আলোর পথে ওদের যাত্রা

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৭
ছেলের জন্য গোলাপির মনটা উথালপাথাল করে। তাই ‘কাজ’-এর ফাঁকে ফাঁকে বার বার ছুটে আসেন ছেলের কাছে। ছেলে ‘লেখাপড়া শিখে মানুষ হচ্ছে’ দেখে চোখটা তার ছলছল করে ওঠে। মাগুরার মেয়ে গোলাপির সংসার টেকেনি। দ্বিতীয় বিয়ে করে একমাত্র ছেলেসহ তাকে বের করে দিয়েছেন স্বামী। সত্ মা থাকায় বাবার ঘরেও ঠাঁই মেলেনি। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছেন যৌনকর্মীর জীবন। গোলাপির ছেলে স্বাধীন যশোর পতিতাপল্লীর সামনে গড়ে ওঠা ‘শিশুবান্ধব কেন্দ্রে’ পড়ালেখা শিখছে। কেন্দ্রটিতে এখন ১৬ জন ছেলে-মেয়ে পড়ালেখা করছে। এরা স্থানীয় যৌনকর্মীদের সন্তান। বছরের শুরুতে এই কেন্দ্রে ২৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। মাস কয়েক আগে ঝালাইপট্টি পতিতাপল্লী ভেঙ্গে দেয়ায় অনেকেই মায়ের সাথে চলে গেছে অন্যখানে। বড় হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি মেয়েকে পাঠানো হয়েছে অন্য একটি এনজিও-র শেল্টার হোমে। যশোর শহরের দ’ুটি পতিতাপল্লীর সন্তানেরাই এখন ওই কেন্দ্রের নিয়মিত শিক্ষার্থী। সরেজমিনে দেখা গেছে, কেন্দ্রে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা গোল হয়ে বসে আছে। তাদের মধ্য থেকে একেকজন বোর্ডে যেয়ে স্বরবর্ণ পড়ছে। অন্যরাও গলা মেলাচ্ছে তার সাথে। কেউ কেউ শোনায় বাংলা ও ইংরেজি ছড়া। গান-গল্পে সময় কাটছে তাদের। এরই মধ্যে চলছে বর্ণমালা শেখা, সাধারণ জ্ঞান জানা ও পরিবেশ পরিচিতি। কেন্দ্রটির ‘ফ্যাসিলিটেটর’ দীপশিখা জানালেন, শিশুরা সবাই জানে এবং বোঝে মায়েদের ‘কাজ’ সম্পর্কে। এদেরই একজন আল আমীনের ভাষ্য এ রকম : ‘স্কুল ছুটির পর বাড়িতে যাইয়ে মার সাথে দেখা করি। মার কাছ থেকে কিছু খাইয়ে মন্দিরের মাঠে যাই খেলা করতি। মা কয় ঘোরাফেরা কর। রাতে খাতি দেব। রাত্তিরি খাইয়ে মার সাথে মেঝেতে ঘুমোই।’ স্বজনদের সম্পর্কে তার বর্ণনাটা এ রকম : ‘আমরা ৫ ভাইবোন। দুই বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। ঢাকা ব্রিজের কাছে বড় বোন-দুলাভাইয়ের বাসায় গেলি বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। বড় ভাই কলেজে পড়ে। কনে থাকে জানি না।’ আট বছরের আল আমীন এ প্রতিবেদককে বিস্মিত করে আরো বলে, ‘লেখাপড়া শিখে মা যেখানে রয়েছে, ওখান থেকে বাইর করে আনব। একটা বাড়ি বানায়ে ভাইবোন সবাই মিলে থাকব।’ দীপশিখা বলেন, ‘একবছর আগে ভর্তির সময় ওরা কিছুই জানত না। শিক্ষার কিছুই ছিল না ওদের মধ্যে। আগে বাড়ি বাড়ি যেয়ে ওদের ডেকে আনা লাগত। এখন ‘আপা এসেছে’ বলে দৌড়ে আসে। শুরুতে ওদের দুষ্টুমি ছিল ভয়ঙ্কর। এখন ওরা অনেক ভালো।’ তিনি জানান, সপ্তাহে ৫ দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ওরা এখানে থাকে। এখানে থাকার সময় খিস্তি করে না। কিন্তু ভিতরে গেলে যা তাই হয়ে যায়। আমরা চাই ওরা বাইরের জগত্ চিনুক। সাধারণ শিশুদের সাথে মিশে ভালো আচরণ করুক। কেন্দ্রের রাবেয়া বেগম রানী বলেন, ‘আমি এখানে শুধু চাকরি করি না, সন্তানের মতো করে ওদের দেখি। লেখাপড়া করে ওদের জীবন পাল্টে যাবে। সমাজে ওরা আর পাঁচজনের মতো চলতে ফিরতে পারবে। আমার সব স্বপ্ন ওদের নিয়েই।’ তিনি জানান, কেন্দ্রে শিশুদের ২৪ ঘণ্টা রাখার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডভিশনের চাইল্ড সেফটি নেট প্রকল্পের এ কর্মসূচির স্বপ্ন হলো ‘আমাদের শিশুরা অন্যান্য শিশুদের মতো সুরক্ষিত সুশিক্ষিত পরিবেশে এবং সমাজে স্বীকৃতি পাক’। কেন্দ্রের সুপারভাইজার শশীভূষণ হালদার জানান, এখানে শিশুদের সকালে ও দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। বড় হয়ে যারা অন্য প্রতিষ্ঠানের শেল্টার হোমে যায়, তাদের সম্পূর্ণ খরচও ওয়ার্ল্ডভিশন বহন করে।