মালয়েশিয়া যেতে নিবন্ধনে পদে পদে বিড়ম্বনা

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৩০
সরকারি ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য অনলাইনে নাম নিবন্ধন করতে গিয়ে লোকজন পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গ্রামের নিরীহ মানুষেরা না বুঝে দালালদের খপ্পরে পড়ছেন। এছাড়া নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি আদায়, ইন্টারনেটে ধীরগতি, কম্পিউটার স্বল্পতা, বিদ্যুত্ বিভ্রাট, ইউনিয়ন কোড বিলম্বে পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেকেই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করে দালাল চক্র থেকে সাবধান থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। সরকার বলছে, এই কার্যক্রমে দালালি করার কোন সুযোগ নেই। সকলকে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে নাম নিবন্ধন করে লটারির মাধ্যমে টিকতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে মাত্র ৫০ টাকা। যারা লটারিতে টিকবেন তারা স্বাভাবিকভাবেই যেতে পারবেন। কিন্তু অনেক জায়গাতেই ৫০ টাকার বেশি ফি নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন নিবন্ধন ইচ্ছুকেরা। সম্প্রতি সারাদেশ থেকে পর্যায়ক্রমে ৩০ হাজার কর্মী বাছাই করে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। এ জন্য অনলাইনে নাম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়। ইতিমধ্যে বরিশাল বিভাগে এই কার্যক্রম শেষ হয়েছে। যারা লটারি জয়ী হয়েছেন তারা এখন অল্প টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। বর্তমানে রাজশাহীতে এই কার্যক্রম চলছে। আজ শনিবার থেকে শুরু হবে চট্টগ্রাম বিভাগে। রাজশাহীতে বেশি ফি আদায়ের অভিযোগ রাজশাহী অফিস থেকে আনিসুজ্জামান জানান, গত বুধবার প্রথমদিন রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে ৩৩ হাজার ৮২ জনের নিবন্ধন শেষ হয়েছে। শুক্রবার বিকাল ৫টায় এই কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা। গত বৃহস্পতিবার নিবন্ধনের জন্য তথ্য সেবাকেন্দ্রগুলোতে গিয়ে প্রার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে দ্বিতীয়দিন নিবন্ধনের কাজ চলছিল ধীরগতিতে। এনিয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। স্থানীয় মাড়িয়া ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রের বাইরে নান্দোপাড়া গ্রামের সুমন, মাড়িয়ার রহমত, চেবাড়িয়ার আবুল কালাম বলেন, প্রথমদিনে সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিবন্ধন করতে পারিনি। তাই বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজ শেষ করেই লাইনে দাঁড়িয়েছি। জয়নগর ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, বুধবার জেলা থেকে বিকাল ৩টায় পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। এ জন্য তথ্য সেবাকেন্দ্রে নিবন্ধন করতে আসা সকল প্রার্থী নিবন্ধিত হতে পারেনি। নওপাড়া ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তা অদক্ষ হওয়ায় ফরম পূরণ ও ইন্টারনেট ব্রাউজিং করতে অনেক সময় লাগছে। একটি ফরম নিয়ে ব্রাউজিং করতে সময় লাগছে ৩০ মিনিটেরও বেশি। নওপাড়া ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আলিয়াবাদ গ্রামের নাজমুল হোসেন বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিবন্ধন করতে পারেননি। এ ব্যাপারে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, নিবন্ধনের প্রথমদিন প্রায় সকল তথ্য সেবাকেন্দ্রে নিবন্ধনে সমস্যা হয়েছে। তবে দ্বিতীয়দিন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। এদিকে জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো যুবকদের অভিযোগ, নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ৫০ টাকার অতিরিক্ত আরো ৩০ টাকা নেয়া হচ্ছে নমুনা ফরমের নামে। একই অভিযোগ পাওয়া গেছে সরঞ্জাই ও চাঁন্দুড়িয়া ইউনিয়নে। তবে এসব স্থানে একশ’ থেকে ১৫০ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবন্ধনকারীদের অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী জিয়াউল বাসেত স্বীকার করেন, নিবন্ধন চলার সময় বিদ্যুত্ বিভ্রাট ও ইন্টারনেটের নেটওয়ার্ক সমস্যায় নিবন্ধন দেরি হচ্ছে। কলমা ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে বিদ্যুত্ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার নিরসন না হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে আগ্রহীদের নিবন্ধন করা হচ্ছে। চারঘাট উপজেলায় ইন্টারনেটের গতি কম থাকায় নিবন্ধনে ভোগান্তি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি। সমস্যায় পড়েছে ইউসুফপুর ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিন বলেন, গত দুইদিনে প্রায় সহস্রাধিক ফরম বিতরণ করা হয়েছে। প্রথমদিন নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় মাত্র ২০টি নিবন্ধন হয়েছে। সরকারি মডেমে নিবন্ধনের কাজ করা যায়নি। পরে ব্যক্তিগত অন্য অপারেটরের মডেম ভাড়া করে এনে ২০টি নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয়দিন নিবন্ধনের গতি বেড়েছে। দালাল থেকে সাবধান - চট্টগ্রামে মাইকিং চট্টগ্রাম অফিস থেকে সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ জানান,আজ শনিবার চট্টগ্রামে ১৪টি উপজেলার ১৯৫টি ইউনিয়নে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুরু হচ্ছে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন। এ নিয়ে দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী অথবা প্রতারকের খপ্পরে যাতে কেউ না পড়ে সে জন্য বৃহস্পতিবার থেকে চট্টগ্রামের উপজেলা, ইউনিয়নসহ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শুরু করা হয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রচারণা এবং মাইকিং। এ প্রচারণায় সকলকে বলা হচ্ছে, এ রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইন্টারনেট ও অনলাইন সেবা দানকারীদেরকে কেউ যেনো মাথাপিছু ৫০ টাকার বেশি না দেন। দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়া রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ করার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ খুলেছেন। সেখানে সার্বক্ষণিক যে কোনো তথ্য দেয়া নেয়ার জন্য তিনজন এসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সহকারী পরিচালক জহিরুল ইসলাম মজুমদার ইত্তেফাক-কে জানান, চট্টগ্রামে আগামী ২১ জানুয়ারি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শেষ হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাচিত সকল ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের নাম রেজিস্ট্রেশন করা হবে। ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে ফরম সংগ্রহ করা যাবে। ২২ তারিখ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত লটারির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত কর্মীদের নাম। অনলাইনের মাধ্যমেও স্ব-স্ব এলাকা থেকে জানা যাবে। যাতে কেউ অবৈধ কার্যক্রম চালাতে না পারে সে জন্য প্রশাসনিক নজরদারি রাখা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক বিচার করে দোষীকে শাস্তি দেয়া হবে। চট্টগ্রামের এই কার্যক্রমে কারো কোন অভিযোগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণকক্ষে জানাতে বলা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বর, ০৩১-৭২০৮৮১,৭২১৬৩৯, ০১৮১৪-৭০৪৪২৬, ০১৭২৩-৬৫৩৭৪৬, ০১৭১৫-৭০১২৯১ । স্বপ্নপূরণের অপেক্ষায় লটারি বিজয়ীরা বরিশাল অফিস থেকে লিটন বাশার জানান, নগর সংলগ্ন চরমোনাই ইউনিয়নের ডিঙ্গামানিক গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান সাইফুল ইসলাম। মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিদেশ যাওয়ার জন্য স্থানীয় তথ্য কেন্দ্রে গিয়ে নাম নিবন্ধন করেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে তার মোবাইল স্র্কিনে ভেসে উঠে লটারিতে বিজয়ী হওয়ার সুসংবাদ। সাইফুলের মতই রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের দরিদ্র কৃষক মো. আব্দুল সালাম হাওলাদার লটারি বিজয়ী হয়ে খুশিতে আত্মহারা। একই রকমের খুশি আগৈলঝাড়ার রিপন বাড়ৈ, নিখিল বাড়ৈ, ওপেন সাহা ও দীপংকর হালদারসহ অনেকেই। তারা জানান, তাদের পক্ষে ৩/৪ লাখ টাকা একত্রে জোগাড় করে কখনোই বিদেশ যাওয়া সম্ভব ছিল না। এবার হয়তো তাদের আশা পূরণ হবে। বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সৈয়দ ইছহাক মো. আবুল খায়ের জানান, তার ইউনিয়নের ২৩ জন লটারিতে বিজয়ী হয়েছে। জানা গেছে, বরিশালের ১০ উপজেলার ১৮ হাজার ৫৪০ জন নিবন্ধনকারীর মধ্যে মধ্যে ৬১১ জন লটারি বিজয়ী হয়েছেন। বুধবার বিকেলে জেলা প্রশাসক শহিদুল আলম এ ফলাফল ঘোষণার পর তা বিজয়ীদের মোবাইল ফোন নম্বরে এসএমএস করে জানিয়ে দেয়া হয়। জেলা প্রশাসক জানান, মাত্র ৪০ হাজার টাকায় সরকারি ভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ উত্ফুল্ল। লটারি বিজয়ীরা এখন অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন।