বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বাদ দেবে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২২
বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বাদ দেবে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে একথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম না থাকলে বাংলাদেশ বিশেষ রফতানি সুবিধা পাবে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ক্ষেত্রে কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। গত নভেম্বর মাসে তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানার কাজের পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের একজন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে নাকি এ সুবিধা সীমিত করা হবে অথবা স্থাগিত রাখা হবে, তা আগামী বসন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ওই কর্মকর্তা জানান, নভেম্বর মাসে তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন একমত হয়েছিলো যে, বাংলাদেশ শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় খুব কম অগ্রগতি করেছে। রিপোর্টে বলা হয়, তাজরিনের অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার সীমাবদ্ধতাগুলো ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে তাজরিন ফ্যাশনস ওয়ালমার্ট, সিয়ার্স প্রভৃতি বড় বড় ক্রেতাদের জন্য কাজ করতো। অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি অডিট না হলেও এ কারখানায় তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিলো। এ ক্ষেত্রে ক্রেতারা তৃতীয়পক্ষ দিয়ে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি অডিট করাতে বললেও সেটা করা হয়নি। রিপোর্টে আরো বলা হয়, শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার করলে তা হয়তো রাতারাতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার নাও দিতে পারে। ইতিমধ্যে খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান নাইকি এ কাজটি করতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী কোম্পানিটি মোট ৮৯৬টি কারখানার সাথে কাজ করে। সেখানে শুধুমাত্র বাংলাদেশি আটটি প্রতিষ্ঠান নাইকির জন্য কাজ করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নও যাতে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত না নেয় সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, বাংলাদেশের শ্রম অধিকারের উন্নতির বিষয়টি সামনে রেখে বাংলাদেশ একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে। তিনি বলেন, গত দুই দশকে রফতানিমুখি শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে চাচ্ছে, তা রাতারাতি নাও হতে পারে। আমরা শিশুশ্রম মুক্ত এবং নতুন কারখানাগুলো বিশ্বমানের করার চেষ্টা করছি। রিপোর্টে গতবছর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনের বাংলাদেশে সফরের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সে সময় তিনি শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ডের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে সরকারকে আহবান জানিয়েছিলেন। এটি করা না হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল সংকেত যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টিও পত্রিকাটির রিপোর্টে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব আহমেদ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ রন ক্রিক গতমাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লেখা চিঠিতে কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন। এ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, তৈরি পোশাক শিল্প ও হিমায়িত মত্স্য কারখানায় শ্রম অধিকার, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার উন্নতি এবং ইপিজেডগুলোর কারখানাতে কাজের মানোন্নয়ন। তবে রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের কোন কোন বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসাবে দেখছে। ঢাকার পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ অনেক ভালো। এদিকে, গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। একক দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রফতানি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সালে আগের বছরের তুলনায় মার্কিন বাজারে তুরস্কের রফতানি বেড়েছে শতকরা ২০ ভাগ, ভিয়েতনামের ৭ দশমিক ৯ ভাগ এবং কম্বোডিয়ার ৬ দশমিক ৪ ভাগ। অথচ বাংলাদেশের বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ ভাগ। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কোন পোশাকেরই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য প্রবেশাধিকার নেই। বাংলাদেশের রফতানিকারকরা ১৫ শতাংশেরও বেশি শুল্ক দিয়ে এ পণ্যটি রফতানি করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের যে চার দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে তার মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পায়। রফতানির হিসাবে এর পরিমাণ দুই কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ পণ্যের মধ্যে রয়েছে টোব্যাকো, সিরামিকস, ফার্নিচার, প্লাস্টিক এবং খেলনা। রফতানির সাথে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এত অল্প পরিমাণ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বাংলাদেশকে কঠোর শর্তে রেখেছে। বিশেষ করে কারখানার কাজের পরিবেশমান বজায় না থাকলে দেশটি জিএসপি সুবিধা বাতিলের কথা জানিয়েছে। তারা জানান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে জিএসপি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শতভাগ বিনা শুল্কে যাচ্ছে। এরপরও এ অঞ্চলের কোন দেশ এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশকে পূর্বশর্ত দেয়নি। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে মোট ১১ হাজার ৩৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। তবে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তর-ইউএসটিআর-এর।