চার কারণে সেশনজট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৯
সেশনজটের কারণে শিক্ষাজীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। কবে নাগাদ তারা শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবেন- তা কেউ বলতে পারছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত ৪ কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট হয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাতা মূল্যায়ন ও বিতরণে সমন্বয়হীনতা, এইচএসসি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একই কেন্দ হওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণে বিলম্ব এবং ভর্তি প্রক্রিয়া দেরিতে শুরু হওয়ায় শুরুতেই একবছর পিছিয়ে থাকছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা অভিযোগ করেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চার বছরের স্নাতক সম্মান ও এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করতে সময় লাগছে সাত থেকে আট বছর। এতে করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে পিছিয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। দেশের অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট কমে এলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে না কমায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা কম থাকায় তারা বাধ্য হয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষার্থী। এদিকে ১৩ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত্ জড়িত হলেও সেশনজট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট গুরুতর পর্যায়ে এবং এটি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ কমিশনের কাছে দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সব কর্মপন্থা নির্ধারণ হয় রাজনৈতিক বিষয়টিকে সামনে রেখে। সেশনজটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় জনবল নিয়োগকে প্রশাসন অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিকভাবে চাইলে সেশনজট নিরসন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় জনবল নিয়োগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় জনবল নিয়োগ অন্যদিকে এই নিয়োগ বাতিলের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের পুরো সময়ই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা বিরাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেশনজট নিরসনের চেয়ে দলীয় কর্মপন্থা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত। আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রায় এক হাজার জনবল ছাঁটাইয়ের পর এখন তারা ব্যস্ত দলীয় জনবল নিয়োগ সংক্রান্ত পরিকল্পনায়। এ কারণে সেশনজট নিরসনে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা এখন সরকার দলীয় নেতা পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কাজ না করেই বেতন-ভাতা নিচ্ছেন অনেকেই। পরীক্ষা শাখায় এদের সংখ্যা বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া বেশিরভাগ কর্মকর্তাই কাজ করেন না। তাই সেশনজট নিরসনে তারা কোন ভূমিকা রাখছেন না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. বদরুজ্জামানের মতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট দুই বছর। পরীক্ষার ফল প্রকাশ সেশনজটের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বলে তিনি দাবি করেন। কিন্তু তারই দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এইচএসসি পরীক্ষার পর অনার্স কোর্স শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন বছর বেশি সময় লেগে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় লাগছে। সেশনজট নিরসনে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কীভাবে দ্রুত পরীক্ষা নেয়া যায় এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। তবে তিনি বলেন, এইচএসসির পর শুরুকেই একবছর শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকে। এ বিষয়ে আমাদের কিছুই করণীয় নেই। বিলম্বে ভর্তি : দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া শেষ হবার পরেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ কারণে শুরুতেই পিছিয়ে থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বসে সিদ্ধান্ত নেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কবে। এ সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হবে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হবার পরে। এ কারণে সেশনজট মাথায় নিয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাত্রা শুরু করেন। জানা গেছে, ২০১২ সালের যারা এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ভর্তি প্রক্রিয়া এখনও চলছে। কবে ক্লাস শুরু হবে তার তারিখ এখনো জানা যায়নি। অথচ যারা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন তাদের ক্লাস চলছে পুরোদমে। এ ব্যাপারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন ড. মোবাশ্বেরা খানম বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ক্লাস শুরু হবে। তবে তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেয়া হবে বলে তিনি জানান। সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষক বলেছেন, শুরুতেই এভাবে পিছিয়ে পড়া থেকে সরে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসনিক দুর্বলতা: সেশনজটের অন্যতম প্রধান কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোন শিক্ষক নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্থ সকল শিক্ষকের ওপরই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কাজ নির্ভর করে। আর পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন এই শিক্ষকরাই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই শিক্ষকদের নির্দেশনা দেয়ার প্রশাসনিক কোন ক্ষমতা নেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। আইনি দুর্্বলতার কারণে এমনটি হচ্ছে। পরীক্ষা শাখার কর্মকর্তাদের মধ্যেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের প্রতি আন্তরিকতা নেই এসব কর্মকর্তার। রয়েছে দক্ষতার অভাব। ফলে একদিনের কাজ করতে সময় নেন তিন থেকে চারদিন। গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি চাকরিচ্যুত হওয়ার পরীক্ষা শাখার জনবল কমে ৫২৬ থেকে ১৮৭ জনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু নতুন করে কোন জনবল নিয়োগ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান জনবল নিয়ে কাজ করতে হলে সেশনজট আরো বাড়বে। খাতা মূল্যায়নে জটিলতা: অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার খাতা একবার মূল্যায়ন করা হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা মূল্যায়ন হয় দুই থেকে তিনবার। একজন শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন শেষে অন্য শিক্ষকের কাছে তা মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয়। এই দুই শিক্ষকের মূল্যায়নের পর যদি খাতা মূল্যায়নের নম্বর ৩০ এর কম-বেশি হয়, তবে তা মূল্যায়নের জন্য তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। একজন শিক্ষক খাতা মূল্যায়ন শেষে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে খাতা অন্য শিক্ষকের কাছে পাঠান। এই প্রক্রিয়া করতে গিয়েও শিক্ষকরা বিলম্ব করেন। চার মাসে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার কথা থাকলেও পেরিয়ে যায় ৬ থেকে ১২ মাস। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা মূল্যায়ন করেন কলেজ শিক্ষকরা। আবার এই শিক্ষকরাই এইচএসসির খাতা মূল্যায়ন করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শিক্ষকরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা মূল্যায়নে ততটা আগ্রহী নন। পরীক্ষা গ্রহণে বিলম্ব: প্রতিবছর এপ্রিল-মে মাসে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষার ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার কেন্দ একই। এ কারণে কেন্দ খালি না পাওয়ায় এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন পরীক্ষা হয় না। ফলে পরীক্ষা গ্রহণে বিলম্ব ঘটে। এছাড়া বিজি প্রেসে বিভিন্ন পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপা হয়। নির্বাচনের ব্যালট পেপারও ছাপা হয় সরকারি এই ছাপাখানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে ২০০৮ সালে ব্যস্ত ছিল বিজি প্রেস। ওই সময় কর্ণফুলি পেপার মিল কাগজ সরবরাহ করতে পারেনি। এ কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন পরীক্ষা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাসময়ে পরীক্ষা নেয়া এবং পরীক্ষার ফল প্রকাশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই কাজটি করতেই ব্যর্থ হচ্ছে। যে প্রক্রিয়ায়ই হোক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজটমুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।