রেল লাইনের রেইল ধরে বেশ কসরত করে আমরা কয়েকজন হেঁটে চলছিলাম শ্রীমঙ্গল থেকে না জানা দূরত্বের লাওয়াছড়া বনের উদ্দেশে। সেটা ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি। চারপাশটা কুয়াশায় একেবারেই ঢেকে ছিল। কখনো দু রেইল থেকে দুজনে হাত ধরাধরি করেই চলতে হচ্ছিল, কারণ আমরা কেউই রেল লাইনে বিছানো পাথর-নুড়ির ওপর দিয়ে হাঁটতে অভ্যস্ত নই।
প্রায় দু ঘণ্টা আলো-আঁধারির মাঝ দিয়ে পথ চলার পর আমরা যেন হঠাত্ই গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হলাম। আরো একটু এগুতেই আমরা বুঝতে পারলাম রেল লাইনটি চলে গেছে বনের ভেতর দিয়ে। আর এটাই লাওয়াছড়া বন। সে কী গভীর বন! ভয়ে যে গা শিউরে ওঠেনি সেটা বলব না, কারণ অমন ঘন কুয়াশায় কখনো কোনো অজানা বনে ঢুকিনি। কপাল ভালো। আমাদেরকে গাইড করার জন্য পুরোধায় ছিলেন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা।
যতদূর মনে পড়ে নটর ডেম কলেজের প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষ মিলিয়ে আমরা মোট ১৮ জন ছাত্র ছিলাম। এর মধ্যে বারো জনই ছিলাম বিএসসি প্রথম বর্ষে। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা স্যার আমাদেরকে উদ্ভিদবিদ্যা এবং ফাদার আর ডব্লিউ টিম পড়াতেন প্রাণিবিদ্যা। এ কলেজের শিক্ষাসফরের উদ্দেশে এবং দ্বিজেন স্যারের অনুপ্রেরণায় আমরা প্রথম যাই কক্সবাজার, সেখান থেকে রামু, সোনাদিয়া দ্বীপ ও মহেশখালী হয়ে শ্রীমঙ্গল এসে হাজির হই। তখন একদিনে এক মাঝিচালিত এক সাম্পানে স্যার ও কলেজের গবেষণাগার সহযোগীসহ মোট ২০ জন সোনাদিয়া-মহেশখালী ট্রিপ করেছিলাম!
মূলত লাওয়াছড়া বন দেখা, এর উদ্ভিদকুলের ওপর প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানো, কলেজ গবেষণাগারের জন্য কিছু নমুনা সংগ্রহ এবং ইপিটিআরএস বা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান চা গবেষণাকেন্দ্র দেখা যেহেতু স্যারের এক পুরনো ছাত্র ওখানকার দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি স্যারকে দাওয়াত করেছিলেন।
পশ্চিম ভানুগাছ বনের ভেতরে অবস্থিত লাওয়াছড়া বনের একটি বিট অফিস রেল লাইন যে পাহাড়কে ভেদ করে দ্বিখণ্ডিত করেছে তার এক পাড়ের টিলার ওপরে এক ফরেস্টারের ঘর ও অফিস এবং অন্যটিতে বহু পুরনো টিনের ঘরের বন বাংলো।
আমরা অনেকটা ঘর্মাক্ত কলেবরে যখন বাংলোর দোরগোড়ায় পৌঁছালাম তখন ওখানে আমাদের আগেই পৌঁছে গেছেন বয়স্ক মতন দেখতে কুমিল্লাবাসী দাঁড়িওয়ালা একজন ফরেস্টার। তিনি যেন আমাদের পেয়ে হাতে চাঁদ পেলেন। কারণ ও জামানায় উনারা বন বিভাগীয় সরকারি অফিসার এবং চা বাগানের বাড়তি মেহমান কালেভদ্রে দু-চার মাসে একবার দেখতে পেতেন। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর উপরের টিলার বাসা থেকে মুড়ি, এক কাদি পাহাড়ি বাংলা কলা এনে সামনে রেখে দিলেন। আর আমরা তা গোগ্রাসে খেলাম—যেহেতু পাহাড়ি পথে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৭-৮ কিলোমিটার হেঁটেছি। মজার ব্যপার হলো, ১৯৮৩ সালে যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন চিড়িয়াখানার পাখির কিউরেটর হিসেবে যোগ দিলাম, তখন কুমিল্লার এক ভদ্রলোকের সাঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। তিনি আমাদের ১৯৬৭ সালে লাওয়াছড়া সফরের কথা শুনে বললেন, ওখানে তখন ফরেস্টার হিসেবে ওনার শ্বশুর সাহেব ছিলেন এবং অমন অবসরে যাবার দাঁড়িওয়ালা ফরেস্টারের সংখ্যা খুবই কম ছিল। খুব ভালো লাগল দৈবাত্ সংযোগের জন্য।
বাংলো থেকে নেমে আমরা হাঁটা দিলাম রেল লাইন ধরে পশ্চিম ভানুগাছের দিকে। মাঝে মাঝে লাইনের ধারের ঢালু মেঠোপথ বেয়ে আমরা স্যারের নেতৃত্বে বনে ঢুকছিলাম। তিনি প্রতিটি গাছ, গুল্ম এবং বীরুতের বৈজ্ঞানিক নাম অবলীলাক্রমে বলে যাচ্ছিলেন—যার বেশিরভাগই আমাদের কারো বোধগম্য হচ্ছিল না।
সেই ১৯৬৭ সালে লাওয়াছড়ার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ঠিক এক দশক পর, ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, তৃতীয়বার ও বনে ঢুকি—ওসময় ঢাকার এডভেন্টিস্ট ডেন্টাল ক্লিনিকের দাঁতের ডাক্তার যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড এল জনসনের সঙ্গে পাখি দেখার জন্য।
দু দিন ধরে বাংলো থেকে তিন-চার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বন চষে বেড়িয়ে আমরা বহু প্রজাতির পাখি দেখি যার কমপক্ষে এক ডজন আমরা এর আগে কখনো দেখিনি। এরপর নানা গবেষণার কাজে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বেশ ক বার ও বনে যাবার সুযোগ হয়। এরপর থেকে প্রতি দু বছরে দু-তিনবার করে লাওয়াছড়া ও তার আশপাশের বনে এবং হাওরে গিয়েছি বা এখনো যাচ্ছি।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত দেশের বনাঞ্চলে ব্যাপক ঘোরাঘুরির ফলে আমি এটা নিশ্চিত হই যে পুরাতন কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হবিগঞ্জ হয়ে শ্রীমঙ্গল এবং মৌলভীবাজার ও সিলেট সদরের যে অংশ ভারতীয় সীমানা বরাবর এবং সেখানে যে ৫-৬ খণ্ড ১০ থেকে ৩০ বর্গকিলোমিটার করে মিশ্র চিরসবুজ বন। তাতে লাওয়াছড়া বা এর বন্যপ্রাণীর বিষয়টি নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বারংবার। সেসময় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি বা অ্যানিমেল প্লানেট চ্যানেল ছিল না, বা তা উপমহাদেশে প্রচারিত হতো না। ফলে ‘এসো বিজ্ঞানের রাজ্যে’ খুবই সারা জাগানো অনুষ্ঠান ছিল।
এরপর থেকে এটি স্তন্যপায়ী এবং পাখি গবেষক ও পর্যবেক্ষকদের এক স্বর্গপুরীতে রূপ নেয়। তারপর দেখা যায় এটা ব্যাঙ ও সাপদেরও এক আপন ভুবন।
সরকারের বনবিভাগ এর জীববৈজ্ঞানিক মূল্য বিচার করে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ২৭.৪ বর্গ কিলোমিটরের প্রায় অর্ধেকটা, মানে ১২.৫ বর্গকিলোমিটার, জায়গাকে লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এটি হয়ে ওঠে সারাদেশের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী দর্শনের এক প্রসিদ্ধ স্থান।
অপরিপক্ষ ও সঠিক তথ্যনির্ভর নয়—এমন সব সস্তা লেখালেখির ফলে জনমনে এমন বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, লাওয়াছড়া তথা পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন একটি প্রাকৃতিক বন।
আসলে বর্তমান বাংলাদেশের কোথাও এক খণ্ড বন নেই—যাকে আদি প্রাকৃতিক বন মানে ভার্জিন বন বলা যাবে। বা যে বনে বনবিভাগের হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক বন কেটে সেখানে তাদের পরিকল্পিত বা পছন্দের অথবা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যায়—এমন দেশি ও বিদেশি গাছের প্রজাতি না লাগানো হয়েছে বা বনে বাসকরা আদি জনগোষ্ঠীর জুমচাষের শিকার হয়ে বন ধ্বংস হয়নি।
বাংলাদেশ তথা সারা ভারতবর্ষে বনধ্বংসের গোড়াপত্তন করে ব্রিটিশ। ১৮৬৪ সালে প্রথম বনবিভাগের সৃষ্টি হয়। তখন এর প্রধান ছিলেন ব্রান্ডিস। এরপর ১৮৭২ সালে শ্লিক বন সংরক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং তাঁর সময়ে অবিভক্ত বাংলার বনকে ৫টি বন বিভাগে বিভক্ত করা হয়। এর একটি ছিল ঢাকা বিভাগ—যার অধীনে আসে সিলেট এবং কাছার অঞ্চল। আসাম ফরেস্ট রেগুলেশন ১৮৭৫-৭৬ বরাতে সিলেটের বনকে প্রথমে ‘সংরক্ষিত বন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
যতদূর জানা যায়, সি পুরাকায়স্থ নামের একজন সিলেট অঞ্চলের ১৯৩৫-৩৮ সালের জন্য একটি ‘প্লান্টেশন স্কীম’ তৈরি করেন। ১৯৩৮ সালে সিলেট বনবিভাগের জন্য এন এন দাশ নামের একজন বনকর্মকর্তা ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭ সালের জন্য একটি ‘ওয়ার্কিং প্লান’ তৈরি করেন। আর সেই ১৯৩৫ সাল থেকে নানান পরিকল্পনার নামে সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক বন কেটে সেখানে ব্রিটিশের চাহিদা পূরণের জন্য নতুন বন সৃজন করা হয়। সম্ভবত ১৯৫৯ সালে ভানুগাছের বন সর্বশেষ পাইকারিভাবে কেটে সেখানে নতুন গাছ লাগানো হয়। যে কোনো কারণেই হোক এ যাবত্ পর্যন্ত ওই বনের গাছ ব্রিটিশের চালু করা ‘ক্লিয়ারফেলিং’ বা মাটি বাদে বাকি সব গাছ কেটে সাবাড় করে সেখানে পছন্দ ও প্রয়োজনের জন্য বাণিজ্যিক বন সৃজন করা হয়নি। ফলে লাওয়াছড়ায় বহু প্রাকৃতিক এবং স্থানীয় উদ্ভিদের প্রজাতির পুনর্জন্ম হয়েছে এবং বনটিকে দেখতে প্রায় প্রাকৃতিক বনের মতো লাগে।
এবার মানচিত্রে লাওয়াছড়ার ওপরে আসুন। ভানুগাছ বাদে বাকি সব জায়গা জুড়ে হয় জনবসতি, ফসলি জমি নয়তো চা বাগান। অর্থাত্ ১৯৩৫ থেকে কম করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এ এলাকার তাবত্ বন কেটে বা দখল করে সেখানে গড়ে উঠেছে মানুষের বাসস্থান। মানচিত্রের গভীরে বা লাওয়াছড়ার মাঝখান দিয়ে হাঁটলে দেখা যাবে আদিবাসীদের ‘অধিকারের’ অংশ হিসেবে বনের গাছ কেটে বা ছেঁটে খাসিয়া ও ত্রিপুরিদের পছন্দ ও প্রয়োজনের তাগিদে কিছু গাছ রেখেছে পান চাষের জন্য। বাকি বন উজাড় করা হয়েছে। আশপাশের বাঙালিরাও বনভূমি দখল করতে কম যায়নি।
এসব বারোয়ারি চাপের মুখে উজাড় হয়ে যাওয়া বনের বা প্রাকৃতিক জঙ্গল, ঝোপঝাড়ের বেশিরভাগ প্রাণী আশ্রয় নিয়েছে লাওয়াছড়ায়।
প্রাণী জগতের নিচের দিক থেকে ধরলে এ বনে সবচেয়ে বেশি আছে কেঁচো ও তদ্জাতীয় প্রাণী, শামুক এবং খোলসহীন শামুক বা স্লাগ, অসংখ্য ধরনের পিঁপড়ে, প্রজাপতি, দেয়ালি পোকা বা মথ, ফড়িং, ঘাসফড়িং, ফলং, উড়চোঙ্গা, গোবরে, জোনাকি, গান্ধী ও ঝিঁঝি পোকা, মাকড়সা, চেল্লা, বিছা বা বিচ্ছু, কেন্নো, উইপোকা, মিঠাপানি ও ভূমি কাঁকড়া। তার সঙ্গে আছে মশা-মাছি।
ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দিতে ব্রিটিশামলের দেশি ও বিলেতি বিজ্ঞানীরা বেশকিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আদি প্রজাতি নমুনা সংগ্রহ করে সিলেট জেলা তথা শ্রীমঙ্গল থেকে।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে আমি এমন একটি প্রজাতির নমুনার ছবি তুলি ও পুনঃরেকর্ড করি প্রায় শত বছর পর। ১৯০০ সালে ভারতকেন্দ্রিক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পোকক্ সিলেটের শমসের নগর থেকে পাওয়া নমুনার ওপর ভিত্তি করে ছুরি বিচ্ছু বা হুইপ স্করপিয়নটির (Hypoctonus oatesii) নামকরণ ও প্রজাতি স্থাপন করেন। এরপর আর আমাদের দেশের কোনো বিজ্ঞানী এ প্রজাতির হদিস করেনি। ব্যাঙ-টিকটিকি-পোকামাকড় প্রভৃতি খোঁজার সময় হঠাত্ করেই এ প্রজাতির একটি নমুনার দেখা পাই, ছবি তুলি এবং যেখানে ছিল সেখানেই ফেরত রাখি। এ ব্যাপারে ছবিসহ একটি খবর ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়।
এরপর ওখান থেকেই আমি একটি ঘাতক গান্ধীপোকা বা এসাসিন বাগের সন্ধান পাই, যার এখনো প্রজাতি নির্ণয় সম্ভব হয়নি। আরো নানান ধরনের অমেরুদণ্ডী এ বনে আছে—যাদের খুঁজে বের করা দরকার এবং আমার দৃঢ়বিশ্বাস এসবের মধ্যে অনেক নতুন প্রজাতি পাওয়া যাবে বা শতাধিক বছরের পুরনো রেকর্ড নতুন করে ঝালাই করা যাবে।
জাহাঙ্গীরনগর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দুটির প্রাণিবিদ্যার বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও প্রাক্তন গবেষক ব্যাঙ, টিকটিকি, আঁচিল বা আনজন এবং সাপের বেশ ক টি প্রজাতির নতুন রেকর্ড করেছেন বাংলাদেশের জন্য।
উভচর দলের খুব এক মজার প্রাণী Smith's Litter Frog Leptobrachium smithii। এর আগে ২০০৭ সালে আচমত এবং মান্নান যার বাংলা নাম রাখেন, সরাসরি ইংরেজি নামানুসারে ও অনুবাদ করে ‘স্মিথের আবর্জনা ব্যাঙ’। যেহেতুে দেশে এদের কেবল একটি মাত্র প্রজাতি আছে তাই ২০১০ সালে আমার চেকলিস্ট বইয়ে একে আমি কেবলই আবর্জনা ব্যাঙ বলেছি। কিন্তু এ ছোট আকারের ভীষণভাবে নিশাচর ব্যাঙটির চোখের ওপরের প্রায় অর্ধেকটা লাল দেখাতে পারে। সে হিসেবে একে ‘লালচোখো ক্ষুদে ব্যাঙ’ বলাই ভালো। রাতের আঁধারে বনের মেঝেতে ঘুরে বেরিয়ে কীট-পতঙ্গ এবং কেঁচো জাতীয় প্রাণী ধরে খায়।
গেছো ব্যাঙ বা তাদের দোসরদের বেশ ক টি প্রজাতিও এখানে পাওয়া যায়। বর্ষার সময় এবং বিশেষ করে বৃষ্টি হলে সূর্য ডোবার সময় থেকে প্রায় সারারাত ব্যাঙের দারুণ চিত্কারে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।
রাতের বেলা জোনাকির বিচ্ছুরিত আলোকছটায় বনে যেন মুহুর্মুহু বিদ্যুত্ চমকায়। কখনো বা শোনা যায় ঝিঁঝিপোকা বা ঘাসফড়িংদের ডাক।
গেল বছরই একজন তরুণ সরীসৃপ গবেষণাকারী শাহরিয়ার সিজার এ বন থেকে দুটি বিরল প্রজাতির সাপ :বলয়ী দুধরাজ বা ব্যান্ডেড ট্রিঙ্কেট স্নেক এবং ঝলমলে সাপ বা ইরিডেসেন্ট স্নেকের নমুনা সংগ্রহ করে দেশের জন্য প্রথম রেকর্ড করেছে। এর আগে অধ্যাপক মনিরুল এবং আলী রেজা কম করে ৩টি ব্যাঙের এবং ৬টি টিকিটিকি-আঁচির জাতীয় সরীসৃপ রেকর্ড করেন।
লাওয়াছড়াকে বলা যায় পাখির জন্য বাংলাদেশের নুহ নবীর নৌকো বা স্বর্গরাজ্য। এখানে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। শীতের রৌদ্র উজ্জ্বল এক দিনে আমার মতো লোকেরাই ৫০ থেকে ৭০ প্রজাতির পাখি রেকর্ড করতে পারে আর উঠতি বয়সের পাখিপ্রেমীরা যে সে সংখ্যা শতের কাছে নেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
লাওয়াছড়ার সাক্ষর প্রজাতি বা সিগনেচার স্পিসিস বলতে উল্লুক বা ওয়েস্টার্ন হুলক্-কে বোঝায়। ধরে নেয়া হয় সারাদেশে ২৫০টির মতো উল্লুক আছে। বৃহত্তর সিলেট জেলা বা সিলেট বনবিভাগ; ৩টি পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার যে মিশ্রচিরসবুজ ও ক্ষয়িষ্ণু বন সেখানে। এর মধ্যে কেবল লাওয়াছড়াতেই আছে ৫৭টি (তথ্য :বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট)। এটি দেশের উল্লুকদের সবচেয়ে বড় দল—যা মোট ১৪টি ছোট ছোট উপদলে এবং প্রতিটি দল আলাদাভাবে বনের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৫টির একটি দল থাকে লাওয়াছড়া বনবিভাগীয় বাংলোর আশপাশে—যা পর্যটকরা সচরাচর দেখে থাকেন। অল্প বা প্রায় বিনাপরিশ্রমে উল্লুক দেখার জন্য মোক্ষম জায়গা দেশে খুব কম আছে।
বর্তমানে দেশের সবচয়ে বেশি বানর-নরবানর বৈচিত্র্য বিদ্যমান এই লাওয়াছড়াতেই—যা আমি ও আমার প্রাক্তন ছাত্র অধ্যাপক ফরীদ আহসান এবং আব্দুল ওয়াহাব ১৯৮০-র দশকে নির্ণয় করি।
এ বন থেকে নতুন করে দেশের জন্য বিগত ২০১০ সালে সি এম রেজা নামের একজন ব্যাংকার হলুদ গাছ গোকুল বা ইয়েলো-থ্রোটেড মার্টেন দেখেন এবং ছবি তোলেন।
এককথায় লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও তার পাশে যে সামন্য বন এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তা যে আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি স্বর্ণখনি তা বলাই বাহুল্য। ফলে এটিকে দেশের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের একটি অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সর্বতোভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
সে লক্ষ্যে এ জাতীয় উদ্যানে সব রকম জমি বা সম্পদ ভাগাভাগির সব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বাতিল করে কেবলই সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে পুনঃঘোষণা করা দরকার—যেখানে শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বনের উদ্বৃত্ত সম্পদ কেবল মাত্র তৃণমূল পর্যায়ের লোকজনদের মধ্যে কাজের বিনিময়ে বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আর তখনই এ বন বন্যপ্রাণী, স্থানীয় প্রকৃতি এবং জনগণের সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশের মানুষের কল্যাণে আসবে অনাগত ভবিষ্যত্ পর্যন্ত।
