সত্যিকার অর্থে ‘গণতন্ত্র’ বলতে যা বোঝায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলতে সাংবিধানিক অর্থে আমরা যা বুঝি, বাংলাদেশ এখন তার অনন্য উদাহরণ। প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সমস্ত রাজনৈতিক দলের চিন্তা-চেতনা, প্রচারণা, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রস্তুতি সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু এখন বাংলাদেশের জনগণ। আর জনগণকে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করেছে বাংলাদেশের সংবিধান এবং এটা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাঁর প্রতিটি নির্বাচনী প্রচারণায় এখন একটি অনন্য বক্তব্য দিয়ে থাকেন, “জনগণ চাইলে আবার ক্ষমতায় আসবো, না চাইলে আসবো না”। এটা শুধুমাত্র একজন সফল রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই বলা সম্ভব।
সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা। বাংলাদেশে এখন ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজমান, সহ-অবস্থানের রাজনীতি চলছে, যা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পরে বাংলাদেশে আর কখনো ছিল না। আর এই পরিবেশ ফিরে এসেছে বিগত ১ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বরের ধারাবাহিকভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিশেষত, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের সফল মতবিনিময়— প্রকারান্তরে সংলাপের ফলে। সর্বোচ্চ মহলে সংলাপ হয়েছে, সফল মতবিনিময় হয়েছে, এটা আমরা সকলেই জানি। আমরা এও জানি যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে কোনো সংলাপই সফল হয়নি। এবারের সংলাপ সফল হওয়ার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, সংলাপে ঔদার্য ছিল, যার ফলশ্রুতিতে ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এর মতো অবস্থা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সংলাপ গণতন্ত্রের সফলতার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। সংলাপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং নির্বাচনে তিনটি স্টেকহোল্ডারের (দেশের জনগণ, নির্বাচন কমিশন এবং সকল রাজনৈতিক দল) অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
গণতন্ত্রের সাফল্যের পূর্বশর্ত হলো দেশের সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন, যা বর্তমান সরকার নিশ্চিত করতে পেরেছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সকল দলের নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রস্তুতি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত, যা দৃশ্যমান। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানেই সফল এবং স্বচ্ছ নির্বাচন। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অধিকার এবং দায়িত্ব যে সে তার কর্মী দিয়ে এবং এজেন্ট দিয়ে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ বজায় রাখবে। এটা নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে কখনোই করা সম্ভব না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নালিশ-পাল্টা নালিশে প্রায় ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তার বদলি চেয়েছেন নির্বাচনের মাত্র ৩৮ দিন আগে। এই কর্মকর্তাদের বদলি শুধুমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থাকেই ব্যাহত করবে না, বিরোধী দলগুলোর দূরদৃষ্টিহীনতারও পরিচয় বহন করে। কারণ নির্বাচন সারা বাংলাদেশেই হবে এবং বাংলাদেশেই তাদের কোথাও না কোথাও দায়িত্বে দিতে হবে। ৭০ জন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বদলির কার্যক্রম সম্পূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমকেই ব্যাহত করতে পারে এবং এটা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও খুব সুখকর হবে না। এছাড়াও ড. কামাল হোসেন সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরিবর্তন চেয়েছেন। এই অন্তিম মুহূর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরিবর্তন চাওয়া মানে নির্বাচন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা। ঐক্যজোটের দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করা। কারণ নির্বাচন কমিশন সফলভাবে কাজ করতে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন যথাসম্ভব সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেই কাজ করে যাচ্ছে। ইভিএম মাত্র ছয়টি কেন্দ্রে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা মাত্র শতকরা দুই ভাগ। এমনকি ১৫ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে ছোট ছোট দলে সেনাবাহিনী নির্বাচনী দায়িত্বে উপস্থিত থাকবে।
প্রার্থী নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য দিয়েছে। ২৩১ জনের প্রার্থিতা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র ৪৫ জন নতুন প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। প্রার্থী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিগত ১০ বছরের এমপিদের এবং কর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের নিজেদের বিজয়, নিজেদের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে অর্জন করে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই। অন্যদিকে, ঐক্যজোট এখনও তার প্রার্থী শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রকারান্তরে, এটা জানা যাচ্ছে যে, ঐক্যজোটের নির্বাচনী ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস গবেষণা করার প্রতিশ্রুতি থাকার সম্ভাবনা আছে। ঐক্যজোট জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে বাংলাদেশের কোন ইতিহাস লিখবেন সেটা বাংলাদেশের সচেতন জনগণের সঠিকভাবে চিন্তা করে নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণ তথা ভোটপ্রদান করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশের সিংহভাগ ভোটারই যুবক, যাদের বেশিরভাগই বিগত ১০ বছরে ভোটার হয়েছে। তারা বিগত ১০ বছরে সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখেছে। অনুভব করেছে স্কুলে-পড়া বাংলাদেশের ইতিহাস কতটা বিকৃত ছিল। দেখেছে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, যা পৃথিবীর যেকোনো উন্নত রাষ্ট্রের সমান সুযোগ দিচ্ছে দেশের বর্তমান প্রজন্মকে। নতুন প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন দেখতে চায়, নিজস্ব উদ্যোগে কিছু করতে চায়। বাংলাদেশে এখন নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণির জন্য ইতিবাচক পরিবেশ বিরাজমান, কারণ বাংলাদেশে শুধু রাজনীতিতেই ইতিবাচক অবস্থা নয়, সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক অবস্থা বিরাজমান। ধারাবাহিকভাবে বিগত বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ ভাগের বেশি ছিল, যা এবছর শতকরা ৭ ভাগকেও অতিক্রম করে গেছে। এমডিজি-র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এমডিজিতে দারিদ্র্যসীমার লক্ষমাত্রা ছিল শতকরা ২৯ ভাগে কমিয়ে আনা, যা ২০১৫ সালে কমে হয়েছিল শতকরা ২৪ ভাগ। বর্তমানে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমান দারিদ্র্যের হার শতকরা ২২ ভাগেরও নিচে নেমে এসেছে।
বর্তমান সরকার তার ‘ভিশন ২০২১’ ও ‘ভিশন ২০৪১’ জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। বিএনপি তার ২০৩০ পরিকল্পনার কথা বলেছে কিন্তু সেটা এখনো জনসম্মুখে আসেনি, আর সামনে নাও আসতে পারে। কারণ ঐক্যজোটের অন্য কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে, সেটাও অনিশ্চিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ‘ভিশন ২০২১’ অর্জনের পথে এবং ‘ভিশন ২০৪১’ পরিকল্পনা জনগণের সামনে বিরাজমান থাকায় এই দেশের জনগণ বিশ্বাস করেন এবং আস্থা রাখেন যে, বিগত ১০ বছরে বর্তমান সরকার যে উন্নয়ন করেছেন, ‘ভিশন ২০২১’ অর্জিত হতে যাচ্ছে এবং ‘ভিশন ২০৪১’ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশ তথা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বর্তমান সরকার ভবিষ্যত্ ২০০ বছরের বাংলাদেশ নিয়ে পরিকল্পনা করছে, ডেল্টা প্ল্যান— যা এখন জনসম্মুখে। এই ধরনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাংলাদেশের আর কোনো সরকারই কখনো করেনি। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে অভিজ্ঞতা নিলে আমরা জানতে পারি, কেবলমাত্র টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নই টেকসই রাজনৈতিক পরিবেশ দিতে পারে, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে আর এগুলোই গণতন্ত্রের সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত। সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশে একবার মুক্তিযুদ্ধের জন্ম হয়, সে জাতি নিজেই তার পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশের জনগণ এখন দুইভাগে বিভক্ত: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। জাতিকে এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, জানতে হবে জাতিকে কারা দ্বিধাবিভক্ত করেছে তার সত্যিকার ইতিহাস। কারণ এই বিভক্তি করা হয়েছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে ফেলার জন্য। বাংলাদেশের নাগরিকদের দায়িত্ব ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের ৪টি মূলনীতির ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যথাযথ বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। আর সেটা সম্ভব শুধুমাত্র পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ক্ষমতায় আসলে। তাহলেই আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রেখে যেতে পারবো।
n লেখক: অধ্যাপক ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
