ক্লাস টেনে পড়ে তখন মেয়েটা, একদিন দুপুরে মা হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। খুব কাছ থেকে মায়ের এই চলে যাওয়ার কথা মনে করে এখনও চোখের জল ফেলেন সেই মেয়ে। সেদিনই স্বপ্ন দেখেছিলেন চিকিত্সক হবেন, তার মা’কে পৃথিবীতে রাখতে না পারলেও এমন হাজারো মায়ের পাশে দাঁড়াবেন বিপদের মুহূর্তে। সেদিনের সেই বালিকা তার স্বপ্নের পথ ধরে হেঁটে এসেছেন অনেকদূর। আজকের সুকন্যা প্রীতি ঊষা তরুণ এক চিকিত্সক, একইসাথে নানা বিষয়ে নিজের প্রতিভার প্রমাণ রাখছেন। সুকন্যার কাছে আমরা তার আজকের এ পর্যায়ে আসার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘মা আর বাবার চলে যাওয়ার পর থেকেই চিকিত্সা পেশার প্রতি আগ্রহ খুব বেড়ে যায়।’ তার পরিবারের অন্যরাও তা-ই চাইছিল। আর যখন মেডিকেলে ভর্তি হলেন, জীবন নিয়ে পড়াশোনা তার কাছ খুব আকর্ষণীয় মনে হলো। বন্ধু ও শিক্ষকরা সব সময় তাকে অনেক উত্সাহ দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতার সাথে তিনি জোবায়ের ডা. শাহনেওয়াজ এবং ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের সহযোগিতা ও পরামর্শের কথা উল্লেখ করে জানালেন, তাদের স্নেহ দুঃসময়েও বন্ধুর পথ চলতে অনেক সহায়ক ছিল।
এ সময়ে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন মেডিকেলে পড়তে। হাজারো তরুণ-তরুণী প্রতি বছর যোগ দিচ্ছেন মানবসেবার এই মিছিলে। সুকন্যা মনে করেন, অনেকেই বাবা-মায়ের আগ্রহে মেডিকেলে পড়তে আসছে। আবার মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও অন্য ক্যারিয়ারে যেতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। এই ধারা থেকে বের হয়ে প্রত্যেককেই পছন্দের জায়গাটিতে সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তাহলেই প্রত্যেকে ভালো করতে পারবে। যাদের কাছে মেডিকেলে পড়াশোনাকে অনেক নিরস মনে হয় তাদের উদ্দেশ্যে সুকন্যা বলেন, এখানেও অনেক উত্সব-আনন্দ হয়। তিনি যখন বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে চলে আসেন, বুঝতেই পারেননি কতটা আনন্দে কেটে গেল হল জীবন। নিজেদের হলে আড্ডা, গানের আসর কখনও কখনও রূপ নেয় পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, হাসতে হাসতে জানান সুকন্যা। তিনি নিজেও পড়াশোনার পাশাপাশি এ ধরনের আয়োজনে সব সময় অংশ নেন। গান গাইতে ভালোবাসেন খুব, নাচতেও তার মানা নেই, আর মাঝে মাঝে নিজেদের আয়োজিত ফ্যাশন শোতেও অংশ নেন। অনেক গুণের এই সুকন্যা অসম্ভব সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করেন। এরপর জানালেন তার এত বিচিত্র ভালোলাগাতে যিনি সব সময়ই প্রশ্রয় দিয়ে সামনে তুলে এনেছেন তিনি ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশনের শোয়েব ভাই। তার মাধ্যমেই সুকন্যা অনেক ধরনের উত্সব-আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। পিছিয়ে পড়া তৃণমূল মানুষদের নিয়েও কাজ করতে চান ভবিষ্যতে। এই হলো সুকন্যার সাফল্যের কথা, এক-পা, দু-পা করে তার সামনে এগিয়ে চলার কথা। তবে এই পথ চলাটা কখনই তার জন্য খুব সুখকর ছিল না। বাবা-মা যার উপর অনন্ত নক্ষত্রবীথি হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন, সেই তরুণী অনেক কষ্ট আর নিজের পরিশ্রমেই গড়ে নিয়েছেন তার ভবিষ্যত্। বড় ভাই আর ছোট দু’ভাইবোন নিয়ে তাদের সুখের পরিবার এখন। বাবা-মায়ের শূন্যতায় কিছুটা পূর্ণতা এনে দিয়েছে মামা-মামী। আর ভাইবোনদের উত্সাহ অনুপ্রেরণাও পান তিনি সব সময়। সুকন্যার খুব শখ তারা সব ভাইবোনই একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবেন। তারা যেখানেই থাকুন, সেখান থেকে দেখবেন সন্তানদের এই অর্জন।
সুকন্যার ছেলেবেলা কেটেছে নরসিংদীর পলাশে। বাবা চাকরি করতেন ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানাতে। কোয়াটারেই কেটেছে শৈশব-কৈশোরের উচ্ছল দিনগুলো। ক্যাম্পাসে অনেক বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সহজেই মিশে যেতেন সুকন্যা। তার মাঝে এই গুণটা এখনও আছে। মানুষকে আপন করে নেওয়ার যোগ্যতাটা সুকন্যার আছে। ১৩ এপ্রিল জন্ম নেওয়া এই তরুণীর রবীন্দ্রনাথের কবিতা অসম্ভব ভালো লাগে। আমাদের তিনি শোনালেন ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ গেলে দিবস, / গেলে করিব নিবেদন, আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমর্পণ’ প্রিয় কবিতার মতো নয়, তিনি তার সেবায় অজস্র মানুষের মুখে হাসি ফোটাবেন, তার স্বপ্ন অনুযায়ী ছিন্নমূল মানুষগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন, এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।
