[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

চাই ধর্মনিরপেক্ষতার পথে সুদৃঢ় যাত্রা

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৯
সন্দেহ নেই, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়কে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। এর জন্য দুটি কারণ থাকতে পারে । প্রথমত, পার্টি ২০১৪ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিতব্য সংসদীয় নির্বাচন পরবর্তী দৃশ্যপটের দিকে স্থির দৃষ্টি রাখছে। কেননা সে সময় লোকসভায় সংখ্যাধিক্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতি বিরূপ মনোভঙ্গি পার্টির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি একটি টেকসই জোট গঠনের সম্ভাবনাকে বিপন্ন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিজেপি মনে করে যে, এ ধরনের মনোভঙ্গি অসাম্প্রদায়িক হওয়ার আবহ নির্মাণ করবে। এছাড়া বামপন্থি দলগুলোও তো হিন্দুসভার আয়ত্তের মধ্যে আছে, যদিও কংগ্রেস গত কয়েক বছর ধরে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার স্বচ্ছ অবস্থান ক্রমশই হারাচ্ছে। যদি প্রমাণের দরকার পড়ে সেক্ষেত্রে গুজরাট বিধানসভার নির্বাচনকে যথেষ্টই বলতে হয়; কিন্তু পার্টি কখনোই তার ভোটার সংশ্লিষ্ট প্রচারণায় এথনিং ক্লিনজিং-এর বিষয়টিকে স্পর্শ করেনি, যেটা মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিজেপি’র প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুলিশের মাধ্যমে ২০০২ সালে করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কংগ্রেস মনে করে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রচারাভিযানের সময় মুসলমানদের হত্যার বিষয় আলোচনায় আনলে তা হিন্দু ভোটারদের সংখ্যাকে কমিয়ে দেবে। এ বিষয়টি দেশজুড়ে মুসলমানদের কাছে আঘাত হিসেবে আসে। কেননা তারা বেশিরভাগই কংগ্রেসকে ভোট দেয়। যদিও মুসলমানদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় দ্বিধার জায়গাটি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল খুঁজে পাওয়া। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে গোঁড়া মৌলবাদিত্বের চর্চা হচ্ছে, যদিও এটা কোনো সমাধান নয়। এ বিষয়টিকে সম্প্রদায়গুলোকে কলঙ্কিত করার প্রমাণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। আর সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে সাধারণভাবেই মুসলিম সন্ত্রাসবাদ হিন্দু সন্ত্রাসবাদের সামনে দাঁড়াতেই পারে না। আমি বুঝেছি যে, হতাশাবাদী মুসলমানেরা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশ নেয়, অপরদিকে হিন্দুসেনা সংগঠন যেমন বাজরাগ দল, রামসেনা ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদও চায় যে, সম্প্রদায়গুলো এই পথেই চলুক। মালিগাঁও, আজমেরী ও হায়দ্রাবাদের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি এসব প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিসমূহকেই প্রমাণ করে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহভাজনের তালিকায় মুসলমানের নামটাই সবার প্রথমে ছিল, পুলিশের যেটা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ এবং এর ফলেই মুসলমান তরুণদের ধরপাকড় করার পাশাপাশি হায়দ্রাবাদে তাদের পুলিশ পিটুনির শিকারও হতে হয়। সম্প্রতি এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রকাশ করে। মূলত মুসলিম তরুণদের গণগ্রেফতারের ঘটনাটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ দুশ্চিন্তার কারণ । হিন্দু ব্যক্তিবর্গসহ একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে দেখা করে এর প্রতিকার দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী মুসলিম তরুণদের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেবেন বলে আশ্বস্ত করলেও মুসলিম সম্প্রদায় তাতে মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারছে না । অনেক মুসলিম তরুণ এখনও জেলে পচে মরছে, অপেক্ষার প্রহর গুনছে কখন তাদের মামলার কাঙ্ক্ষিত শুনানি হবে। জেলের অন্ধকার ঘরে তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে, যেটা হয়তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো ভালো কাজে ব্যয়িত হতে পারতো। হিন্দু-মুসলমানদের দূরত্ব যে ক্রমশ বেড়েই চলছে, এটা নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। এটা সত্য যে, তাদের মধ্যে দৃশ্যত কোনো সামাজিক যোগাযোগ নাই; কিন্তু আদান-প্রদানের সম্পর্কটুকুও হ্রাস পাচ্ছে। তবে একমাত্র ক্ষতিপূরণমূলক বিষয়টি হচ্ছে, গুজরাট হত্যাকাণ্ডের পর এখানটায় আর কোনো বড় ধরনের দাঙ্গা হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, দেশটি সাম্প্রদায়িকতার করাল গ্রাসের মাত্রাকে হ্রাস করে ফেলেছে। আসাম যার প্রকাশ্য উদাহরণ। অর্থনৈতিক ভাবাদর্শ আমি সম্প্রতি কেরালায় ছিলাম, যেখানে বামপন্থিরাও সাম্প্রদায়িকতার দোষে দোষী। এটা এমনই একটি রাজ্য, যেখানে খ্রিস্টানরা প্রতিনিয়ত তাদের প্রভাববলয়কে বিস্তৃত করে তুলছে, অন্যদিকে হিন্দু-মুসলমানদেরকে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। অদ্ভুত যে, তখনই দেশের অর্থনৈতিক ভাবাদর্শ ব্যর্থ হয়, যখন ধর্মীয় শেষ্ঠত্বের বিষয়টি ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। আমাদের ঠিক পেছনের উঠান, উত্তর প্রদেশ, শত শত জায়গায় ছোটো ছোটো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে প্রতিনিয়ত । কিন্তু গণমাধ্যম তাদেরকে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা দিচ্ছে না । আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, গণমাধ্যম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসমূহ সম্পর্কে ততক্ষণ পর্যন্ত কথা বলছে না, যতক্ষণ না সেগুলো বড় আকার ধারণ করে। একদিকে দিল্লির ঘটে যাওয়া ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে টানা যায়, যেখানে ২৩ বছর বয়সী একটি মেয়ের গণধর্ষণের প্রতিবাদে বিভিন্ন ধর্ম-গোত্রের শিক্ষার্থীরা একসাথে হয়েছিল এবং তারা প্রমাণ করেছিল যে, তারা স্বৈরশাসন প্রতিরোধের প্রশ্নে একাট্টা হতেও পারে। অন্যদিকে ভিন্ন আর এক গোষ্ঠীর মানুষ এমন একটা পথে হাঁটছে, যেটা ক্রমশই আমাদের ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কংগ্রেস নেতা আবুল কালাম আজাদ বা আবদুল গাফফার খানের মতো আমিও বিশ্বাস করি যে, সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি বৃটিশদের হাতেই গড়া এবং তারা চলে যাওয়ার সাথে সাথে এটারও বিনাশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি ভুল প্রমাণিত হয়েছি। দেশ ভাগের আগে যে ধরনের পাগলামি আমি দেখেছি, এখনও সেরকম বিষয়গুলো দেখতে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা এই ইস্যুকে তখনই জনগণের সামনে হাজির করে, যখন তারা নির্বাচন বা অন্য কোনো কাজের ক্ষেত্রে এটাকে লাভজনক উপায়ে ব্যবহার করতে পারে। এমনকি স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও ধর্মনিরপেক্ষতার শেকড়টি এখনও পোক্তই হয়নি। আর যেটা ঘটছে সেটা হলো, এই চেতনাটি ক্রমশই শুকিয়ে মলিন হয়ে যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে নিজের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার একটা মোক্ষম পথ হতে পারে তাদেরকে শাস্তি দেয়া, যারা নানাভাবে এই চেতনাকে বিনাশ করছে । বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারীদের এখনো শাস্তি দেয়া হয়নি। একইরকমভাবে প্রায় ১০০০ মুসলমানকে হত্যা করা সত্ত্বেও মোদিকে এখন স্পর্শই করা যায়নি। এ কাজগুলো করার মাধ্যমে বাস্তবধর্মিতার প্রয়োগ আনতে হবে। কিন্তু মুসলমানদের উপর এ কার্যসমূহের প্রভাব প্রকট। বিজেপি কংগ্রেসের দিকে আঙুল ইশারা করে ১৯৮৪ সালের শিখ হত্যাকাণ্ডের জন্য আর কংগ্রেস গুজরাট হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে বিজেপির তাক করানো অভিযোগের আঙুল তাদের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। বিতর্কের এ জায়গাটিতে দুটি ঘটনা যথেষ্ট ওজনবহুল। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের কাঙ্ক্ষিত ধর্মনিরেপক্ষতার বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আমার একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হলো, ভারতে সাম্প্রদায়িকতা ক্রমেই বৈধতা পাচ্ছে। মানুষগুলো অধিকসংখ্যকহারে ধর্মান্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। এমনকি পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মীরাও সাম্প্রদায়িকতার এই ভয়াল দূষণ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারছে না। এই ছোট্ট বিষয়টি তাদের উপলব্ধিতে আসা দরকার যে, গণতন্ত্র কোনো অর্থই তৈরি করতে পারবে না, যদি সেখানে বহুত্ববাদের চর্চাটা চলমান না থাকে। গণতন্ত্রকে যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে এর শরীর থেকে ঘৃণা আর পক্ষপাতকে ছেঁটে ফেলে দিতে হবে। সাম্প্রদায়িকতার বিষকে ছড়িয়ে দিতে হায়দ্রাবাদে আকবারউদ্দিন ওয়াসীর বক্তৃতা আমাকে বিস্মিত করেছে। আরো আশ্চর্য হয়েছি যে, জনগণ তাকে উত্সাহিত করছে দেখে। ভারতের মতো একটা দেশে তার মতো ব্যক্তির কোনো স্থান থাকতে পারে না। কারণ এরকম মানুষই ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক বাধা। সীমাবদ্ধতা যাই থাকুক না কেন, ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হেঁটে যেতে বদ্ধপরিকর এবং কিছু মৌলিক জায়গায় আমাদের আপোষ করার কোনো সুযোগ নেই । ভাষান্তর : নাসিমূল আহসান লেখক:ভারতের প্রথিতযশা প্রবীণ সাংবাদিক