রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ হাল

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৮
রাজধানীতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় এক করুণ পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে পড়িতে যাইতেছে কেবলই নিম্নবিত্তের সন্তানেরা। মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের সন্তানেরা পড়িতেছে বেসরকারি বিদ্যালয় এবং কিন্ডার গার্টেনগুলিতে। অন্যদিকে রাজধানীর ২৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত ১৫টির সরকারি জমি এখন বেদখলে। বিপুল অর্থের সরকারি এই জমিতে ভবন, দোকান কিংবা বস্তি তুলিয়া ভাড়া দেয়া হইতেছে। বিবাহ কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে স্কুলপ্রাঙ্গণ ও ভবন ভাড়া দেওয়া হইতেছে। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রায়ই আমরা গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলির জরাজীর্ণ দশার খবর পাইয়া থাকি। কিন্তু রাজধানীর বুকেও প্রাথমিক শিক্ষার পরিস্থিতি যে সুবিধার নহে, সেই খবরও রাখা দরকার। সংবাদপত্র প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই চিত্র হতাশাজনক ও আপত্তিকর। প্রাথমিক শিক্ষা সকল পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই পর্যায়েই শিক্ষার প্রাথমিক বুনিয়াদ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। অভিভাবকরা তাই তাহাদের শিশুদের উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পাঠাইতে চাহেন। এই জায়গায় সরকারি বিদ্যালয়গুলি পিছাইয়া পড়িয়াছে। পৃথিবীর নানান দেশে সরকারি বিদ্যালয়গুলিই মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতীক, পাশাপাশি শিক্ষার খরচও কম, ফলে অভিভাবকদের প্রথম পছন্দের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে চিত্র উল্টা। বাংলাদেশেও কলেজ পর্যায়ে নামী প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারিই। আবার ঢাকার বাহিরে সরকারি জেলা স্কুলগুলিই সবচাইতে নামকরা। কিন্তু দুয়েকটি বাদে ঢাকায় সার্বিকভাবে বেসরকারি স্কুলগুলির তুলনায় সরকারি স্কুলগুলি অনেক পিছাইয়া গিয়াছে। অথচ সরকারি বিদ্যালয়গুলির যথেষ্ট বড় ভবন রহিয়াছে, রহিয়াছে খেলার মাঠ বা অন্তত খোলামেলা কিছু পরিবেশ। শিক্ষকেরাও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অথচ অভিভাবকেরা ছুটিতেছেন ‘নামকরা’ বেসরকারি বিদ্যালয়গুলিতে। জানা গিয়াছে, সরকারি স্কুলগুলিতে কেবলই বোর্ডের বই পড়ানো হইয়া থাকে। আর বেসরকারি স্কুলগুলিতে ইংরেজির উপর গুরুত্ব দিয়া অতিরিক্ত সহজ পাঠও পড়ানো হইয়া থাকে। বিপুল প্রতিযোগিতার কথা মাথায় রাখিয়া অভিভাবকেরা সন্তানদিগকে তাই বেসরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তি করাইতেছেন। বত্সরের শুরুতে তাহারা ইহা করাইতেছেন প্রায় যুদ্ধ করিয়া, যাহাকে ‘ভর্তিযুদ্ধ’ অভিধা দেওয়া হইয়াছে। সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি বিদ্যালয় সমৃদ্ধ হইয়া উঠে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা পরিত্যাগ করিবার কারণে এক অসম শিক্ষাব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছে। যাহাদের অর্থ নাই তাহারা পড়িবে সরকারি বিদ্যালয়ে আর যাহাদের অর্থ রহিয়াছে তাহারা পড়িবে ‘উন্নত’ ও ‘যুগোপযোগী’ বেসরকারি বিদ্যালয়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ভাবিতে হইবে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে অভিভাবকদের নিকট আকর্ষণীয় করা যায়। আর অবেহলার কারণে বিদ্যালয়গুলি যে দখল-বেদখলের শিকার হইয়াছে, তাহারও সুরাহা করিতে হইবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ন্যায় সরকারি খাতগুলি যদি বেসরকারি খাতের কাছে পরাস্ত হয়, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে সরকারি সেবা অদক্ষ হইয়া পড়িয়াছে আর জনসেবার এই খাতগুলির চরম বাণিজ্যিকীকরণ ঘটিয়াছে। ইহার অর্থ হইলো বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ঠিকমতো পাইতেছে না এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ইহাতে বাধাগ্রস্ত হইতেছে।