সরকারের নীতির ভুলের কারণেই এখন বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। আর এ কারণেই এ খাতে ভর্তুকি দিয়ে যেতে হবে। কর কমিয়ে জ্বালানির দাম কিছুটা কম রাখা সম্ভব। আর প্রাথমিক জ্বালানি সহজ ও নিশ্চিত না করা পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতায় রাখা যাবে না। শিল্পক্ষেত্রে দাম বাড়াতে গেলে অবশ্যই তা অনেক আগে থেকে জানিয়ে বা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। সরকার স্থায়ী বড় বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে যার কারণে আজ বিদ্যুতের দাম বেশি। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আয়োজিত এক গণশুনানির অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল শনিবার ‘বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান এবং বিদ্যুতের মূল্য পরিস্থিতি: আগামীর পথনির্দেশনা’ শীর্ষক এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে গণশুনানিতে বিদ্যুত্ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক, সংসদ সদস্য এইচ এম আশিকুর রহমান ও মোহাম্মদ ইশরাফিল আলমসহ অন্যরা অংশ নেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম তামিম বলেন, যে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে তা উচ্চমূল্যের। তাই এমন প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে যাতে উত্পাদন খরচ কমে। সেক্ষেত্রে আমাদের কয়লা উন্নয়ন জরুরি। কয়লা আমদানিও করা যেতে পারে। যে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় তার ৫০ শতাংশই সরকারি কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে এতে যে ভর্তুকি দেয়া হয় তার ৫০ শতাংশ সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে। এক্ষেত্রে ভর্তুকি না দিয়ে কর কমিয়ে দেয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, বিদ্যুত্ উত্পাদনে সরকারের নীতি ব্যর্থ হওয়ার কারণে এখন ভর্তুকি দিয়ে যেতে হবে। সম্পূর্ণ ভর্তুকি তুলে নেয়া উচিত হবে না। কৃষককে সরাসরি ভর্তুকি দেয়ার বিষয়ে ভাবতে হবে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, সরকারের মধ্যে স্থানীয় কয়লা ব্যবহারে কোন সমস্যা আছে। সেজন্য তারা এ কাজ করছে না। স্থানীয় কয়লা ব্যবহার করা গেলে সমস্যার অনেক সমাধান সম্ভব। অধ্যাপক ড. ইজাজ আহমদ বলেন, সামগ্রিক পরিকল্পনা বা পর্যালোচনা নেই। জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুতে উত্পাদন করার চেয়ে পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচ বেশি। এলএনজি, কয়লা বা পারমাণবিক কোনটাতে খরচ কম বা বেশি তা নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ইচ্ছামতো বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প চলবে কি করে? শিল্পের জন্য বিদ্যুতের দাম স্থির রাখতে হবে। দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হলে কয়েক বছর আগে থেকে বলতে হবে। না হলে একজন বিনিয়োগ করে সে আর শিল্প চালাতে পারবে না।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভুঁইয়া বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, সর্বোপরি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। একপক্ষ বলছে, কুইক রেন্টাল কোন সমাধান নয়। এগুলো আমাদের অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। অন্যপক্ষ বলছে, এর বিকল্প ছিল না। জ্বালানি বহুমুখীকরণ জরুরি হয়ে পড়েছিল। একবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই বিকল্প শক্তি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়াতে বিদ্যুত্খাত এই সংকটের মুখে পড়েছে। তাই সরকার বাধ্য হয়ে কুইক রেন্টাল স্থাপন করেছিল। ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকার বিদ্যুত্ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যে ক্ষতি করেছে তার খেসারত ভোটে দিতে হবে। বিজিএমইএ-র প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের যে সিস্টেম লস তা একটা শুভংকরের ফাঁকি।
আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ইমদাদুল হক, বিইআরসি সদস্য সেলিম মাহমুদ, বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলাম, পিডিবি ও আরইবি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈনউদ্দিন, ডিপিডিসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম, ডিসিসি-র পরিচালক হুমায়ুন রশীদ, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার্স অব কমার্সের প্রতিনিধি এএইচএম আবুল কাশেম, এমসিসি প্রতিনিধি এমএ রহিম খান, বিদ্যুতের সাধারণ ভোক্তা শাহাবুদ্দীন বক্তৃতা করেন। গণশুনানি অনুষ্ঠানের শুরুতে দেশের বর্তমান বিদু্যুত্ পরিস্থিতি নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিডিবি-র পরিচালক মিজানুর রহমান।
