ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে। আহতদের ইবি মেডিক্যাল ও আশপাশের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এসময় অন্তত ১২ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের খবর পাওয়া গেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ও শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় মমতাজ ভবনে ব্যাপক ভাংচুর করা হয়। ছাত্রদলের আট নেতা-কর্মীকে পুলিশ আটক করেছে।
গত ১২ জানুয়ারি শিক্ষক-দের উপর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হামলার প্রতিবাদে গতকাল সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রদল। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে শুরু করে প্রশাসন ভবনের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশ শেষে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা মেইন গেইট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় পিছন দিক থেকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা ধাওয়া দিলে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা পালিয়ে তৃতীয় গেটে অবস্থান নেয়। আর ছাত্রলীগ অবস্থান নেয় মেইন গেটে।
পালানোর সময় ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাংচুর করে। পরে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা সংগঠিত হয়ে তৃতীয় গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে ছাত্রলীগ কর্মীরা আবার ধাওয়া দেয়ার চেষ্টা করে। এতে উভয় গ্রুপের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় উভয় গ্রুপ দেশি অস্ত্রশস্ত্রসহ লাঠিসোঁটা-ইটপাটকেল নিয়ে আক্রমণ করে এবং অন্তত ১২ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের শব্দ শোনা গেছে। সংঘর্ষের সময় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল জোয়ার্দ্দারসহ কয়েকজন নেতা-কর্মীদের দেখা গেছে লাঠি উঁচিয়ে পুলিশকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় ছাত্রদলের উপর আক্রমণে যাওয়ার জন্য। পুলিশ প্রথমে না যেতে চাইলে পুলিশকেও তারা পিটিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এসময় ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এক পুলিশ সদস্যের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তা ছাত্রলীগ নেতা সজিবের হাতে তুলে দেয়। সজিব সেই অস্ত্র দিয়ে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের উপর চার রাউন্ড গুলি করে। পরে পুলিশও ছাত্রদলের উপর চড়াও হলে এক পর্যায়ে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় গেট দিয়ে বের হয়ে যায় এবং কিছু নেতা-কর্মী শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় মমতাজ ভবনে আশ্রয় নেয়।
সংঘর্ষের সময় প্রশাসন ভবনের পাশে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি বাস ভাংচুর করা হয়। পরে ছাত্রলীগ কর্মীরা শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার মমতাজ ভবনে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। দুই ঘন্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তৌফিকুর রহমান হিটলার, বঙ্গবন্ধু হল শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সবুজ, ছাত্রলীগের বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী পিকুল (পিকুল ডাকাত, বোমা পিকুল নামে পরিচিত), হালিম, বাবুসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। অপরদিকে ছাত্রদলের সভাপতি ওমর ফারুক, সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, সহ-সভাপতি মুহাইমেনুল ইসলাম সোহাগ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের, সিরাজুল, আনিছ, ফারুক, রঞ্জু, সাব্বির, সাহেদ, রাসেল, শাহীন, তুহিন, আরিফ, জিল্লু, মেহেদি, উজ্জল, লিটনসহ অন্তুত ২৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ইবি ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক সৌরভকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে।
বিকাল তিনটার দিকে কুষ্টিয়া থেকে স্পেশাল পুলিশ ফোর্স এসে মমতাজ ভবনে আশ্রয় নেয়া ছাত্রদলের আট নেতা-কর্মীকে বের করে আটক করে। এসময় পুলিশ তাদের পিটিয়ে আহত করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। আটককৃত ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের মধ্যে আছেন, ইবি ছাত্রদল সভাপতি ওমর ফারুক, আমীরুল, মনির, রিপন, মাহতাব, আনিছ ও আরিফ। পুলিশ তল্লাশির নামে শিক্ষকদের বিভিন্ন কক্ষ ভাংচুর করেছে বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আক্তারুল ইসলাম জিল্লু, ছাত্র উপদেষ্টা টি এম লোকমান হাকিম, শাপলা ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আরফিন পুলিশের সাথে থেকে শিক্ষকদের বিভিন্ন কক্ষে ভাংচুর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কনস্টেবল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘পেটের দায়ে মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার কাজ করি। অথচ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আমাদেরই বেধড়ক পিটিয়ে আহত করল এবং আমাদেরই অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি করল। আমাদেরই এখন নিরাপত্তা নেই এবং চাকরি হারানোর ভয়ে এখন আমাদের বোবা কান্না কাঁদতে হচ্ছে।’
ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, ছাত্রদল আমাদের উপর হামলা চালালে আমরা প্রতিহত করেছি। পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, শিক্ষকদের উপর হামলার প্রতিবাদে আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল-সমাবেশ করলে ছাত্রলীগ আমাদের উপর হামলা করে। আমরা তা প্রতিরোধ করি। কিন্তু ছাত্রলীগ পুলিশের বন্দুক কেড়ে নিয়ে আমাদের উপর গুলি করে এবং পুলিশও আমাদের উপর আক্রমণ করে। এতে আমাদের অন্তত ৪০ নেতা-কর্মী আহত হয়।”
প্রক্টর প্রফেসর আক্তারুল ইসলাম জিল্লু বলেন, ক্যাম্পাসে মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রদল তা অমান্য করে মিছিল করলে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যেকোন ধরনের হামলা ঠেকানোর জন্য আমি সর্বাত্তক চেষ্টা করলেও তারা আমাদের অগ্রাহ্য করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায়।
এ ব্যাপারে ইবি থানার ওসি শেখ আতিয়ার রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে বার বার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
শিক্ষক সমিতির নিন্দা ঃ ক্যাম্পাসে সংগঠিত সংঘর্ষ ও পরবর্তীতে শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় ভাংচুর ও পুলিশের তল্লাশির নামে হয়রানির নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর নজিবুল হক ও সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ইকবাল হোসেন। বিবৃতিতে শিক্ষক নেতারা বলেন, শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে ছাত্রদলের মিছিলে হামলার ঘটনায় প্রমাণ করে ক্যাম্পাসে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কোন নিরাপত্তা নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, হামলাকারীরা কেবল নিরীহ ছাত্রদের হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং সম্মানিত শিক্ষকদের আবাসস্থল ইবি ডরমেটরিতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাংচুর এবং বইপত্র, ল্যাপটপ লুটপাট করে। পরবর্তীতে প্রক্টরের উপস্থিতিতে শিক্ষকদের আবাসকক্ষ তল্লাশির নামে চরমভাবে হয়রানি করা হয়। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর হামলা করে। ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক ভিসির মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। প্রক্টর ও প্রশাসনের সাহায্য চেয়েও আক্রান্তরা বার বার ব্যর্থ হয়। যারা আক্রান্ত হয়েছে উপরন্ত তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিবৃতিতে অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃংখলা রক্ষায় বার বার ব্যর্থ প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করা হয় ।
