মনে রাখতে হলে সবার আগে যেটি প্রয়োজন তা হলো মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে বিশ্রাম দেওয়া। মস্তিষ্কেরও বিশ্রাম প্রয়োজন আছে। কারণ মস্তিষ্কের যে অংশে প্রতিনিয়ত আমরা তথ্য সরবরাহ করি, সেখানে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে সেই তথ্য ভাণ্ডারে নানা অসঙ্গতি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এইমাত্র যার সঙ্গে গল্প করলেন কিছুক্ষণ পর তার নামটা হয়তো ভুলে গেছেন। অথবা স্কুল-কলেজে প্রেজেনটেশনের জন্য আপনি ভালোই তৈরি ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে কয়েকটি পয়েন্ট হাইলাইট করতে একদম ভুলে গেছেন। প্রতিদিন আমাদের চলার পথে এ রকম নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। কখনও পাসওয়ার্ড, ফোন নম্বর ও নাম ইত্যাদি মনে রাখতে ব্যর্থ হয়ে আমরা নানা ভোগান্তিতে পড়ি। তাই আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এমন কোনো পদ্ধতি আছে কি যার দ্বারা সহজেই মনে রাখার কাজটি করতে পারা যায়। হ্যাঁ, সত্যিকার অর্থেই এ রকম কিছু পদ্ধতি আছে। শরীরের অন্যান্য অংশের মতো ব্রেনকেও যখন ব্যবহার করা হয় তখন সে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সুতরাং মনে রাখার ক্ষমতাটা জন্মসূত্রে হলেও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট প্রয়োগ সীমা আছে। আমরা যদি উপযুক্ত পরিবেশ এবং শেখার মাধ্যম ও নিজের ইচ্ছা শক্তিকে প্রয়োগ করতে পারি তবে তা আমার স্মরণ শক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। ব্রেন কোনো কম্পিউটার নয় যে অতিরিক্ত র্যাম বা চিপ ঢুকিয়ে আমরা স্মৃতিশক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে পারি। তবে সঠিক চর্চার মাধ্যমে আমাদের স্মৃতিশক্তির কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করে মনে রাখার বিষয়টি শাণিত করতে পারি। ব্রেন পাওয়ার বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন নাম মনে রাখার জন্য নেম নিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাত্ কোনো নাম মনে রাখার জন্য ওই নামের সদৃশ প্রাকৃতিক দৃশ্য বা কোনো ছবি মনে রাখতে হবে। যেন ওই ছবি নাম মনে করলে ব্যক্তিটির নাম মনে হয়। একইরকমভাবে ফোন নম্বর কিংবা কোনো পাসওয়ার্ড মনে রাখতে চাংকিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। ফোন নম্বরটি যদি তিন বা দুই অক্ষরের রিদমে ভাগ করে নেন তবে সহজেই তা মনে রাখা সম্ভব হয়। অর্থাত্ কোনো ফোন নম্বর ০১৩ ৪২ ৬২ ৭৭ ৩৭ রিদমে মনে রাখতে চাইলে সহজ হবে। এ ধরনের পদ্ধতিগুলো ব্যক্তিবিশেষে ব্যতিক্রম হতে পারে। যে ব্যক্তি যে পদ্ধতিতে মনে রাখাটা সহজ ভাবেন তার সেই পদ্ধতিই মেনে চলা উচিত। কোনো কিছু পড়ার ক্ষেত্রে ছোট ছোট করে পড়ে মনে রাখার চেষ্টা করা ভালো। কোনো রচনা বা কোনো বিষয় একেবারে পুরোটা না পড়ে তার পয়েন্টগুলো মনে রাখার চেষ্টা করুন আগে। তারপর প্রতিটি পয়েন্ট মনোযোগ সহকারে পড়লে তা দ্রুত মনে রাখতে পারবেন। আসলে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের খুব কম অংশই ব্যবহার করতে পারি। যে কাজটা যেভাবে করে আসছি তা অন্যভাবে করার চেষ্টা করি না। মস্তিষ্ককে সেই চেষ্টার মধ্যে চালানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। প্রতিদিন আপনি যে রাস্তা দিয়ে যান যদি সব সময় সেই রাস্তা দিয়েই যেতে থাকেন তবে অন্য রাস্তা চেনার ক্ষেত্রে আপনার মস্তিষ্ক ক্ষমতা হারাবে। তাই পড়াশোনা ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত একই পদ্ধতি অনুসরণ না করে মাঝে মাঝে তা পালটানো ভালো। এতে পড়াশোনা সহজেই স্মরণে রাখা যায়। পাশাপাশি ব্রেনও রেস্ট পায়। ব্রেনকে চাঙ্গা রাখতে মাঝে মাঝে গান শোনা, কবিতা আবৃত্তি বা পছন্দের কোনো কাজ করতে হয়। এতে স্মরণশক্তি ভালো থাকে। কখনোই ব্রেনে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। এই ধরনের পদ্ধতির পাশাপাশি খাবারেরও একটি ভূমিকা আছে। ব্রেন সঠিকভাবে কাজ করার জন্য সঠিক পুষ্টি ও এনার্জির প্রয়োজন আছে। স্বাভাবিক নিয়মে আমাদের শরীরে যে অক্সিডেন্ট তৈরি হয় তা মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কিন্তু এমন কিছু খাবার আছে যা শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তৈরি করে মস্তিষ্ককে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সহযোগিতা করে। এই খাদ্য উপাদান সাধারণত মাছে বেশি পরিমাণে থাকে। তাই অনেকে বলেন মাছ মস্তিষ্কের বুদ্ধি বাড়ায়। মাছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড থাকে, যা স্মৃতিশক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। ফিশ অয়েল সাপ্লিমেন্ট, আখরোট, ফ্ল্যাকসিড, সয়াবিনও স্মরণশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। শাকসবজি ফলমূল খেতে হবে বেশি করে। এতে স্মরণ রাখার ক্ষমতা বাড়বে। শাকের মধ্যে পালং, ব্রুকলি, লেটুস পাতা এবং ফলের মধ্যে তরমুজ, আম ও গ্রিন টি খেলে মস্তিষ্ক সতেজ রাখার জন্য কার্বোহাইড্রেটও পাবেন পরিমাণ মতো। চিনি, পাউরুটি ব্রেনের জন্য ফুয়েলের মতো কাজ করলেও এগুলো তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। ব্রেন এনার্জি বজায় রাখার জন্য ভালো উপায় হলো কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট। ব্রাউন ব্রেড, ব্রাউন রাইচ, অটমিলসহ আরও নানা কিছু প্রতিদিনের তালিকায় রাখলে ব্রেন প্রয়োজনীয় এনার্জি পাবে। খাদ্যের বাইরে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভালো করে ঘুমানো। কেননা আপনার ব্রেন তখনই সঠিকভাবে কাজ করবে যখন ব্রেনকে প্রয়োজন মাফিক বিশ্রাম দিতে পারবেন। তাই চাইলে দুপুরে আধাঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারেন। দুপুরের নিটোল ঘুম ডিক্লোরাইড মেমরি বা পড়াশোনা করে যে জ্ঞান অর্জন করেছেন তাকে সুন্দরভাবে মস্তিষ্কে সাজিয়ে রাখতে সাহায্য করে। বেশি রাত জেগে না পড়ে রাতে পরিমাণমতো ঘুমাতে হবে। এতে আপনার ব্রেন সঠিক বিশ্রাম পাবে। কৌশল, খাবার ও ঘুমের পাশাপাশি আপনার স্মরণশক্তি বাড়াতে কিছু এক্সারসাইজও করতে পারেন। ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ শরীরের সাথে সাথে মস্তিষ্কের জন্য ভালো। মেডটেশনে কিছু যোগাসন আছে যা ব্রেনকে মনোযোগী ও স্মরণশক্তি বাড়িয়ে তোলে। আর সর্বোপরি নিজের সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগালে এবং বন্ধুদের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে পারলে স্মৃতিশক্তি দিন দিন বাড়বে। আশপাশের লোকজনের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন করলে তা ব্রেনের জন্য সত্যিকারের এক্সারসাইজও হয়; জীবনে সাপোর্ট সিস্টেম থাকাটা শুধু ইমোশনাল হেলথের জন্য নয়, ব্রেন হেলথের জন্যও অনেক বেশি জরুরি।
মডেল পর্ণা ছবি দীপঙ্কর দীপু
