বাসা বাড়িতে চুরি বা ডাকাতি করতে গেলে ধরা পড়ার আশংকা থাকে। রয়েছে নানা ঝামেলা। কিন্তু গাড়ি চুরি করার মধ্যে ঝুঁকিকম। তাছাড়া টার্গেটকৃত গাড়ি খুব অনায়াসে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আর চুরি করা গাড়ির কাগজপত্রও তৈরি করা যায়। বিক্রি করা যায় সহজে। আর ধরা পড়লেও সাজার পরিমাণ কম। এ কারণেই গাড়ি চুরি করা। কথাগুলো বার বার গাড়ি চুরি করে ধরা পড়া চোরদলের লিডার বিল্লাল হোসেনের। চাঁদপুরের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন। তিনি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গত তিন বছরে গ্রেফতার হয়েছেন চারবার। প্রতিবারই তাকে কয়েক দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গাড়ি চুরি কেন করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন চুরির নেপথ্য কাহিনী। বিল্লাল হোসেনের দেয়া তথ্য মতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করেছ ২৫টি প্রাইভেটকার। গ্রেফতার করেছে তার ২০ সহযোগীকে। প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন পটুয়াখালি জেলার গলাচিপা থানার আলমগীর হোসেন। তিনি ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়েছেন তিনবার। আর থানা পুলিশের হাতে দুইবার। গাড়ি চুরি করেন ১৩টি।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান বলেন, গাড়ি চুরি করে ধরা পড়লে সাজা খুব কম। তারপরও এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। তাছাড়া খুব সহজেই গাড়ি চুরি করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, এসব কারণেই গাড়ি চোরদের দমানো যাচ্ছে না।
ডিবি পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাভারের একটি টেক্সটাইল কোম্পানির মাইক্রোবাস ছিনতাই হয় (ঢাকা মেট্রো-চ -১১৩৭) গত বৃহস্পতিবার মিরপুুর ১ নম্বর সেকশন থেকে। চালক কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই যুবক চালককে জোর করে নামিয়ে দেয়। এরপর মাইক্রোবাসটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই মিরপুর জোনের ডিসি ওয়ারলেসের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মাইক্রোবাসটির কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী ২০০৮ সালে রাজধানী থেকে গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটেছিল ৩২৬টি। উদ্ধার করা হয় ১৬৮টি। আসামি গ্রেফতার হয় ১৮৫ জন। ২০০৯ সালে চুরি হয় ৩১২টি। উদ্ধার হয় ২৫১টি। আসামি গ্রেফতার ৩১৮ জন। ২০১০ সালে চুরির সংখ্যা ৫৮৭টি। উদ্ধার ৩৯৪টি। গ্রেফতার ৫৩১। ২০১১ সালে গাড়ি চুরি হয় ৬৪৬টি। উদ্ধার ৪৬৬টি। ২০১২ সালে গাড়ি চুরির ঘটনা ৩৪৪টি। উদ্ধার ২৯৭টি। গ্রেফতার ২৮৬ জন। চুরি করা গাড়ির মধ্যে সর্বাধিক প্রাইভেটকার। দ্বিতীয় অবস্থানে মাইক্রোবাস, তৃতীয় সিএনজি ও ট্যািক্সক্যাব, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ডিসি ডিবি মনিরুল ইসলাম বলেন, গাড়ি চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা রাজধানীতে আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে আগে যেখানে মামলার সংখ্যা ছিল ৭০ থেকে ৮০টি। সেখানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাছাড়া দেশব্যাপী যে নেটওয়ার্ক ছিল তাদের নেটওয়ার্ক অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে। একদিকে গ্রেপ্তার করা হয়, অন্যদিকে জামিনে ছাড়া পাচ্ছে চিহ্নিত চক্রগুলো। তবে তাদের গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত আছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (উত্তর) মোখলেছুর রহমান বলেন, গত পাঁচ বছরে তিনি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করেছেন সাত শতাধিক গাড়ি। গ্রেফতার করেছেন গাড়ি চোর দলের লিডার বিল্লাল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, শফিক রহমান, সিদ্দিক, হান্নান, হাবিল, আলমগীর হোসেন, সাগর, লিংকন, রনি, বেলায়েত, ফেদু, মামুন, হেল্লাল, বাবুল হোসেন, সজীবসহ তিন শতাধিক ব্যক্তিকে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে তিনি যখন গাড়ি চোর প্রতিরোধ টিমে কাজ শুরু করেন, সে সময় রাজধানীতে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০টি গাড়ি চুরির ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তীতে চোর টিমের বেশ কিছু সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর এ সংখ্যা কিছু কমতে শুরু করে। তবে প্রতিটি অভিযানে দেখা গেছে একই চোর কয়েকবার করে গ্রেফতার হয়েছে। কারণ জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কেউ চুরির পথ থেকে সরে আসেনি। বরং কারাগারে গিয়ে গ্রেফতারকৃতরা নতুন করে দল গঠন করেছে।
এডিসি মোখলেছ আরো বলেন, অধিকাংশ চোর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, আগে গাড়ি চুরির ঘটনার সিংগভাগই ছিল রাজধানীতে। কিন্তু রাজধানীতে পুলিশের ব্যাপক অভিযানের ফলে তারা টার্গেট করে মফস্বল শহরগুলোতে।
কয়েকজন গাড়ি চোরের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চোরাইকৃত গাড়ির অন্যতম ক্রেতা মাদক ব্যবসায়ী ও কিছু অসাধু লোক। তারা চোরাই গাড়ি কমমূল্যে কিনে রিমোর্ট এলাকায় ভাড়ার কাজে লাগায়। চোরাই গাড়ি কেনাবেচা বেশি হয় চট্টগ্রাম বিভাগ ও সিলেট অঞ্চলে। চুরি হওয়া প্রাইভোটকার, মাইক্রোবাস উদ্ধারে পুলিশের ব্যাপক সাফল্য রয়েছে। তবে মোটরসাইকেল উদ্ধারের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
চালককে মেরে গাড়ি ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চালককে হত্যা করে গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে রেন্টেকারের মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে চালককে মেরে ফেলার ঘটনাই বেশি। গত চার বছরে রাজধানীতে ১২ থেকে ১৫টি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এ প্রবণতা রাজধানীতে অনেকটা কমেছে। তবে এখন যা ঘটছে তার সিংহভাগই ঘটছে মফস্বল শহরগুলোতে। এ জন্য তিনি রেন্টেকার মালিককে আরো সতর্কতার সঙ্গে মাইক্রোবাস ভাড়া দেয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, গাড়ি উদ্ধার ও চুরি-ছিনতাই রোধে আমরা চালক-মালিককে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি। এ নির্দেশনায় মোটরসাইকেলে স্টিয়ারিং লক ব্যবহার ও এলার্ম সিস্টেম, জিপিএস/জিএসএম ডিভাইস ব্যবহারের কথা বলা হয়। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হলে চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ সম্ভব।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান বলেন, তিনি গত এক বছরের ৪৪টি চোরাই গাড়ি উদ্ধার করেছেন। জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করেছেন ৩৫ জনকে। গ্রেফতারকৃতদের দেয়া বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গাড়ি যারা চুরি করে তারা খুব সহজেই জামিনে মুক্তি পায়। সাজাও কম। রাস্তায় পার্ক করা কোন গাড়ি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে (কখনও চালককে অস্ত্রের মুখে আবার খাতির জমিয়ে চালককে অচেতন করে) গাড়ি ছিনতাই বা চুরি করা যায়। আর ঐ গাড়ি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করা সহজ। ২০ লাখ টাকার গাড়ি ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়।
তিনি বলেন, গাড়ি চোরদের নেটওয়ার্ক এখন দেশব্যাপী। নিত্যনতুন কৌশল ব্যবহার করে চোরের দল চুরি বা ছিনতাই করছে। এসব সিন্ডিকেটের কেউ আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে ধড়া পড়লেও তাদের ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য মাসিক ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া রয়েছে আবার এক শ্রেণীর উকিল। ফলে জামিন নিয়ে তারা আবার ফিরে যায় পুরনো পেশায়। গাড়ির ভুয়া কাগজপত্র বানাতে রয়েছে অভিজ্ঞ দালাল চক্র। রয়েছে তাদের ভুয়া বিক্রেতাও। ফলে কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না গাড়ি চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা।
চুরির কৌশল : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, গাড়ি চুরির ক্ষেত্রে অনেক সময় চালকও জড়িত থাকে। এ জন্য তিনি গাড়ির চালক নিয়োগ দেয়ার আগে তার নাম ঠিকানা যাচাই বাছাইয়ের জন্য পরামর্শ দেন। এরপর রয়েছে অনেক চালকের টাকার লোভ। এ জন্য সুযোগ পেলে পথিমধ্যে যাত্রী ওঠায়। এ সুযোগ কাজে লাগায় রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয়া দুর্বৃত্তরা (গাড়ি চোর)। তারা অনেক সময় অস্ত্র ঠেকিয়ে অথবা নেশা জাতীয় খাবার খাইয়ে প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস ছিনতাই করে।
তিনি আরো বলেন, কখনও কখনও তারা চালককে হত্যা করে ছিনিয়ে নেয় গাড়ি। গাড়ি চুরির পর কোন কোন চক্র ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে গাড়ির মালিকের সঙ্গে। শর্ত অনুযায়ী দাবিকৃত টাকা গাড়ির মালিকের কাছে পেলে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া হয় গাড়িটি। গাড়ির মালিক যদি গাড়ি পাওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাহলে ক্ষীণ হয়ে আসে গাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনা। ডিসি মিডিয়া আরো বলেন, সবার চোখের সামনেই বিক্রি করা হচ্ছে চোরাই গাড়ি। প্রশিক্ষিত চোররা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। ইন্টারনেটের সেল বাজার, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও গাড়ির হাটের মাধ্যমে বৈধ উপায়ে বিক্রি করা হচ্ছে অবৈধ গাড়ি।
গাড়ি চুরির সিদ্ধহস্ত : গাড়ি চুরির সঙ্গে জড়িতদের সংখ্যার কোন সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া দুস্কর। এখানে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন মুখ। তবে যারা কয়েকবার করে গাড়ি চুরির সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে এরশাদ, মেহেদী হাসান ও কাজিমউদ্দিন, রনি (এরা মোটরসাইকেল চোর)। আর প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস চুরির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আলমগীর, বেলায়েত, লিটন, বিল¬াল, হাসান, আকতার, হান্নান, রনি, আকাশ, সুমন, রাসেল, আমির, শাহিন, বিশাল, আসাদুল, জুয়েল, নজরুল, মিরাজ, পারভেজ, রাজ, সিরাজ, রফিক, মোস্তাফিজুর রহমান প্রিন্স, তৌফিকুল ইসলাম ওরফে রন্টি, ফয়সাল ওরফে তন্ময়, আশিকুর রহমান, সেলিম ওরফে সালাম, জামাল উদ্দিন, আল বাহার, রাজিব মোল্লা, সবুজ, জহির নুরুন নবী, মইন উদ্দিন ওরফে মইন, মাহবুব, হাফেজ বাবুল মিয়া, চাঁদপুরের ইকবাল হোসেন, দিনাজপুরের আলমগীর হোসেন, জামালপুরের জাকিউল ইসলাম, কর্ণফুলী থানার দক্ষিণ শাহজীপুরের শুক্কুর ও শাহজাহান, আনোয়ারা গহিরা এলাকার আব্দুল আজিজ ও ফটিকছড়ির মহিউদ্দিন ।
