষে তারা বস্তুনিষ্ঠই থাকেন বৈকি। আর এই ছাঁকনিগুলো এত শক্তিশালী এবং এমন মৌলিকভাবে সিস্টেমের ভেতর থেকে গড়ে-ওঠা যে সংবাদ-মতামতের বিকল্প কোনো ভিত্তির কথা কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আজকের বাংলাদেশেও কর্পোরেট মিডিয়ার যুগ চলছে। আমাদের কর্পোরেট মিডিয়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিওলিবারাল বা মুক্তবাজার মিডিয়ার মতোই ‘স্বাধীন’ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে আমার মতো তুচ্ছ লেখককেও স্রেফ নিজেকে বোঝার তাগিদে (অর্থাত্ নিজের কচিবেলার রচনার প্রকাশযোগ্যতা আর পক্বকালের রচনার অপ্রকাশযোগ্যতার পরস্পর বিরোধিতাকে বোঝার তাগিদে) আলোচনা করতে হয় স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের তাত্পর্য। মনে পড়ে এক-এগারোর জরুরি আইনকে স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে চ্যালেঞ্জ করার পরিণামে জেল খেটে বেরুনের সময়টাতে ‘মিডিয়ার খাদ্য’ হিসেবে যখন আমার-আমাদের বাজারদর চড়া, তখন প্রথম আলো পত্রিকাটি বারংবার চাওয়ার পর আমি তাদের এক ধাক্কায় আটটা কলাম পাঠাই। দিন পনেরো ধরে ধাক্কাটা দিব্যি সামলে নেবার পর তারা জানান একটা কলামও তারা ছাপতে পারছেন না। বাপ রে! কি ভয়াবহ লেখক আমি! আর কি ভয়াবহ এই পত্রিকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বনির্ধারিত সীমা! (আটটা কলামই পরে অবশ্য লন্ডন প্রবাসী বাঙালিদের অনলাইন ‘ইউকে বেঙ্গলি’তে ছাপা হয়।) তখনই ‘সমকাল’ পত্রিকায় আমার ঐ আট কলামের অন্যতম রচনা ‘আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’ ছাপতে হয়েছিল সেনাবাহিনী সংক্রান্ত অংশগুলো বাদ দিয়ে। এই দুই পত্রিকার অভিজ্ঞতার পর দৈনিকে আমি আর লেখা দিই নি। কেউ চাইলেও না। (ব্যতিক্রম ছিল আমার দেশ। ওদের দিয়েছিলাম ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের বিপজ্জনক পথ’ নামে আমার একটি ‘বিপজ্জনক’ লেখা। ছাপা হয়েছিল ১৫ই আগস্ট ২০১১-তে। ছাপা হয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের মূল্য তাদের চেয়ে বেশি এখন আর কেউ জানেন না। পরে যখন তারাই আবার ক্ষমতায় যাবেন তখন সেই জ্ঞান পত্রিকায় কতটা লাগাবেন তা দেখার জন্য অপেক্ষা বাকি।) ওদিকে উপর্যুপুরি অনুরোধে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এর ‘মতামত-বিশ্লেষণ’ সেকশনে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে একটি লেখা দিয়েছিলাম। ছাপা হয়েছিল ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বরে। বুক বেঁধেছিলাম সেবার:দৈনিক না ছাপুক, অনলাইন তো আছে! কিন্তু কীসের কী। পরবর্তী তিন মাসে আরো অনেক অনুরোধের পর রা.বি. সঙ্গীত ও নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি-অপসারণ-আন্দোলনের সময়, গত বছরের ৪ এপ্রিলে ঐ বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এ পাঠিয়েছিলাম ‘রাবি নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ:যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ?’ নামের একটা লেখা। কয়দিন সময় নিয়ে অবশেষে তারা জানালেন:ছাপা হচ্ছে না। সম্প্রতি গত ৩০ নভেম্বরে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এ পাঠিয়েছিলাম ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চরিত্র হচ্ছে তার স্বাধীনতা’ নামের একটি রচনা। আগাম আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম বিডিনিউজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে। সুস্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু ছাপা হবে, ছাপা হচ্ছে, করতে করতে শেষে তারাও জানালেন:ছাপা হচ্ছে না। কারো নিন্দা করার জন্য এসব কথা এখানে তুলছি না। যাদের কথা বললাম, তারা কখনোই আমার কোনো রচনা-অনুবাদ ছাপেন নি তা নয়। অবশ্যই ছেপেছেন:যখন তাদের সীমার মধ্যে এঁটেছে। এরা সবাই আমার বিরুদ্ধে বা স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, কিংবা আমি নিজে ইদানীংকালে বিরাট কোনো অশ্বডিম্বে পরিণত হয়েছি। মোটেও তা নয়। এটুকুই শুধু বলতে চাইছি যে, মৌলিক অর্থে ভিন্নমতহীন এক চকচকে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের সমাজ। স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের ব্যক্তিগত (তথা সামাজিক) ইতিহাস তাই টুকে রাখা দরকার। তাতে আমরা বুঝতে পারব সত্যিকারের (আনসেন্সরড) স্বাধীনতার গুরুত্ব কী। অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই আমাকে আজ শিখতে হচ্ছে:ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র। আমি জানি, পাঁচ খুঁটির মুক্তবাজার সাংবাদিকতার ঐ দালানটা কংক্রিটের কোনো নিশ্ছিদ্র চাঁই নয়। জীবিকার দায়ে যারা এর ভেতরে আছেন তারা তো মানুষই বটেন। এখনও সকল মানুষ দাসত্ব অবলম্বন করেন নি। আজকের মিডিয়া এবং স্বাধীন লেখকরা ঐ কংক্রিট-দালানের ফাঁকফোকরগুলোকে কতটা কাজে লাগাতে পারেন তার ওপরই নির্ভর করবে আমাদের সার্বিক মুক্তির ভবিষ্যত্। লেখক :কবি-প্রাবন্ধিক-শিক্ষক ইমেইল: salimrezanewton¦gmail.com