বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে— এ নিয়ে চলছে সব জায়গায় আলোচনা। একদিকে সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে, অন্যদিকে বিরোধী দলের লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি। বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় দাবি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অন্যদিকে সরকার চাইছে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন। সরকারের দাবি বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিরোধী দল এক দাবিতে অনড়— তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। তাছাড়া সীমান্ত হত্যাযজ্ঞ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, গুম এবং আইন শৃঙ্খলার সীমাহীন অবনতিতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কারো জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। জনগণ এক দলের অপকর্ম থেকে বাঁচতে অন্য দলের আঁচলে আশ্রয় খুঁজছে, ফলাফল একই। তাহলে জনতার মুক্তি কোথায়? কে দেবে জনগণের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা?
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কথা চালাচালি করছে। সরকার নিজের পক্ষে যেমন যুক্তি উপস্থাপন করছেন, তেমনি বিরোধী দলও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরতে কার্পণ্য করছে না। সরকার ও বিরোধী দলের এই রাজনৈতিক বাহাস কেবল মাঠের রাজনীতিকেই প্রভাবিত করছে। মূলত বিষয়টি নিয়ে যাদের কথা বলা প্রয়োজন, যারা কথা বললে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, তারাই এখন চুপচাপ। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতির একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, দুই দলের দুই নেত্রী বাদে অন্য নেতারা সংলাপ নিয়ে যত কথাই বলুন না কেন, তাতে কোনো কাজ হবে না। এক্ষেত্রে স্পষ্ট কথা বলতে হবে দুই নেত্রীকেই। তাঁরা যা বলবেন, সাধারণত সেটাই ‘ফাইনাল’। অন্ততপক্ষে জনগণ তাই মনে করে। কাজেই সংকট দূর করতে এগিয়ে আসতে হবে দুই নেত্রীকেই। সংকট যদি দূর হয়, তাহলে সেটির কৃতিত্ব অবশ্যই দুই নেত্রীর। আবার যদি সংকট বাড়ে, তাহলে সেটির দায়ও বর্তাবে তাঁদের ওপর। আমরা জানি, দুই নেত্রী যথেষ্ট প্রজ্ঞাবান। তাঁরা সবকিছুই ভালো জানেন, বোঝেন। একজন তিনবার, আরেকজন দুইবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে তাঁরা হাল ছাড়েননি, তাঁদের দল চালিয়ে নিয়েছেন। তাই জনগণ আশা করে, দুই নেত্রী সংকট দূর করতে এগিয়ে আসবেন, বর্তমান অস্থিরতা থেকে জাতিকে মুক্ত করবেন ।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে হলে প্রয়োজন সংলাপ। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই যে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময় দূরে থাক, মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। এর প্রভাব দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যেমন পড়ছে, তেমনি প্রভাবিত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে অস্থিতিশীলতা। অনিবার্য হয়ে উঠেছে সংঘাত, যা কখনোই কাম্য নয়। সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান মুখোমুখি ও সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠায় অতীতের বাস্তবতায় তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবের বিষয়টিও চলে আসছে আলোচনায়। বিগত সময়ে আমরা এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতিতে তৃতীয় শক্তিকে সরকার পরিচালনা করতে দেখেছি। অরাজনৈতিক তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব আমাদের দেশের রাজনীতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।
বড় দল দুটোর পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে আগামী দিনগুলোতে যে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে চিন্তিত। কারণ রাজনৈতিক সংকট যত ঘনীভূত হয়, ততই বাধাগ্রস্ত হয় উন্নয়ন। দেশের উন্নয়ন মূলত নির্ভর করে বিনিয়োগের ওপর। রাজনৈতিক সংকট থেকে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের পাশাপাশি এই রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেক সময় জননিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দেয়। অতীতেই শুধু নয়, বর্তমান সময়েও আমরা সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বলি হতে দেখছি, যা সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত করে।
আগামী নির্বাচনকে শুধু অর্থবহ নয়, দেশের মানুষ তথা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার দাবি জনগণের। কিন্তু যখন প্রধান দুই দল বা জোট নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে, তখন উভয় পক্ষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাটাই হবে প্রধান কাজ। এই সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হতে হবে। সেই সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে সংলাপ। দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন কেবল উভয় দলের শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপই রাজনৈতিক অঙ্গনকে সংঘাতমুক্ত রাখতে পারে।
জনগণ মনে করে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত করতে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতেই হবে। সেই নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং তা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা। সেই সমঝোতার জন্য সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে সংলাপে উভয় দলকেই বসতে হবে।
যদি সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা না হয় তাহলে সময়ের পরিক্রমায় দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি আবির্ভূত হতেই পারে। কিন্তু একটি অরাজনৈতিক শক্তিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যায় না। জনগণ চায় দেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকুক এবং বিকশিত হোক। এ কথা সত্যি যে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক শক্তি দেশের মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথ ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস। রাজনীতিতে পরস্পর অবিশ্বাসের ফলস্বরূপ সেনাবাহিনী দেশ শাসন করলেও তারা কখনোই তৃতীয় শক্তি হতে পারে না। বর্তমান সময়ে এরশাদ নিজেকে তৃতীয় শক্তি দাবি করলেও তিনি আজ অবধি আওয়ামী লীগের গর্ভে। বর্তমানে বেশকিছু নাগরিক সংগঠন গড়ে উঠলেও তারাই যে তৃতীয় শক্তি তা তাদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে না। রাজনীতিতে যদি দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থান, সরকারে থাকাকালীন যদি দুটি রাজনৈতিক দল দুর্নীতির জাল বিস্তার অব্যাহত রাখে তাহলে জনগণ তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাবে। যে শক্তি হবে জনগণের শক্তি।
ঢাকা
