সংবিধান পর্যালোচনা-১০

সর্বশেষ সংশোধন নিয়ে প্রতারণা

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২১
সংবিধানের সর্বশেষ সংশোধন নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে খোদ সুপ্রিম কোর্টের বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুরি করা হয়েছে। পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মুদ্রিত (২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি) সংবিধানের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি গায়েব করে দেয়া হয়েছে মুদ্রিত সংবিধানের কপি। মুদ্রিত সংবিধানে এমন অনেক অনুচ্ছেদ ছিলো যেগুলো পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে হুবহু সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। একই অবস্থা হয়েছে পঞ্চম সংশোধনীর ক্ষেত্রেও। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত একটি অনুচ্ছেদ (১৪৫ ক) যেভাবে ছিলো, পঞ্চদশ সংশোধনীতে হুবহু তা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কোন মুদ্রিত সংবিধানকে ভিত্তি ধরে সর্বশেষ (পঞ্চদশ) সংশোধন করা হয়েছে? সেটি কি আপিল বিভাগের নির্দেশে মুদ্রিত (২০১১), নাকি চতুর্দশ সংশোধনীর পর মুদ্রিত, নাকি পঞ্চম সংশোধনীর পর মুদ্রিত সংবিধান? সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ২৯ জুলাই পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় প্রকাশ করে। ওই রায়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ৮টি অনুচ্ছেদ এবং প্রস্তাবনা যেভাবে ছিলো সেভাবেই পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী সংবিধান পুনর্মুদ্রণ নিয়ে গড়িমসি করেছিলো সরকার। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায় প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এটি আর নতুনভাবে কার্যকর করার কিছু নেই। তবে সংসদ চাইলে সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ ছাড়া অন্য সবকিছু পরিবর্তনের এখতিয়ার তাদের রয়েছে।” পরে আইনমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক সভায় সংবিধান পুনর্মুদ্রণ নিয়ে সরকারের গড়িমসিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে সংবিধান পুনর্মুদ্রণের নির্দেশ দেন ওই প্রধান বিচারপতি। পরে ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করতে বাধ্য হয় সরকার। এদিকে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি পুনর্মুদ্রিত সংবিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। এ প্রসঙ্গে ওই কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু বলেছিলেন, ‘সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছে সংবিধানের যে কপি দেয়া হয়েছে সেটি একটি খসড়া সংবিধান। আমরা এটিকে খসড়া সংবিধান হিসেবে গণ্য করে সংবিধান সংশোধন করব।’ যদিও ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ৭৮ ধারা অনুযায়ী পুনর্মুদ্রিত সংবিধানই দেশের কার্যকর সংবিধান। খোদ আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ পুনর্মুদ্রণের পর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সংবিধান কখনো খসড়া হতে পারে না। পুনর্মুদ্রিত সংবিধান দেশের সর্বশেষ (পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে) পরিমার্জিত সংবিধান। সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম আইনমন্ত্রীর এই মতকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন-২০১১ পাস হয়। সংবিধান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি যে মুদ্রিত সংবিধান প্রকাশিত হয়েছিলো পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় তা আমলে নেয়া হয়নি। ওই সংবিধানের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। মুদ্রিত সংবিধানে এমন অনেক অনুচ্ছেদ ছিলো যা আবার সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনাকে কৌতুকপ্রদ ও চাতুর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, এর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের যে পদ্ধতি তাকে অমান্য করা হয়েছে। এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রসঙ্গত সংবিধানের ১৪২(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সংসদের আইন দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, (অ) অনুরূপ সংশোধনীর জন্য আনীত কোন বিলের সম্পূর্ণ শিরোনামায় এই সংবিধানের কোন বিধান সংশোধন করা হইবে বলিয়া স্পষ্টরূপে উল্লেখ না থাকিলে বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা যাইবে না।” আলোচ্য অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করেই ‘এই সংবিধানের কোন বিধান’—বাক্যাংশটি উল্লেখ রয়েছে। এই সংবিধান বলতে ‘সর্বশেষ মুদ্রিত সংবিধানকে’ (২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মুদ্রিত) বোঝাবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পাসের ক্ষেত্রে চতুর্দশ সংশোধনীর পর (খালেদা জিয়ার সরকারের আমলের) মুদ্রিত সংবিধানকে গণ্য করা হয়েছে। যে কারণে ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মুদ্রিত সংবিধানের এমন অনেক কিছু হুবহু আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে পাস করে নেয়া হয়। যেমন পঞ্চম সংশোধনীতে (জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে করা) ৮(১) অনুচ্ছেদে বলা ছিলো—“সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাত্ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার এই নীতিসমূহ এবং তত্সহ এই নীতিসমূহ হতে উদ্ভূত এইভাবে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।” পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার রায়ের পর মুদ্রিত সংবিধানে তার স্থলে প্রতিস্থাপিত হয়—“জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই নীতিসূমহ এবং তত্সহ এই নীতিসূমহ হইতে উদ্ভূত এইভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্রপরিচালনার মূল নীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।” বিষয়টি সংবিধানে থাকা সত্ত্বেও দাড়ি, কমা, শব্দ, বাক্য ইত্যাদি যেভাবে ছিলো সেভাবেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংবিধানে ঢুকানো হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার মামলায় আপিল বিভাগ ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ ৮টি অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছিলো। কিন্তু মুদ্রিত সংবিধানে ৫০টি অনুচ্ছেদ সংযোজন, পরিবর্তন, পরিমার্জন করে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি অনুচ্ছেদ ছাড়া ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মুদ্রিত প্রায় সবক’টি অনুচ্ছেদই হবহু আবার সংবিধানে ঢুকানো হয়েছে। সরকার যদি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মুদ্রিত সেই সংবিধানকে খসড়া সংবিধান ধরে, তাহলে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ নিয়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হবে। কেননা ৮ম সংশোধনীর মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৮৮ সালের ৩০ নম্বর আইনের ৫ ধারা বলে প্রতিস্থাপিত ১০০ অনুচ্ছেদকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলো। প্রসঙ্গত, এরশাদ সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের জন্য সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদকে সংশোধন করা হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী দাবি করে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। ১৯৮৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের এই সংযোজনকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করে। একইসঙ্গে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদকে পুনর্বহাল করা হয়। ওই মামলার রায়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমান লিখেন, “এই অনুচ্ছেদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সংসদ সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করেছে। সংবিধানে বেঁধে দেয়া ক্ষমতার বিভাজনকে লঙ্ঘন করা হয়েছে।” আপিল বিভাগের এই রায়ের পর ১৯৮৮ সালে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদকে পুনর্বহাল করা হয়। সংসদের কোন সংশোধনীর মাধ্যমে এটি সংবিধানে পুনস্থাপিত হয়নি। এ কারণে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পর মুদ্রিত সংবিধান যদি খসড়া হয় তাহলে ১০০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের ফলাফল একই হবে। কেননা খসড়া সংবিধান কার্যকর সংবিধান হতে পারে না। সেক্ষেত্রে কি বিভিন্ন জেলায় হাইকোর্টের বিভাগ স্থাপন বৈধ হবে? আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন প্রণেতারা যদি এটিকে খসড়া সংবিধান ধরেন তাহলে জটিলতা আরো বাড়বে। এই মুদ্রিত সংবিধান যেমনি খসড়া বলে গণ্য হয়নি, তেমনি এটিও খসড়া হিসেবে গণ্য হবে না। পুনর্মুদ্রণ নিয়ে বুদ্ধি বৃত্তিক চাতুরি এদিকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ নিয়ে বুদ্ধি বৃত্তিক চাতুরির আশ্রয় নেয়া হয়। বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি সংসদে পেশ করার যে বিধান ছিল, চাতুর্যের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তা ফেলে দেয়া হয়েছিলো। যদিও হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের রায়ে কোথাও সংবিধানের ‘১৪৫ ক’ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন বা বিলুপ্তির নির্দেশ দেয়া হয়নি। কিন্তু মুদ্রিত সংবিধানে ‘১৪৫ ক’ এর স্থলে ‘১৪৫(২)’ অনুচ্ছেদটি ’৭২ সালের সংবিধানে যেভাবে ছিল সেভাবে ফেরত নিয়ে আসা হয়েছিলো। তবে শর্তাংশটি রেখে দেয়া হয়, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যা সংযোজিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত পঞ্চম সংশোধনীতে ‘১৪৫ ক’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’ শর্তাংশে উল্লেখ রয়েছে ‘তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হইবে।’ পুনর্মুদ্রিত সংবিধানে শর্তাংশটি হুবহু রেখে দিলেও মূল অনুচ্ছেদ থেকে ‘এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন’ এই অংশটুকু বুদ্ধিভিত্তিক চাতুরতার মাধ্যমে প্রথমে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়া সরকারের পঞ্চম সংশোধনীর ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদটি হুবহু প্রতিস্থাপন করা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর পর মুদ্রিত সংবিধান যদি সংশোধন হয়ে থাকে তাহলে ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ হুবহু প্রতিস্থাপন কিভাবে সম্ভব? অর্থাত্ যেটি বিদ্যমান আছে, সেটি কেন আবার প্রতিস্থাপিত হবে। তাহলে কি (২০১১ সালের ১০ ফেবু্রয়ারি) মুদ্রিত সংবিধানকেও সংশোধন করা হয়েছে। এ কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কোন সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিলো—আপিল বিভাগের নির্দেশে মুদ্রিত সংবিধান, চতুর্দশ সংশোধনীর পরের সংবিধান, নাকি পঞ্চম সংশোধনীর পরের সংবিধান?