ভি ন দে শি প্র জ ন্ম

ইভের সাথে জাগবে সারা বিশ্ব

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৭
প্রথমবারের মতো বিশ্বের ১৮৪টি দেশে নারী নির্যাতনের জন্য একযোগে হাত তুলে সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন টনি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী নাট্যকার, শিল্পী, সমাজকর্মী ইভ এন্সলার। ইভ ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ বা ‘উদ্যম উত্তরণে শত কোটি’ স্লোগান নিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্যাম্পেইনে নেমেছেন। তিনি সকল নারী-পুরুষকে ১৪ ফেব্রুয়ারি নারী নির্যাতন বন্ধে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রচারণার অংশ হিসেবে সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ সফরে আসেন। প্রজন্মের সাথে কথোপকথনে তিনি জানিয়েছেন তার স্বপ্ন ও উদ্যোগের গল্প। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু নতুন বছরটা নতুন কোনো সাফল্য, নতুন কোনো আনন্দ কিংবা কোনো অর্জন নিয়ে অথবা অতি সাধারণভাবে শুরু হতে পারতো। আমরাও সাধারণভাবে আবার এক কর্মময় বঞ্চনাময় অবহেলা আর অল্প অল্প স্বীকৃতি নিয়ে এগিয়ে যেতাম সময়ের পরিক্রমায়। কিন্তু তা না হয়ে হলো নারীসমাজের জন্য জঘন্য এক বর্বরতা নিয়ে। এ নিয়ে সচেতনতার ডাক এসেছে বিশ্বময়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আজ সমগ্র বিশ্ব এক হয়েছে ‘ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং’ বা ‘উদ্যমে উত্তরণে শত কোটি’ শীর্ষক একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও এতে শামিল হয়েছে। নারী নির্যাতন রোধকল্পে তারা কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিখ্যাত নাট্যকার-লেখক ইভ এন্সলার এই উদ্যোগ সূচনা করেন ১৫ বছর আগে। ইভ এন্সলার বলেন, দবিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৬০০ কোটি, যার অর্ধেক নারী, যাদের মধ্যে ১০০ কোটি নির্যাতিত। প্রতি তিনজন নারীর একজন নির্যাতিত হচ্ছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়। নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ করে সেই দিন বিভিন্ন স্থানে তারকা, নারীকর্মী, লেখক গবেষক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। বাংলাদেশেও পালিত হবে অনুরূপ কর্মসূচি। বাংলাদেশ চেষ্টা করছে সমাজের সবক্ষেত্রে এই ম্যসেজটা পৌঁছে দিতে। মেয়েদের নানা আড়ষ্ঠতা নিয়ে ইভ এন্সলার একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। যা মেয়েদের অনেক সংকোচ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। ইভ এন্সলার বলেন, ২০০-এর অধিক নারীর সাক্ষাত্কারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে নাটক ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’। নারীর যৌনতা ও শক্তিকে এই নাটকে সম্মাননা জানানো হয়েছে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে, অত্যন্ত সাবলীলভাবে। নারীর আত্মবিশ্লেষণ এবং তার শারীরিক স্বকীয়তা নিয়ে অকপট স্বাগত সংলাপ ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’। এন্সলারের সাম্প্রতিকতম রচনা ‘আই অ্যাম অ্যান ইমোশনাল ক্রিয়েচার :দ্য সিক্রেট লাইফ অব গার্লস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’। প্রকাশের পর পরই এটি নিউইয়র্ক টাইমস-এর বেস্ট সেলার তালিকায় জায়গা করে নেয়। ইভ প্রজন্মকে বলেন, যেখানে নারী নির্যাতিত হবে সেখানে মানবাধিকার টিকে থাকতে পারে না। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং এই বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই তার এই আন্দোলন। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে এই আয়োজনে কোনো প্রভাব পড়বে না জানিয়ে তিনি বলেন, ভালোবাসার সম্পর্ক স্বর্গীয়, একে কলঙ্কিত করার পক্ষে আমি নই। ‘উদ্যমে উত্তরণে শত কোটি’ স্লোগান সামনে নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তায় বাংলাদেশেও ওবিআর-এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আসছে ১৪ ফেব্রুয়ারি অন্তত ১৫ মিনিটের জন্য আঙ্গুল তুলে নির্যাতন বন্ধের পক্ষে দাঁড়ান। শৈশবকাল থেকে নারীবাদী তিনি, যখনই তিনি তার অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে অনড় অবস্থান নিয়েছেন তখন থেকেই তিনি নারীবাদী। প্রায় সব মেয়েই কখনও না কখনও রুখে দাঁড়িয়েছে তার অধিকার ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে। কলেজ জীবনে তিনি একটি নারীবাদী গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেন। তারপর থেকে ধীরে ধীরে তিনি নারীবাদী আন্দোলনের জন্য সাহিত্য রচনা শুরু করেন এবং নারীবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ইভ এই প্রজন্মকে সাথে নিয়ে সমাজের যেসব নীতি বৈষম্যমূলক তা ভাঙতে চান। তিনি চান নারী-পুরুষে সমতা এবং এ সমতা চাওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু আছে বলে তিনি মনে করেন না। খুশির বিষয়, নারীরা এখন তাদের ক্ষমতা চাইছে। তিনি মনে করেন না, এই একটি উদ্যোগই যথেষ্ট, এক রাতের মধ্যে নারীর প্রতি সব সহিংস আচরণ নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু, তবু নারীদের কথা শুরুটা তো অন্তত করতে হবে। কথা শুরু করলে এই ঘুমন্ত সমাজ কখনও না কখনও নিশ্চয়ই জেগে উঠবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ পৃথিবী সম্ভব। এমন একটা পৃথিবীতো আমরা সবাই চাই, যেখানে রাস্তা ধরে আমি হেঁটে যাব কিন্তু আমার কোনো ভয় লাগবে না। খুশিতে আমার মন ভরে থাকবে। আমাদের শুধু দরকার স্বপ্নের। স্বপ্ন পূরণে পদক্ষেপের। স্বপ্ন, তা পূরণে পদক্ষেপ গ্রহণ এ দুটো কাজ আমরা করতে পারলেই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গঠন অবশ্যই সম্ভব।’ ইভ এন্সলার বাংলাদেশ সফররত সময়ে আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানালেন আমাদের। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মানুষ নারী নির্যাতনসহ সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশ ওবিআর-এ জেগে উঠবে। সমতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ক ন জ রে ইভ এন্সালের ১৯৫৩ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মা ছিলেন ভিন্ন ধর্মের অনুসারী। শৈশবেই পৃথিবীর বৈরিতার সাথে পরিচিত হয়ে যান তিনি। মিডলবারী কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। রিচার্ড ম্যাকডারমটের সাথে ১৯৭৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দশ বছর পরেই বিচ্ছেদ হয় তাদের। তারপর থেকে নিজেই বিশ্বে নারীজাগরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে ‘দ্য ভ্যাজাইনা মনোলগ’ বিখ্যাত নাটকের জন্য তিনি অনেক পরিচিতি পান। ১৪০টিরও বেশি দেশে ৪৮টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার এই নাটক। এই লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা ও নারী আন্দোলন নেত্রী ২০১১ সালে টনি অ্যাওয়ার্ড পান। পু র স্কা র ও স ম্মা ন না ++ চিত্রনাট্যে ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৯ ++ চিত্রনাট্যে বেরিলা কের অ্যাওয়ার্ড ২০০০ ++ একক অভিনয়ে এলিয়ট নরটন অ্যাওয়ার্ড ২০০১ ++ নেতৃত্বে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া স্পটলাইট অ্যাওয়ার্ড ২০০২ ++ দ্য ম্যাট্রিক্স অ্যাওয়ার্ড ২০০২ ++ যুক্তরাষ্ট্র আর্ট ফেস্টিভ্যালে জুরি অ্যাওয়ার্ড ২০০২ ++ ফ্রিডম অব এক্সপ্রেসন অ্যাওয়ার্ড ২০০২ ++ সন্মাননাসূচক ডক্টর অব লেটার ডিগ্রি, ২০০২ ++ বস্টন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ড ২০০৪ ++ অ্যাওয়ার্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এফোর্টস ২০০৪ ++ দ্য এভোন অ্যাওয়ার্ড ২০০৫ ++ দ্য সান্দ্রা ডে ও’কনর অ্যাওয়ার্ড ২০০৫ ++ সম্মাননাসূচক ডক্টর অব কমিউনিকেশন, সিমন্স কলেজ, ২০০৬ ++ মানবাধিকার পদক ২০০৬ ++ ইসাবেল স্টিভেনসন অ্যাওয়ার্ড ২০১১ ++ টনি অ্যাওয়ার্ড ২০১১ এ ই উ দ্যো গ নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন বন্ধে ‘রুখো, নাচ, ওঠো’ এবং ‘জেগে ওঠো, প্রতিবাদ করো, সংগঠিত হও’—এমন স্লোগান দিয়ে ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন দিবস পালিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ওই দিন ভি-ডে দিবসটির ১৫ বছরপূর্তি হবে। এই ক্যাম্পেইনে ব্যবহূত শত কোটি শব্দটি বিশ্বজুড়ে একই সংখ্যক নির্যাতিত নারীকে বোঝাতে ব্যবহূত হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশ ভি-ডের পনেরতম বার্ষিকী পালনের অংশ হিসেবে নানা ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। উল্লেখ্য, ভি-ডে একটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলন, যে আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপ নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে। এই নির্যাতন বন্ধ হবে এ রকম প্রত্যাশা নিয়ে নির্যাতিত নারী ও মেয়ে শিশুর নির্যাতন বন্ধে বিশ্বব্যাপী পচারণার সাথে সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশে ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি প্রথিতযশা মার্কিন নারীবাদী নাট্যকার ও অভিনেত্রী ইভ এন্সলার ও তার সংগঠন ভি-ডের একটি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিশ্বব্যাপী আওয়াজ তুলবে ‘অনেক হয়েছে। আর নয় এই সহিংসতা। বন্ধ কর এখনই।’