শিশুর স্কুলে অনীহা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫২
কোনোকালেই শিক্ষা যে শিশুর কাছে খুব আদরণীয় ছিল, এমন তথ্য বিরল। তবে কালে কালে এই প্রবণতার মাত্রা ও প্রভাব ছিল আলাদারকম। একটা সময় ছিল যখন শিশুর এই স্বাধীনচেতা মনকে গুরুজনেরা খানিকটা প্রশ্রয় দিতেন। কেননা, মানুষের জীবন-যাপন ও জীবনধারণ ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ। কেবল প্রতিষ্ঠাননির্ভর জীবিকা তাদের লক্ষ্য ছিল না। বরং পরস্পরের উপরই নির্ভর করতো জীবিকার পথ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রায় সিংহভাগ ক্ষেত্রেই জীবিকার পথটি হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠাননির্ভর। বাবা-মায়েরা যথাসম্ভব চেষ্টা করেন শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। কিন্তু, শিশুরা বিদ্যালয়ের প্রতিযেগিতামূলক শিক্ষাকে অনেক ক্ষেত্রেই নিতে পারছে না আনন্দের সাথে। আগ্রহ এবং অনীহা শিশুর কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক জগত্ বিদ্যালয়। নতুনের প্রতি দুই বিপরীত অনুভূতির সম্ভাবনা থাকে তার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু খুব উত্সাহের সাথে বিদ্যালয়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়। বাবা-মাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে তার নতুন জগত্ সম্পর্কিত জল্পনা-কল্পনা নিয়ে। নতুন পোশাক, নতুন বই-খাতা, পেন্সিল, ব্যাগ— সর্বোপরি, নতুন এক পৃথিবীর দিকে সে হাত বাড়ায় প্রবল উত্সাহে। খেলার সঙ্গীদের বা সমবয়সী শিশুদের সহপাঠী হিসেবে পাবে অর্থাত্ দীর্ঘক্ষণ তাদের সঙ্গ পাবে এও শিশুর কাছে এক অন্যরকম উত্সাহ। প্রাথমিক এই অবস্থায় শিশু আসলে বিদ্যালয়কে যতটা না শিক্ষা গ্রহণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা করে নতুন খেলাঘররূপে পাবার। তবে এ হল শিশুদের একরকমের দৃষ্টিভঙ্গি। এর ভিন্ন চেহারাও রয়েছে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্কুল শব্দটা তাদের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই বিষয়টি একেবারে আনকোরা শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে, যারা ইতোমধ্যেই স্কুলের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে অথবা বাড়িতে যাদের লেখাপড়ার চর্চার উপর জোরারোপ করা হয়। এক্ষেত্রে কখনো কখনো শিশু তার শরীর ও মনের বিরুদ্ধেও কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে শিশু তার প্রকৃতি প্রদত্ত সরলতার সাপেক্ষে এক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যা তাকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি বিমুখ করে তোলে। কেন এই অনীহা আজকের দিনে লেখাপড়া বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় তার কারণ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরেই প্রোথিত রয়েছে। আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিটাই দিনে দিনে এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, একজন শিশু আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করতে পারছে না। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রথমদিন থেকেই তার মধ্যে এই বীজ উপ্ত হয়ে উঠছে যে, তার সামনে অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আর এদের সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ক্রমাগত তাকে জয়ী হতে হবে। ফলে জ্ঞানার্জন যে মননের উত্কর্ষ এবং দক্ষতা অর্জনের একটি মাধ্যম, সেটি কখনো একটি শিশু মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না, অনেকটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মতোই পালন করে যাচ্ছে নির্দেশাবলী। কিন্তু শিশুর সরল মনের সামনে এই যান্ত্রিকতা ক্রমশই বিরূপ চেহারা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। বহির্জগত্ এবং অন্তর্জগতের এই দ্বন্দ্বই শিশুকে করে তুলছে বিরুদ্ধাচারী। ক র ণী য় ++যেহেতু বাবা-মায়ের হাত ধরেই শিশুর পথচলা, তাই তাদের উচিত্ শিশুর মানসিকতাকে বিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচকভাবে তৈরি করা। ++লেখাপড়াকে শিশুর জন্য যথাসম্ভব আনন্দময় করে তোলা। ++শিক্ষার কারিগরি দিকের সাথে শিশুকে পরিচিত করা যাতে সে বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়াতে পারে। ++মনের বিরুদ্ধে শিশুর উপর অধিক চাপ না প্রয়োগ করা। ++মাঝে মাঝেই খেলাচ্ছলে পড়াশোনাকে আকর্ষণীয়ভাবে তার সামনে উপস্থাপন করা।