বাংলাদেশ চিত্রকলা প্রদর্শনী এবং কলম্বো আর্ট ক্যাম্প

আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ১৮:৫৬

ভিজ্যুয়াল আর্টস বা দৃশ্যশিল্পের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার যে পরিসর, সটা কিভাবে কোন দিকে প্রবাহিত হবে, এ খানিকটা অনুমান করা যায় মাত্র, স্থির কোনো মতামত দেওয়া যায় না। শিল্পকলার প্রবাহের গতি-প্রকৃতি বা আভিমুখ নির্ধারিত হয় চারপাশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিকতার মধ্য দিয়ে। আজকে এই বাস্তবতা শুধু একটি বিশেষ সমাজব্যবস্থা বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশ ও বিশ্ব একাকার হয়ে গেছে। আধুনিক পৃথিবীতে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, দেশ ও বিশ্বের দূরত্ব ততই কমে আসছে। সুদূরের আলো হাওয়া আমাদের ঘরের আনাচে কানাচেও খেলে যাচ্ছে।

এই বিশ্বায়ন আমাদের শিল্পকলার বিষয়ে ও আঙ্গিকে বিপুল পরিবর্তন এনেছে। পাশাপাশি এই সবকিছু সমাজের গভীরে এক বিচ্ছিন্নতারও সৃষ্টি করেছে। সেই বিচ্ছিন্নতার কথায় এখন না যাই, বরং সৌন্দর্যের কথা বলি। সৌন্দর্যবোধ একটি সাধারণ প্রবণতা। মানুষ নিজেকে এবং তার পরিবেশকে সবসময় সুন্দর করে রাখতে চায়। আদিম যুগেও মানুষের সৌন্দর্যবোধ ছিল। সাধারণ মানুষের জীবন যাপনে ও উত্সবে সৌন্দর্যের প্রকাশ থাকে। শিল্প বা সৌন্দর্য কাউকে বুঝিয়ে দিতে হয় না। আল্পনার মানে বোঝানোর জন্য কোনো শিল্প-সমালোচকের দরকার হয় না। জীবন ও শিল্প বা সৌন্দর্য সাধারণের কাছে একাত্ম।

আধুনিকতা এই একাত্মতা ভেঙে দিয়েছে। একটু আগেই বিচ্ছিন্নতার কথা বলছিলাম। জীবন ও শিল্পের মধ্যে আধুনিকতা একরকমের বিচ্ছিন্নতা এনেছে। সাধারণ মানুষ তার ব্যস্ত জীবনধারায় শিল্পের সঙ্গে বা সৌন্দর্যের সঙ্গে সংযোগ রাখতে পারেনি। সেই সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে তারা।

এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে শিল্পীরা প্রকৃতির কাছে যান, আর্ট ক্যাম্প করেন, প্রদর্শনী করেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে যান নিজেকে মেলে ধরতে, তাঁদের শিল্পকর্মকে সাধারণের মধ্যে প্রসারিত করতে। প্রকৃতির রূপ আর শিল্পীর আবেগ দুটোই সম্প্রসারিত হয় এর ভেতর দিয়ে।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন ও সোসাইটি ফর প্রমোশন অব বাংলাদেশ আর্ট, এসপিবি-এর যৌথ আয়োজনে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ আর্ট’ শিরোনামের অনবদ্য একটি চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা ছিলেন—শিল্পী হাশেম খান, শামসুদ্দোহা, কনক চাঁপা চাকমা, জাহাঙ্গীর হোসেন, মাকসুদা ইকবাল নীপা এবং শিল্পী রফি হক। প্রর্দশনীতে স্থানীয় শিল্পী, শিল্পসমালোচক, শিল্পানুরাগী, শিল্পসংগ্রাহক, শিল্প উদ্যোক্তা, সাংবাদিকসহ প্রচুর দর্শকের সমাগম হয়। প্রদর্শনীতে আসা একজন দর্শক বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের শিল্পীদের শক্তি, আবেগ এবং গভীরতা দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ। ক্যানভাসগুলির করণকৌশল এবং গতিশীল রঙের উপস্থাপনা আর রচনাশৈলী খুব চিত্তাকর্ষক’।

 

বাংলাদেশ আর্ট প্রদর্শনী

প্রদর্শনীতে শিল্পী হাশেম খান তাঁর কাজে লৌকিক ও দেশীয় ঐতিহ্যগত আঙ্গিককে আধুনিকতায় রূপান্তর ঘটিয়ে ভিন্ন ব্যঞ্জনায় নিয়ে গেছেন।

শিল্পী শামসুদ্দোহা বাস্তবের তীব্রময় রূপ পরাবাস্তবতায় নিয়ে গিয়ে বাস্তবের স্নিগ্ধ এক সৌন্দর্যকে বের করে এনেছেন।

কনক চাঁপা চাকমা পার্বত্য মানুষের জীবনযাপনের সরলতাকে তাঁর ক্যানভাসে উপজীব্য করেছেন। পার্বত্য জীবন ও প্রকৃতির বহুমুখী বৈচিত্র্যকে উন্মীলিত করেছেন।

জাহাঙ্গীর হোসেনের ক্যানভাসে মানুষ ও তার অবস্থানকে নির্ণয় করেছেন। ফিগারে পেশির টেনশনকে ছন্দময় রূপ দিয়েছেন। সেখানে নিজস্ব রূপারোপের দিক যাবার চেষ্টায় মনোযোগী হয়েছেন।

শিল্পী মাকসুদা ইকাবল নীপার ছবিতে ইমপ্রেশনিজম ও পোস্ট ইমপ্রেশনিজমের নতুন একটি রূপ নির্মাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। স্তরের পর স্তর নিয়ে রং লেপনের মধ্য দিয়ে যে দৃশ্যের উন্মীলন ঘটে তা তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তিনি এদেশের সবচেয়ে কুশলী এবং প্রতিশ্রুতিশীল বিমূর্ত ঘরানার শিল্পী।

প্রীতি আলী তাঁর ক্যানভাসে প্রকৃতির নানান অনুষঙ্গের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে প্রাচ্য অনুভবের স্বতন্ত্র এক রূপের আভাস পাওয়া যায়। তাঁর কল্পনাপ্রবণ মনের কথা রঙের স্তরের ভেতরে প্রকাশিত হয়েছে।

শিল্পী মনজুর রশীদের জলরঙের কাজ দর্শকদের হূদয় টেনেছে। কোমল অনুভবের ছবি মূলত জলরং মাধ্যমেই ব্যঞ্জনাময় একটি আবেশ তৈরি করেছে। প্রথাগত জলরঙের শৈলীকে দূরে সরিয়ে নিজেই একটি ভিন্ন রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। এবং তিনি সফল হয়েছেন।

শিল্পী রফি হক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের একটি নিরপেক্ষ শিল্পভাষা তৈরি করতে সচেষ্ট সবসময়। প্রদর্শনীর কাজগুলোতেও তার ছাপ অনুভব করা যায়। প্রেম ও করুণায় সমৃদ্ধ এক মরমি অনুভবের জগতের কথা সূক্ষ্মভাবে তিনি পরস্ফুিট করেছেন। যা তিনি পূর্বেও করেছেন।  

 

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা আর্ট ক্যাম্প

পাশাপাশি একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলদেশ এবং শ্রীলঙ্কার বিশিষ্ট শিল্পীদের অংশগ্রহণে অসাধারণ একটি আর্ট ক্যাম্পের। যেখানে বাংলাদেশের শিল্পীরা ছাড়াও শ্রীলঙ্কার যেসকল শিল্পী অংশ নিয়েছেন তাঁরা হলেন—শিল্পী এস এইচ সারাত্, মনোরঞ্জন হেরাত্, ডব্লিউ নয়ানন্দ,

রাজাসেগার, চান্না একানায়েক, সুডাত্ এবিসেকারা, থেজা গুণারাধা, জ্ঞান প্রাগিথ, চাতুরাঙ্গ সঞ্জয়া বিয়াগামা, জে সি রত্নায়েক, চাম্মিকা জয়বর্ধানে এবং শিল্পী চাতুরিকা জায়ানি।

আর্ট ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানী কলম্বোর অদূরে ‘লাইট অব এশিয়া’ নামের একটি দর্শনীয় স্থানে। যেখানে জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সিদ্ধার্থ’-এর চিত্রায়ণ হয়েছিল। এটি একটি অপূর্ব কম্পাউন্ড। শ্রীলঙ্কার বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর আন্তরিক ইচ্ছা এবং তত্পরতার কারণেই এখানে আর্ট ক্যাম্পটি করা সম্ভবপর হয়েছিল।

লাইট অব এশিয়া’র অজস্র বৃক্ষশোভিত সবুজ চত্বরে শিল্পীদের দুই দিনব্যাপী এই আর্ট ক্যাম্পটি ছিল দেখার মতো। পুরো চত্বর জুড়ে কেউ ছবি আঁকছেন ইজেলে, কেউ ছবি আঁকছেন সবুজ ঘাসে উপুড় হয়ে, কেউ বা সিদ্ধার্থ সিনেমার সেটের ভেতরে ঢুকে গিয়ে ছবি এঁকে ইতিহাসের সাক্ষী হতে চেয়েছেন! 

প্রকৃতিলগ্ন হয়ে শুধু শিল্পীরাই নয়, ছবি এঁকেছেন এসপিবি-এর চেয়ারম্যান, মাছরাঙা টেলিভিশনের এমডি অঞ্জন চৌধুরী, এসপিবি-এর ফাউন্ডার চেয়ারম্যান এলদেম বি কবিরও। এই আর্ট ক্যাম্প ও প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য ছিল সুন্দর প্রকৃতি ও সমুদ্রলগ্ন দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পীদের একটি মেলবন্ধন তেরি করা। দুই দেশের সংস্কৃতিকে এক ফিতেয় উদ্যাপন করা।

সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ধন্যবাদ তাঁদেরকে যাঁরা প্রদর্শনী সফল করার জন্য নানা প্রান্ত থেকে সহযোগিতা করেছেন। অসংখ্য ধন্যবাদ লাইট অব এশিয়া, জর্জ কিট ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষকে। এবং অবশ্যই শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে।

অংশগ্রহণকারী দুই দেশের শিল্পীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।