গত পাঁচ বছরে দেশে নতুন জাতের কোন আখ চাষ হয়নি। চাষিরা পুরোনো জাতের আখ প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ করে আসছে। ফলে আখের ফলন বৃদ্ধির পরিবর্তে কিছুটা কমেছে বলে তাদের অভিযোগ। বৃটিশ আমলে পূর্ব বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আখ চাষ শুরু হয়। ১৯৩৩ সালে নাটোরের গোপালপুরে বেসরকারি উদ্যোগে একটি চিনিকল স্থাপিত হলে কর্তৃপক্ষ চাষিদের আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। ঐ সময় বিল অঞ্চলে ধান ও উঁচু অঞ্চলে পাট চাষ হতো। তখন নীল চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। নীল ও পাটের জমিই আখ চাষের জন্য বেছে নেয়া হয়। মূলত চিনিকলে সরবরাহের জন্যই আখ চাষ শুরু হয়। ভালো দামে নগদ টাকায় বিক্রি করা যেত বলে কৃষকরা আখ চাষে উত্সাহী হতে থাকেন। একই সাথে তখন গরুচালিত দেশীয় মাড়াই কল দিয়ে গুড় তৈরি করা হতো। বাঙালিদের প্রধান মিষ্টান্নই ছিল গুড়।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আখ। দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ একর জমিতে আখ চাষ হয়। দেশের প্রায় ৬ লাখ আখচাষি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে চিনিকলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আখ বিক্রি করে প্রতি বছর চাষিরা পায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এসব নগদ অর্থ চিনিকল ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আখ একটি লাভজনক ফসল হলেও উত্পাদনে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে চাষিদের কাছে এ ফসলটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়ে আসছে। বাংলাদেশে আখের ফলনও কম। হেক্টর প্রতি গড়ে মাত্র ৪৫ টন। চিনিকল এলাকায় আখের ফলন প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫০ টন। অপরদিকে চিনিকল বহির্ভূত গুড় উত্পাদন এলাকায় আখের ফলন মাত্র ৩৫ টন। যদিও ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত সর্বশেষ জাতের আখের হেক্টর প্রতি ফলন ১৩৯ টন। কিন্তু বিএসআরআই নামের ঐ জাতের আখের বীজ এখনও চাষিদের কাছে আসেনি। এছাড়াও তারা ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঈশ্বরদী-৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০সহ প্রায় অর্ধশত জাতের আখ উদ্ভাবন করেছেন। উল্লেখিত জাতের আখের হেক্টর প্রতি ফলন ১০০ টনের ওপরে। কিন্তু সেগুলোর বীজ চাষিরা এখনও পাননি। তারা নিজেদের জমিতে উত্পাদিত পুরোনো জাতের আখের বীজই ব্যবহার করছেন। ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন জাত ও উত্পাদন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও চাষিদের কাছে তা জনপ্রিয় করে তোলার মাধ্যমে আখের ফলন বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ ইক্ষু ইন্সটিটিউট সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৩ সালে ভারতীয় কৃষি বিষয়ক ইমপেরিয়াল কাউন্সিলের আওতায় ঢাকার মণিপুরি ফার্মে ইক্ষু চারা পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫১ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঈশ্বরদী ইক্ষু গবেষণা স্টেশন। ১৯৬০ সালে খাদ্য ও কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আওতাভুক্ত হলেও ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় প্রাদেশিক সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনে ন্যস্ত করা হয়। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এর নাম হয় ‘ইক্ষু গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউট অধ্যাদেশ পাস হয় এবং ইক্ষুর পাশাপাশি মিষ্টিজাতীয় ফসলের উপর গবেষণার ম্যান্ডেট প্রদান করা হয়। ২০০২ সালে বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইন্সটিটিউট অধ্যাদেশটি সংসদে সংশোধিত হয়ে অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনা বোর্ড গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানে লোকবল ৩৩৯ জন। খরচ হয় প্রতি বছর প্রায় ১১ কোটি টাকা। কিন্তু দেশে নতুন জাতের আখ চাষ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি।
