দেশে আজও প্রতিষ্ঠা পায়নি সংবিধানের নির্দেশিত স্থানীয় সরকার। ২১ বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দেশের বিদ্যমান স্থানীয় সরকারের সকল সংস্থাসমূহকে ‘অনির্বাচিত’ ব্যক্তিদের পরিবর্তে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। আপিল বিভাগের এই নির্দেশনা কার্যকর করেনি সরকার। উল্টো ওই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্থানীয় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও সারা দেশের জেলা পরিষদসমূহ এখন পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসক দিয়ে। নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা উপজেলা পরিষদ পরিচালিত হলেও এখন পর্যন্ত তাদের কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বিধিমালা না থাকায় ২০টির বেশি উপজেলায় চেয়ারম্যানের শূন্য পদে নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের রূপ সম্পর্কে বলা আছে। ৫৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ (২) উপ-দফায় বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধান ও অন্য কোন আইন সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যে রূপ নির্দিষ্ট করিবেন, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় উল্লেখিত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক একাংশের মধ্যে সেই রূপ দায়িত্ব পালন করিবেন এবং অনুরূপ আইনে নিম্নলিখিত বিষয় সংক্রান্ত দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিবেঃ (ক) প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য; (খ) জনশৃঙ্খলা রক্ষা; (গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।’ ৬০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে পূর্ণ কার্যকরতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা উক্ত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।’
সংবিধানের এই নির্দেশনা এখনো পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। কয় স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হবে তা নিয়েও দেশে কোন ঐক্যমত নেই। একেক সরকার একেকভাবে স্থানীয় সরকারকে সাজাচ্ছে। এরশাদ উপজেলা পদ্ধতি চালু করলেও বিএনপি এসে তা বাতিল করে দেয়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দশ বছর (সাংবিধানিকভাবে তিন মেয়াদ) ক্ষমতায় থাকলেও স্থানীয় সরকার স্তর কয়টি হবে তা নির্ধারণ করে যেতে পারেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের গত শাসনামলেও (১৯৯৬-২০০১) উপজেলা পদ্ধতি চালু হয়নি। ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করলেও নির্বাচন দেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৮ সালে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন করার উদ্যোগ নেয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর বাধার কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। তবে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু চার বছরেও উপজেলা পরিষদ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। বিধিমালা না থাকায় আজ পর্যন্ত ৪৮৭টি উপজেলার সংরক্ষিত সাধারণ কাউন্সিলর এবং চেয়ারম্যানের ২০টির বেশি ও ভাইস চেয়ারম্যান বেশ কয়েকটি শূন্য পদের নির্বাচন দেয়া সম্ভব হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ও কার্যাবলী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে পড়ে রয়েছে।
দেশ স্বাধীনের ৪২ বছরেও কোন সরকার জেলা পরিষদের নির্বাচন দেয়নি। বর্তমান সরকার আপিল বিভাগের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এক বছর ধরে ‘অনির্বাচিত’ ব্যক্তিরা জেলা পরিষদকে শাসন করছে। একই অবস্থা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। প্রায় দুই বছর ধরে ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন চালানো হচ্ছে প্রশাসক দিয়ে। এ নিয়ে দুই দফা প্রশাসক পরিবর্তন হলেও নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ৬ বছর (কার্যত ১১ বছর) ধরে নির্বাচন ছাড়াই চলছে বর্তমানে বিভক্ত সিটি করপোরেশন। প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাদেক হোসেন খোকা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র নির্বাচিত হন। ফলে ঢাকার মানুষ ১১ বছর ধরে ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
আজ থেকে ২১ বছর আগে ১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আপিল বিভাগের ৫ বিচারক (যাদের সকলেই প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন) বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি মোস্তফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমান রায় দিয়েছিলেন যে, দেশের বিদ্যমান স্থানীয় সরকারের সকল সংস্থাসমূহকে ‘অনির্বাচিত’ ব্যক্তিদের পরিবর্তে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে গঠন করতে হবে। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ রায় দেন এভাবে:The existing local bodies are, therefore, required to be brought in line with Article 59 by replacing the non elected persons..... Necessary action in this respect should be taken as soon as possible- in any case within a period not exceeding six months from date .
১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম রাষ্ট্র মামলায় তত্কালীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চের ১৪ পৃষ্ঠার রায়ে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশনা দেয়া হয় যে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের সাধনকল্পে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি সংস্থা অনির্বাচিত ব্যক্তিদের বদলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন করতে হবে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন রায়ে আরো বলেন, ‘বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর এসব প্রতিষ্ঠান (স্থানীয় সরকার) দলীয় রাজনীতি তথা স্বৈরাচারী শাসনের অশুভ পরিকল্পনার ফাঁদে পড়ে। ক্ষমতাসীন সরকারের মনোনীত ব্যক্তি ও সরকারি আমলারা খুশিমত এসব সংস্থাকে ব্যবহার করে।’ রায়ে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকারকে সংবিধানের কোথাও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। কিন্তু এর অর্থ হচ্ছে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিতরা স্থানীয় বিষয় দেখভাল করবে।’ বিচারপতি সাহাবুদ্দিন তার রায়ে বলেন, ‘If government's officers or their henchmen (দলীয় প্রশাসক) are brought to run these local bodies, there is no sense in retaining them as local government bodies.’ 44 DLR (AD) (১৯৯২)। এ রায়ের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘সংবিধানের আওতায় একটি প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় সরকার হতে হলে তাকে অবশ্যই দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক একাংশ হতে হবে, দ্বিতীয়ত, সে প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে হতে হবে।’ রায়ে বলা হয়, ‘১৯৯১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর যখন দ্বাদশ সংশোধনী পাস হলো তারপর সংবিধানের ৫৯, ৬০ ও ১৫২(১) অনুচ্ছেদের বাইরে কোনো স্থানীয় সরকারের সংস্থা আমরা কল্পনা করতে পারি না।’ এই রায়ের পর তত্কালীন বিএনপি সরকার পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেনি। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে নিলেও তার শাসন আমলে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত অনিষ্পন্নই থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০০০ সালের ৩ জুলাই সংসদে জেলা পরিষদ আইনে একটি সংশোধনী আনে। এতে বলা হয়, ‘জেলা পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রশাসক জেলা পরিষদের কার্যাবলী সম্পাদন করবে।’ তবে জেলা পরিষদের নির্বাচন কবে হবে এবং প্রশাসক কতদিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন তার কোনো সময়সীমা আইনে ছিল না। সংশোধিত আইনের ১৭ দফায় প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কমিশনার (যদি থাকে), উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সমন্বয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলী গঠনের কথা বলা হয়। এ আইন পাসের পর তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তির দ্বারা প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করলে তত্কালীন লক্ষ্মীপুর ৩ আসনের এমপি এ্যাডভোকেট খায়রুল আনাম আইনের ১৭ ও ৮২ ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরী ও বিচারপতি মো:মোজাম্মেল হোসেন সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে ২০০০ সালের ১৯ জুলাই সরকারের প্রতি রুল জারি করেছিল। রুলটি এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এধরনের একটি রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। কিন্তু এক বছরেও নির্বাচনের কোন উদ্যোগ নেই।
